বইমেলার ফরম্যাট আমারই তৈরি করা

ছবি তুলেছেন সাজ্জাদ হোসেন
১৯৭২ সালে স্বাধীন দেশে ঢাকায় প্রথম আন্তর্জাতিক বইমেলা আয়োজনের দায়িত্ব পালন করেছেন নেপথ্যে। জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের বইমেলাগুলোও আয়োজন করেছেন। ছিলেন ইউপিএলের কনসাল্টিং এডিটর। গ্রন্থবিশেষজ্ঞ বদিউদ্দিন নাজিরের কর্মজীবনের মুখোমুখি হয়েছেন ওমর শাহেদ ও আখলাকুজ্জামান অনিক।
বইয়ের সঙ্গে আপনার পরিচয় কীভাবে?
আমার জন্ম কলকাতায়। বাড়িতে পড়াশোনার চর্চা ছিল, হোম লাইব্রেরিও ছিল। মা খুব ভালো পাঠক ছিলেন। বঙ্কিমচন্দ্রের লেখা অষ্টম শ্রেণিতেই আমার পড়া শেষ। ফলে ছেলেবেলাটা ছিল খুব আনন্দময়। ‘পয়গাম’ নামে একটি পত্রিকা ছিল; তাতে লিখতামও। কিন্তু ১৩ বছর বয়সে আমার মা মারা যান। তার পর থেকেই জীবনটা ওলটপালট।
এ দেশে এলেন কেন?
বাপের সঙ্গে ঝগড়া করে চলে এসেছিলাম। কলকাতা সায়েন্স কলেজে অ্যানথ্রোপলজিতে অনার্স পড়ছিলাম। শেষ না করেই চলে এলাম ১৯৬৮ সালে। উঠলাম ছোট কাকা পি এ নাজিরের বাসায়। সিএসপি অফিসার। ডিআইটির (ঢাকা ইমপ্রুভমেন্ট ট্রাস্ট) চেয়ারম্যান ছিলেন। ১৯৬৯-এর গণআন্দোলনের পরই তার বাসা থেকে চলে আসি। ওই সময় টুকটাক অনেক কাজ করেছিলাম।
চাকরিতে যোগ দিলেন কীভাবে?
১৯৭২ সালে বাংলা একাডেমিতে ২১ ফেব্রুয়ারির অনুষ্ঠানে কলকাতা থেকে অনেক বুদ্ধিজীবী এসেছিলেন— মনোজ বসু, প্রবোধ সান্যাল, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। মনোজ বসুর সঙ্গে খুব মশকরা করছিলাম। জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক সরদার জয়েনউদ্দীনও ছিলেন। আমাকে ডেকে বললেন, ‘এই, তুমি কী করো?’ বললাম, ‘কিছু করি না, বেকার।’ ‘তাহলে আমাদের জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রে আসো।’
বায়তুল মোকাররমের উত্তর দিকের স্কাউট ভবনের দোতলায় ছিল জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র। গেলাম। সরদার জয়েন করতে বললেন। খুব আগ্রহী ছিলাম না। কারণ, এর মধ্যে মালিবাগে কয়েকজন বন্ধুবান্ধব মিলে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় করেছিলাম। সেসব নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম। তারপরও জয়েন করলাম।
শুরুতে কী করলেন?
১৯৭২ সালে ইউনেসকোর ‘আন্তর্জাতিক গ্রন্থবর্ষ’ উপলক্ষে এখানে ‘আন্তর্জাতিক বইমেলা’ করা হলো বাংলা একাডেমির মাঠে। ওই কাজ নিয়ে মেতে গেলাম। ঠিক করলাম, একটা সাইডে বিদেশিরা স্টল করবে। অন্যদিকে দেশীয় প্রকাশকরা। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হতো। লাঠিখেলা, কবির লড়াই, এটা-সেটা। অনেক লোক হতো। খুব সফল মেলা ছিল ওটা।
প্রকাশকরা খুব খুশি হয়েছিল নিশ্চয়ই?
অবশ্যই। বাংলাদেশে এটাই প্রথম, তার আগে তো কোনোদিন হয়নি। বিদেশি প্রকাশকরা তো বই বিক্রি করেনি। যারা দেশি, শুধু তারা বই বিক্রি করেছে; ভালো বিক্রি হয়েছে। খুব খুশি হয়েছিল। ফলে ১৯৭৪ সালে যখন গ্রন্থমেলা করা হলো, প্রকাশকরা বিনাবাক্যে যোগ দিলেন। এই কাজটা করতে করতে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের বিভিন্ন কাজে যুক্ত হয়ে গেলাম।
কী কী কাজে যুক্ত হলেন?
