গ্রিন বেতে বাংলাদেশি শিক্ষকদের অবস্থান ভালো

গ্রিন বের বাংলাদেশি কমিউনিটির কয়েকটি পরিবার। ছবি: লেখক
যুক্তরাষ্ট্রের উইসকনসিন অঙ্গরাজ্যের ছোট্ট শহর গ্রিন বেতে পরিবার নিয়ে থাকেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক রিয়াজ আহমেদ। এই শহর এবং তার বিশ্ববিদ্যালয়ের গল্প শুনিয়েছেন পাঠকদের
ছিলাম সাউথ ক্যারোলিনায়। ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে ঘাঁটি গাড়ি গ্রিন বেতে। সাউথ ক্যারোলিনার শীত তুলনামূলকভাবে মৃদু, তুষারপাতও খুবই বিরল। দুই-তিন বছরে একবার তুষার পড়লেই সেটি ছিল বড় খবর। অন্যদিকে গ্রিন বে কানাডার সীমান্তের কাছাকাছি হওয়ায় শীত অনেক তীব্র। বন্ধুদের কাছ থেকে এখানকার শীতের নানা ভয়ংকর গল্প শুনে কিছুটা শঙ্কা নিয়েই রওনা হয়েছিলাম। এখানে এসেই জীবনে প্রথম এত তুষারপাত দেখলাম। তবে দ্রুতই প্রকৃতির বৈরিতা নিয়ে ভয় দূর হয়ে যায় এখানকার বাংলাদেশি কমিউনিটির আন্তরিকতা ও আতিথেয়তায়।
প্রায় দুই লাখ মানুষের এই ছোট্ট শহরটির সৌন্দর্য, এবং মানুষের আন্তরিকতা আমাকে মুগ্ধ করেছে।
গ্রিন বের নাম শুনলেই যুক্তরাষ্ট্রের অধিকাংশ মানুষের মনে প্রথমেই আসে একটি নাম, গ্রিন বে প্যাকার্স। এটি যুক্তরাষ্ট্রের জনপ্রিয় আমেরিকান ফুটবল লিগ এনএফএলের সবচেয়ে ঐতিহ্যবাহী এবং সফল দলগুলোর একটি। শহর জুড়ে রয়েছে অসংখ্য ছোট-বড় পার্ক। এর মধ্যে বে বিচ অ্যামিউজমেন্ট পার্কের কথা বিশেষভাবে বলতে হয়। খুবই স্বল্প খরচে পরিবার নিয়ে আনন্দ করার জন্য এটি আদর্শ একটি জায়গা। শহর থেকে মাত্র দেড় ঘণ্টার ড্রাইভে রয়েছে মনোরম ডোর কাউন্টি। লেক মিশিগানের তীরবর্তী এই অঞ্চলে বন, জল, সৈকত ও ছোট ছোট উপকূলীয় শহর মিলিয়ে তৈরি হয়েছে অপূর্ব এক পরিবেশ।
এখানকার অধিকাংশ শিক্ষার্থী পড়াশোনার পাশাপাশি চাকরি করে নিজেদের শিক্ষার ব্যয় বহন করে অথবা শিক্ষাঋণ নেয়
এবার গ্রিন বেতে আমার কর্মস্থল ইউনিভার্সিটি অব উইসকনসিন-গ্রিন বের গল্প বলব। ইউনিভার্সিটি অব উইসকনসিন সিস্টেমের অধীনে উইসকনসিন অঙ্গরাজ্যের বিভিন্ন শহরে মোট ১৩টি ক্যাম্পাস রয়েছে, যার একটি এটি। ক্যাম্পাসে হাঁটতে হাঁটতেই হরিণ, বুনো টার্কি ও নানা ধরনের বন্যপ্রাণীর দেখা মেলে। আর শরৎকালে গাছের সবুজ পাতাগুলো যখন লাল, হলুদ ও কমলা রঙ ধারণ করে, তখন পুরো ক্যাম্পাস যেন হেসে ওঠে।
এখানে বাংলাদেশি শিক্ষকদের অবস্থান খুব ভালো। বর্তমানে আমি মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের চেয়ার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি। একই সঙ্গে কম্পিউটার সায়েন্স এবং ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগেও বাংলাদেশি শিক্ষকরা বিভাগীয় প্রধানের দায়িত্ব পালন করছেন। এটি আমাদের দেশের জন্য নিঃসন্দেহে ইতিবাচক।
এখানকার অধিকাংশ শিক্ষার্থী পড়াশোনার পাশাপাশি চাকরি করে নিজেদের শিক্ষার ব্যয় বহন করে অথবা শিক্ষাঋণ নেয়। ফলে শ্রেণিকক্ষে তারা অনেক বেশি মনোযোগী।
প্রায়ই তারা একটি প্রশ্ন করে, ‘আজ ক্লাসে যা শিখছি, পেশাগত জীবনে সেটি কোথায় কাজে লাগবে?’ একজন শিক্ষক হিসেবে এই প্রশ্ন আমাকে আরও ভালোভাবে পাঠদান করতে অনুপ্রাণিত করে।
অনেক শিক্ষার্থীর বয়স প্রচলিত বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের তুলনায় অনেক বেশি। কেউ দীর্ঘদিন চাকরি করার পর আবার পড়াশোনায় ফিরেছে, কেউ পরিবার ও সন্তান সামলে নতুন করে নিজের স্বপ্ন পূরণের পথে হাঁটছে। তাদের অধ্যবসায়, সময় ব্যবস্থাপনা এবং শেখার আগ্রহ আমাকে প্রতিনিয়ত অনুপ্রাণিত করে।
এ শহরে মাত্র ২০-২২টি বাংলাদেশি পরিবার। কিন্তু বন্ধন অত্যন্ত দৃঢ়। বোঝাপড়া ও আন্তরিকতা খুবই গভীর। ঈদ, পহেলা বৈশাখ, পারিবারিক অনুষ্ঠান কিংবা যেকোনো প্রয়োজনে সবাই একে অন্যের পাশে দাঁড়াই। তাই হাজার হাজার মাইল দূরে থেকেও কখনো মনে হয় না যে আমরা একা।





