বর্ষায় ত্বকের রোগ অসতর্কতাই মূল কারণ

ছবি: সাজ্জাদ হোসেন
বর্ষাকাল স্বস্তির বৃষ্টির সঙ্গে নিয়ে আসে ত্বকের নানা সমস্যাও। ত্বকের বিভিন্ন রোগ ও প্রতিরোধের উপায় নিয়ে লিখেছেন ডা. সিনথিয়া আলম
ভ্যাপসা গরম, অতিরিক্ত আর্দ্রতা, ঘাম এবং দীর্ঘ সময় ভেজা পরিবেশে থাকার কারণে এ সময়ে ত্বকে বিভিন্ন ধরনের সংক্রমণের ঝুঁকি বেড়ে যায়। সামান্য অসতর্কতাও দাদ, খোসপাঁচড়া, ফাঙ্গাল ইনফেকশন, ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণ কিংবা চুলকানির মতো সমস্যার কারণ হতে পারে।
বর্ষার আর্দ্র আবহাওয়ায় জীবাণু দ্রুত বংশবিস্তার করে। এ ছাড়া কাদা ও জমে থাকা পানিতে নিয়মিত চলাচলের কারণে হাত ও পা দীর্ঘ সময় ভেজা থাকে, যা জীবানুর জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে। তাই এই মৌসুমে ত্বকের প্রতি বাড়তি যত্ন নেওয়া জরুরি। বর্ষায় ত্বকের যেসব রোগ বেশি দেখা যায়-
ফাঙ্গাল ইনফেকশন বা দাদ
বর্ষায় সবচেয়ে বেশি যে রোগটি দেখা যায়, তা হলো ছত্রাকজনিত সংক্রমণ বা ফাঙ্গাল ইনফেকশন। সাধারণ ভাষায় একে দাদ বলে। শরীরের যেসব অংশে ঘাম বেশি জমে বা যেসব অংশ ভাঁজযুক্ত ও ঢাকা থাকে, যেমন— বগল, কুঁচকি, স্তনের নিচে কিংবা পায়ের আঙুলের ফাঁকে এই সংক্রমণ বেশি হয়। এ ধরনের ইনফেকশন সাধারণত গোলাকার, লালচে, চুলকানিযুক্ত দাগ হিসেবে শুরু হয় এবং চিকিৎসা না করলে ধীরে ধীরে বড় হতে থাকে। ফাঙ্গাল ইনফেকশন অত্যন্ত সংক্রামক। এটি আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরের এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় ছড়িয়ে যেতে পারে। আবার একই তোয়ালে, কাপড় বা ঘামের সংস্পর্শে এলে পরিবারের অন্য সদস্যদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়তে পারে।
শরীরের বিভিন্ন স্থানে হলে এই সংক্রমণের নামও ভিন্ন হয়। মুখে হলে টিনিয়া ফেসিই (Tinea faciei), কুঁচকিতে হলে টিনিয়া ক্রুরিস (Tinea cruris) এবং পায়ের আঙুলের ফাঁকে হলে টিনিয়া পেডিস (Tinea pedis) বলা হয়।
ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণ
বর্ষায় ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণও অনেক বেড়ে যায়। এর মধ্যে রয়েছে ফলিকুলাইটিস, ফোড়া (Boil Furuncle) এবং শিশুদের ইমপেটিগো (Impetigo)।
এসব রোগে ত্বকে পুঁজযুক্ত ফুসকুড়ি বা ফোড়া হয়, ব্যথা থাকতে পারে এবং কখনো কখনো জ্বরও হতে পারে। যাদের ডায়াবেটিস, দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতা অথবা রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কম, তাদের এ ধরনের সংক্রমণের ঝুঁকি বেশি থাকে।