কখনো সেলসে, কখনো অন্য কোনো কাজে। এরপর জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র ‘মহানগর পাঠাগার’ স্থাপন করল। এটি পরে উঠে গেছে। ঢাকার গুলিস্তানের গোলাপ শাহ মাজারের উল্টো দিকে লাল রঙের ভবনে পাঠাগারটি ছিল। প্রতিষ্ঠাতা লাইব্রেরিয়ান ছিলাম। পদটি ছিল জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের পরিচালক ও উপপরিচালকের মাঝখানের। তারপর গ্রন্থকেন্দ্রের ‘গ্রন্থ উন্নয়ন প্রকল্প’ এলো। এর প্রধান হিসেবে আমাকে বদলি করে নিয়ে এলো।
গুরুত্বপূর্ণ কাজটি কিন্তু আমার হাতে করা— বাংলাদেশে আইএসবিএন (ISBN)-এর প্রচলন। এটি না করলে বিদেশে বই রপ্তানি করা যাবে না
জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের প্রথম জাতীয় গ্রন্থমেলায়ও তো আপনার অবদান ছিল।
১৯৭৪ সালে আমি গ্রন্থকেন্দ্রের প্রদর্শনী কর্মকর্তা। ওই বছর আমার হাত দিয়েই বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় গ্রন্থমেলাটা হয়। এর আগে ওইভাবে র্যাক করে, দোকানের মতো একেকটি স্টল সাজিয়ে কখনো মেলা হতো না। সরকার মেলা করার জন্য এক লাখ টাকা গ্রন্থকেন্দ্রকে দিয়েছিল। আগের বছর সরদার জয়েনউদ্দীন ফ্রাঙ্কফুর্ট বুক ফেয়ারে গিয়ে কিছু লিটারেচার নিয়ে এসেছিলেন। ওদের স্টলগুলো দেখতে কেমন, যোগদান করতে গেলে কী নিয়মাবলি আছে— এসব লেখা আছে। আমাদের পক্ষে যেগুলো অ্যাডাপ্ট করা সম্ভব, সেসব নিয়মকানুন নিয়ে ১৯৭৪ সালে প্রথম জাতীয় গ্রন্থমেলার আয়োজন করলাম। পরের বছর করলাম চট্টগ্রামে। দারুণ হয়েছিল। তার পরের বছর হলো খুলনায়। দীর্ঘদিন পর ১৯৯৪ সালে জাতীয় গ্রন্থমেলাকে ‘ঢাকা বইমেলা’ নাম করে নতুন করে বড় করে করা হলো। ওটারও ব্লু প্রিন্ট, প্ল্যান, প্রোগ্রাম সবই আমি করে দিয়েছিলাম।
বাংলা একাডেমি বইমেলায়ও কি আপনি যুক্ত ছিলেন?
ইন্টারেস্টিংলি, বাংলা একাডেমির যে ‘অমর একুশে গ্রন্থমেলা’, তার নাম ছিল ‘একুশে গ্রন্থমেলা’। ১৯৭৯ সালে প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় এবং ৮ থেকে ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চলে। ওটারও দায়িত্ব পালন করি। কেননা প্রথম বছরটি জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র করে দিয়ে এসেছিল। পরের বছর থেকে অবশ্য বাংলা একাডেমি নিজেরা করতে শুরু করল। বাংলা একাডেমি বইমেলার এখনকার ফরম্যাট আমার তৈরি করা। নিয়মকানুন সব প্রথম বছর থেকে নেওয়া। ওই নিয়মেই চলছে।
বাংলা একাডেমিতে বইমেলা করার আইডিয়াটা কীভাবে এলো?
