পুষ্টিহীনতা সচেতনতা সপ্তাহ
খাদ্যের পুষ্টিমান কমছে, বাড়ছে ঝুঁকি

খাবার খাচ্ছি, পেটও ভরছে। কিন্তু শরীর কি প্রয়োজনীয় পুষ্টি পাচ্ছে? পেট ভরে খাওয়ার পরও শরীরে পুষ্টির অভাব রয়ে যাচ্ছে। খাবারে ভিটামিন, খনিজ এবং অন্যান্য পুষ্টি উপাদানের ঘাটতি নিয়ে লিখেছেন ড. মানসুরা মকবুল
বিশ্বব্যাপী ১৪ থেকে ১৮ সেপ্টেম্বর পালিত হচ্ছে ‘পুষ্টিহীনতা সচেতনতা সপ্তাহ’। এ উপলক্ষে কেন খাদ্যের পুষ্টিগুণ কমছে, এর ফলে কী কী সমস্যা হচ্ছে এবং ব্যক্তি ও সমাজ পর্যায়ে আমাদের করণীয় কী— তা নিয়ে এবারের আয়োজন।
খাদ্যের পুষ্টিগুণ কেন কমছে?
ফসল দ্রুত বড় করতে রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যাপক ব্যবহার মাটির উর্বরতা ও অণুজীব নষ্ট করছে। এতে মাটি দুর্বল হয়ে ফসলে ভিটামিন ও খনিজ উপাদানের পরিমাণ কমিয়ে দেয়।
আর্থিক লাভের আশায় একই জমিতে বারবার একই ফসল চাষ করা হয়। সঠিকভাবে ফসল পরিবর্তন, কম্পোস্ট ও জৈব উপাদান ব্যবহার না করলে ধীরে ধীরে মাটির উর্বরতা কমে যায়। আধুনিক উচ্চফলনশীল জাত এবং দুর্বল মাটি ব্যবস্থাপনার কারণে কিছু ক্ষেত্রে ঐতিহ্যবাহী জাতের তুলনায় এখনকার ফসলে আয়রন, জিংক ও অন্যান্য পুষ্টি উপাদান কম থাকে। এ ছাড়া
পরিবহনের সুবিধার্থে ফল ও সবজি পাকার আগেই তুলে ফেলা হয় এবং পরে রাসায়নিক দিয়ে পাকানো হয়, যা স্বাভাবিক পুষ্টির বিকাশ বাধাগ্রস্ত করে।
চাল যত বেশি ছাঁটাই (পলিশ) করা হয়, ফাইবার ও বি-ভিটামিন তত কমে যায়। একইভাবে রিফাইন্ড ময়দা বা প্যাকেটের খাবারেও পুষ্টি থাকে না বললেই চলে। এর সঙ্গে
খাবারে ভেজাল ও অনিরাপদ প্রিজারভেটিভের ব্যবহার শুধু স্বাস্থ্যের ক্ষতিই করে না, বরং প্রাকৃতিক পুষ্টিগুণ নষ্ট করে দেয়।
পুষ্টিহীনতায় যেসব সমস্যা হচ্ছে
- খাবারের পুষ্টিমান কমে গেলে পেট ভরা থাকলেও শরীরে আয়রন, ভিটামিন এ, আয়োডিন, জিংকসহ প্রয়োজনীয় পুষ্টির অভাব হতে পারে। এর ফলে রক্তস্বল্পতা, রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়া, দৃষ্টিশক্তির সমস্যা, শিশুর বেড়ে ওঠায় দেরি এবং বড়দের কর্মক্ষমতা কমে যেতে পারে।
- বাংলাদেশে অপুষ্টির কারণে বিভিন্ন এলাকায় খর্বাকৃতি ও অতিরিক্ত রোগা হওয়ার সমস্যা এখনো রয়েছে। গর্ভধারণ থেকে শিশুর দুই বছর বয়স পর্যন্ত পর্যাপ্ত পুষ্টি না পেলে শারীরিক ও মেধার বিকাশ স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
- মাছ, শাকসবজি, ডাল ও পূর্ণ শস্যের মতো প্রচলিত খাবারের পরিবর্তে প্রক্রিয়াজাত খাবার, চিনিযুক্ত পানীয় ও ফাস্টফুড বেশি খাওয়ার ফলে স্থূলতা, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদরোগ বাড়ছে।
- পুষ্টিহীন খাবার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও দুর্বল করতে পারে। এতে সংক্রমণ বেশি হতে পারে, রোগের তীব্রতা বাড়তে পারে এবং সুস্থ হতে বেশি সময় লাগতে পারে।
কী করা যেতে পারে
- খাবারের পুষ্টিমান নিশ্চিত করতে কৃষিতে টেকসই ও বৈচিত্র্যপূর্ণ চাষ বাড়াতে হবে। ফসল পরিবর্তনের পাশাপাশি ধান ছাড়াও ডাল, তেলবীজ, শাকসবজি, ফল ও পুষ্টিকর দেশীয় জাতের চাষ বাড়ানো প্রয়োজন।
- খাদ্য নিরাপত্তা ও ভেজালবিরোধী ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা ও ভেজাল খাবার চেনা ও এড়িয়ে চলার বিষয়ে ভোক্তাদের সচেতন করতে হবে।
- প্রয়োজন অনুযায়ী খাবারে পুষ্টি যোগ করার ব্যবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ। যেমন— ভোজ্য তেলে ভিটামিন এ, লবণে আয়োডিন এবং আটায় আয়রন ও ফলিক অ্যাসিড যোগ করা যেতে পারে।
- অন্তঃসত্ত্বা নারী, কিশোরী ও ছোট শিশুদের জন্য প্রয়োজন অনুযায়ী পুষ্টি উপাদানের পরিপূরক ব্যবস্থাও নিতে হবে।
- স্কুলের পাঠ্যক্রমে বাস্তবভিত্তিক পুষ্টিশিক্ষা যুক্ত করতে হবে। শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানোর গুরুত্ব সম্পর্কে পরিবারকে জানাতে হবে। স্থানীয় ও মৌসুমি শাকসবজি, ফল, ছোট মাছ, ডিম ও ডাল খাওয়ার অভ্যাস বাড়াতে হবে।
- অন্তঃসত্ত্বা ও বুকের দুধ খাওয়ানো নারীদের পুষ্টি পরামর্শ, আয়রন ও ফলিক অ্যাসিড এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।
- যতটা সম্ভব প্রাকৃতিক ও কম প্রক্রিয়াজাত খাবার বেছে নিতে হবে। খাবারের পাতে বিভিন্ন রঙের শাকসবজি, হলুদ বা কমলা রঙের ফল ও সবজি, ডাল, মাছ, ডিম ও বাদাম রাখতে হবে।
লেখক: সহযোগী অধ্যাপক ও চেয়ারপারসন, খাদ্যপ্রযুক্তি ও পুষ্টিবিজ্ঞান বিভাগ, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।