ফাঙ্গাল ইনফেকশন অত্যন্ত সংক্রামক। একই তোয়ালে কাপড় বা ঘামের সংস্পর্শে এলে পরিবারের অন্য সদস্যদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়তে পারে
ভাইরাসজনিত ত্বকের রোগ
বর্তমানে ভাইরাসজনিত ত্বকের রোগেও অনেকে আক্রান্ত হচ্ছেন। এর মধ্যে রয়েছে ভাইরাল ওয়ার্ট, মলাস্কাম কন্টাজিওসাম এবং হারপিস জোস্টার। হারপিস জোস্টারে সাধারণত শরীরের এক পাশে ছোট ছোট পানিভরা ফুসকুড়ি হয় এবং এর সঙ্গে তীব্র জ্বালাপোড়া ও ব্যথা থাকে, যা অনেক সময় ফুসকুড়ির চেয়েও বেশি কষ্টদায়ক হয়।
একজিমা ও ঘামাচি
যাদের ত্বক শুষ্ক, তাদের একজিমা বর্ষাকালেও বাড়তে পারে। অন্যদিকে, অতিরিক্ত ঘামের কারণে, বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে ঘামাচি (Miliaria) একটি অত্যন্ত সাধারণ সমস্যা হিসেবে দেখা দেয়।
খোসপাঁচড়া বা স্ক্যাবিস
বর্তমানে বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি সংক্রামক ত্বকের রোগ হলো স্ক্যাবিস বা খোসপাঁচড়া। এটি Sarcoptes scabiei নামক একটি ক্ষুদ্র মাইটের কারণে হয়। এ রোগের প্রধান লক্ষণ হলো প্রচণ্ড চুলকানি, যা বিশেষ করে রাতে বেড়ে যায়। প্রথমে হাতের আঙুলের ফাঁক, কবজি, কোমর, নাভির চারপাশ এবং যৌনাঙ্গে ছোট ছোট দানা দেখা যায়। পরে তা সারা শরীরে ছড়িয়ে যেতে পারে। এটি অত্যন্ত সংক্রামক হওয়ায় একজন আক্রান্ত হলে পরিবারের অন্য সদস্যরাও আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকেন। তাই স্ক্যাবিস হলে শুধু একজন নয়, পরিবারের সব সদস্যের একসঙ্গে চিকিৎসা নেওয়া জরুরি।
কীভাবে প্রতিরোধ করবেন?
বর্ষাকালে ত্বকের রোগ থেকে সুরক্ষিত থাকতে কিছু সহজ নিয়ম মেনে চলা জরুরি।
- শরীর সবসময় পরিষ্কার ও শুকনো রাখুন।
- ঘামে বা বৃষ্টিতে ভেজা কাপড় দীর্ঘক্ষণ পরে থাকবেন না।
- ঘাম হলে দ্রুত শরীর মুছে ফেলুন।
- সুতি ও ঢিলেঢালা পোশাক পরুন।
- নিজের তোয়ালে, জামাকাপড় ও ব্যক্তিগত ব্যবহার্য জিনিস অন্যের সঙ্গে ভাগাভাগি করবেন না।
- প্রতিদিন পরিষ্কার কাপড় ব্যবহার করুন।
- সুষম ও পুষ্টিকর খাবার খান, পর্যাপ্ত পানি পান করুন।
- প্রয়োজন অনুযায়ী হালকা ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করুন।
- বাইরে বের হলে অবশ্যই এসপিএফ ৩০ বা তার বেশি সানস্ক্রিন ব্যবহার করুন।
মনে রাখবেন, নিজে থেকে স্টেরয়েডযুক্ত ক্রিম ব্যবহার করা বিপজ্জনক হতে পারে। চুলকানি বা ত্বকে দাগ দেখা দিলে দেরি না করে একজন চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন। সঠিক সময়ে চিকিৎসা নিলে অধিকাংশ ত্বকের রোগই সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।
লেখক: সহকারী অধ্যাপক ও কনসালট্যান্ট, ক্লিনিক্যাল অ্যান্ড অ্যাস্থেটিক ডার্মাটোলজি, কন্টিনেন্টাল হসপিটাল পিএলসি (সাবেক ইউনাইটেড হাসপাতাল)