বাংলা একাডেমিতে একুশকে উপলক্ষ করে প্রকাশকরা নিজেদের উদ্যোগে বই বিক্রির ব্যবস্থা করতেন। ১৯৭৯ সাল, ফজলে রাব্বী তখন ডিরেক্টর; প্রকাশকরা তার কাছে গিয়ে এখানে একটা মেলা করতে অনুরোধ করল। তিনি প্রকাশকদের কথায় রাজি হলেন। বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক আশরাফ সিদ্দিকীও ওই সভায় ছিলেন। তিনি বললেন, ‘আচ্ছা ঠিক আছে, আমিও সহযোগিতা করব।’ কিন্তু জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের সম্পূর্ণ খরচেই ওই মেলাটি হয়েছিল। সেই সময় মেলা করতে ৪০ হাজার টাকা লেগেছিল। উদ্বোধন করেছিলেন বিচারপতি আবদুস সাত্তার। বাংলা একাডেমি কেবল তাদের মাঠটি ব্যবহার করতে দিয়েছিল। প্রকাশকরা যার যার বই নিয়ে অংশগ্রহণ করেছিলেন।
১৯৭৪ সাল থেকেই জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের মেলার একটি প্যাটার্ন ছিল, যেটি হলো আমরাই স্টল তৈরি করে দেব। এমনকি দোকানের ব্যানার পর্যন্ত। প্রকাশক শুধু তার বই নিয়ে এসে বই বিক্রি করবেন। পরে বই নিয়ে চলে যাবেন। তার জন্য ভাড়া দেবেন। এখানে প্রকাশককে নিজেকে কিছু করতে হয় না। এই মডেলটি ফ্রাংকফুর্ট বইমেলার। পৃথিবীর সব দেশে ওভাবেই মেলা হয়। কিন্তু ১৯৭৯ সালের মেলাটি দাঁড়াল এবং ভালো বিক্রি হলো বলেই ১৯৮০ সালে বাংলা একাডেমি নিজেই মেলার দায়িত্ব নিল; জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র নিতে পারল না। তাদের দেশব্যাপী গ্রন্থ সপ্তাহ পালনের অন্য কাজ ছিল। এভাবে বাংলা একাডেমির টাকায় মেলা শুরু হলো।
বাংলাদেশের কোনো লেখক মনে করে না তার লেখায় কারও হাত দেওয়ার অধিকার আছে। এ অবস্থায় মানোন্নয়ন করা খুবই দুরূহ
জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রে আর কোনো কাজ করেছেন?
ওখানে থাকতে গবেষণার নানা কাজ করেছি। গুরুত্বপূর্ণ কাজ েযটি সেটি কিন্তু আমার হাতে করা— বাংলাদেশে আইএসবিএন (ISBN)-এর প্রচলন। ইন্টারন্যাশনাল বুক নম্বর। বইয়ের গায়ে যে নম্বর থাকে, এটি বাংলাদেশে আমার হাত দিয়ে প্রচলন হয়।
এটি করছিলেন কেন?
এটি না করলে বিদেশে বই রপ্তানি করা যাবে না। আইএসবিএন নম্বরটা আসলে একটি ফাইল নম্বর। এই বইটার নামে তার সব ইস্যু লিখে রাখবে। এর জন্য আলাদা করে কোনো নম্বর তৈরি করতে হয় না, অটোমেটিক্যালি হয়ে যায়। এই নম্বর এমন একটা জিনিস, পৃথিবীর যেকোনো দেশে যান না কেন, একটি বইয়ের নম্বর কখনো আলাদা হবে না। এক নম্বরে কখনো দুটো বই হবে না। পৃথিবীর যেখানেই যান না কেন, এই নম্বর এই বইটিকেই মিন করবে।
বইমেলায় কবিতা পাঠের আয়োজনও করেছিলেন আপনি।
১৯৭২ সালের মেলাতেই ৪৫ মিনিটের মতো একটা সময় রেখেছিলাম, বাংলাদেশের কবিরা তাদের একটি-দুটি করে কবিতা পাঠ করবেন। বাংলাদেশের সব কবিকে তো আর জায়গা দেওয়া যাবে না। আমরা জনা আষ্টেককে চয়েজ করছিলাম। আমি শুধু আবুল হাসানের নামটা দিয়েছিলাম, যাতে ও কবিতা পড়তে পারে।
বিখ্যাত কবি আবুল হাসান?
হ্যাঁ, অকালপ্রয়াত। আমার বন্ধু, একেবারে জানি দোস্ত ছিল। আমরা খুব আড্ডা মারতে পারতাম। আমাকে খুব গালাগাল করত। আমার থেকে এক বছরের বড় ছিল। আমি ওর কবিতার অনুরক্ত ছিলাম। তবে নেশা, এটা-সেটা করে অকালে নিজের জীবনটা শেষ করে দিল। জার্মানিতে পাঠানো হয়েছিল চিকিৎসার জন্য। ওখান থেকেও ফিরিয়ে দিল। বলেছে, এর আর ভালো হওয়ার উপায় নেই। ঢাকায় ফিরে আবার সেই অনাচার, শরীরের অযত্ন নেওয়া— এই করে ও মারা গেল। দিলখোলা ছিল। হাতের লেখাটা খুব সুন্দর ছিল। ওর কাছে নীল রঙের, আকাশি রঙের প্যাড থাকত। কেউ চাইলে তাতে কবিতা লিখে দিত।
ইউপিএলের সঙ্গে যোগাযোগ হলো কীভাবে?
ইউপিএল (ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড)-এর সঙ্গে আমার সম্পর্ক ১৯৭২ সাল থেকে। ১৯৮০ সালে দিল্লিতে পড়তে যাই, দুই বছরের ট্রেনিং। লেখাপড়া শেষ করে ফিরে আসার পরেই মহিউদ্দিন আহমেদ, ইউপিএলের যিনি মালিক, মানে ম্যানেজিং ডিরেক্টর, আমাকে তাদের একজন রিসোর্সপারসন হিসেবে অ্যাপয়েন্টমেন্ট দেন। এটি কোনো চাকরি না। একজন প্রকাশকের কাছে অর্থনীতির বই যেমন আছে, ইতিহাসের বইও আছে, গণিতের বই আছে, সমাজবিজ্ঞানের আছে। এতগুলো দেখা তার এডিটরের পক্ষে সম্ভব নয়। সে করে কী, তার পুলে যারা থাকে, তাদের দিয়ে দেয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, সরকারি কর্মকর্তা ইত্যাদি অনেকে ইউপিএলের কাজ করতেন, মানে পাণ্ডুলিপি দেখে দিতেন। এভাবে আমি প্র্যাকটিক্যালি একবেলা ইউপিএলে কাজই করতাম। মাঝে চার বছর করতে পারিনি। কারণ, তখন জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র ছেড়ে গণসাহায্য সংস্থার প্রোগ্রাম কোঅর্ডিনেটর, ম্যাটেরিয়াল ডেভেলপমেন্ট ইউনিট পদে চাকরি করেছি। ইউপিএলের অফিস ছিল মতিঝিল আর আমার চাকরিস্থল ছিল আসাদ অ্যাভিনিউতে। তারপর ইউপিএলে আবার গেলাম।
এখানে কী কাজ করতেন?
১৯৯৯ সালে ইউপিএলে ‘কনসাল্টিং এডিটর’ হিসেবে জয়েন করলাম এবং এখানে বই কতভাবে করা যায়, কেমন করে করা যায়, কাকে দিয়ে করানো যায়, কাকে লিখতে বলা যায় বা বই লিখলে পাণ্ডুলিপি এলে সেটি কেমন করে যাচাই করা যায়, যাচাই করে ছাপার যোগ্য কিনা সেটি দেখা, ছাপার যোগ্য হলে আর কী কী এডিট করার দরকার, সেগুলো ঠিক করে দেওয়া, তারপর বই ছাপা— এসব করতে হতো। ইউপিএলে মহিউদ্দিন ভাইয়ের পর প্রতিষ্ঠানের যা কিছু দায়িত্ব, সব আমাকে পালন করতে হতো। অ্যাকাউন্টস ছাড়া সব কাজই করতাম। ২০১৬ সাল পর্যন্ত এখানে ছিলাম।
ইউপিএল থেকে প্রকাশিত ‘প্রদোষে প্রাকৃতজন’ কীভাবে পেয়েছিলেন?
‘প্রদোষে প্রাকৃতজন’-এর প্রথম খণ্ডটি বিচিত্রায় ছাপা হয়েছিল। ওই বইতে দুটি খণ্ড আছে। আমি তখন দিল্লিতে পড়ি। রাস্তায় পড়ব বলে বিচিত্রা কিনে পড়তে পড়তে গেছি। তারপর লেখাপড়া শেষে ফিরে এসে একদিন শওকত আলীকে দেখি, জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রে আড্ডা দিতে এসেছেন। বললাম, ‘আপনার বইয়ের কী খবর?’ তিনি বললেন, ‘কী বলো নাজির, বাংলাদেশে ভালো প্রকাশক পাওয়া যায় না। কাউকে পাচ্ছি না।’ বললাম, ‘আমার কাছে দিয়ে যান। কোন প্রকাশক ছাপবে, সেটি এখন বলব না। আমি ব্যবস্থা করছি।’ শওকত ভাই দিয়ে গেলেন। ইউপিএলে গিয়ে মহিউদ্দিন ভাইকে বললাম, ‘এই বইটি ছাপুন। গল্পটি অনেক পুরনো আমলের, গদ্যে বৈচিত্র্য আছে।’ এভাবে বইয়ের ভালো দিকগুলো তাকে খুলে বললাম। আমি তখন তাদের রিসোর্সপারসন। তাদের সম্পাদক ছিল নঈম হাসান। নঈমকেও ব্রিফ করলাম। ‘প্রদোষে প্রাকৃতজন’ ছাপা হয়ে গেল।
‘চিলেকোঠার সেপাই’?
‘প্রদোষে প্রাকৃতজন’ যখন ছাপা হবে, তখন শওকত আলী আমাকে বললেন, “নাজির, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস ‘চিলেকোঠার সেপাই’ নামে একটা সিরিয়াল লিখছে সাপ্তাহিক রোববার-এ। ওটা ছেপো, খুব ভালো।” তখনো তার লেখা শেষ হয়নি। ইউপিএলে গিয়ে বলে এলাম, ‘বইটা লেখা শেষ হলে যেমন করেই হোক, সেটিকে অ্যাকোয়ার করে ছাপার ব্যবস্থা করেন।’ হাসানই দৌড়াদৌড়ি করে সব ঠিক করেছে। এর আগে আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের কোনো বই-ই ছিল না। তাকে কেউই চিনত না। তার বই কেন ছাপবে? শওকত আলীর রিকমেন্ডেশনের কারণে সহজেই ছাপা হলো।
‘পরার্থপরতার অর্থনীতি’তে তো আপনার কিছু অবদান আছে।
আকবর আলি খান তখন অর্থ সচিব, মহিউদ্দিন ভাইয়ের খুব ভালো বন্ধু। তিনি তার সঙ্গে দেখা করার জন্য সচিবালয়ে গিয়েছেন। আকবর আলি খান পাণ্ডুলিপিটা ধরিয়ে দিয়েছিলেন। মহিউদ্দিন ভাই বলেছিলেন, এটি তো নাজিরের হাতে পড়বে, সে কী করবে আমি বলতে পারব না। মহিউদ্দিন ভাইয়ের খুব ইচ্ছা ছিল, আমি বইটি যেন ছেপে দিই। পড়েই বুঝে ফেলেছিলাম, বইটির ভবিষ্যৎ আছে এবং আমি বইটির ওপরে একটু কাজও করে দিয়েছিলাম।
কী কাজ?
‘শব্দার্থকোষ’ করে দিয়েছিলাম। লেখক কিছুতেই রাজি ছিলেন না। তবে পাঠকের উপকার হয়েছে। মজার ব্যাপার হচ্ছে, এই ‘পরার্থপরতার অর্থনীতি’ নিয়ে যখন ‘দেশ’ পত্রিকায় রিভিউ হয়, তার প্রথম দুই প্যারাই হচ্ছে ওই শব্দার্থ নিয়ে আলোচনা। তারপর তারা বই নিয়ে আলোচনা করে। তখন আকবর আলি খান উপলব্ধি করেছেন, বইয়ের উন্নয়ন হয়েছে। এডিটর হিসেবে আমি এই ইনপুট দিয়েছি। তিনি স্বীকার করেছেন যে আমার কাছ থেকে পরামর্শ পেয়ে তার লাভ হয়েছে। তিনি এ কথা লিখেছেনও।
ইউপিএলে আর কী কাজ করেছেন?
ইউপিএলে থাকতে ২০০১ সালে বাংলাদেশে সর্বপ্রথম আমি চালু করেছিলাম ‘গ্র্যান্ড সেল’। ওদের অনেক পুরনো বই জমে ছিল। সেগুলো সের দরে বেচে না দিয়ে ডিসকাউন্টে বিক্রি করে দেওয়া হয়। ইউপিএল বছর কয়েক করার পর তো সবাই অনুকরণ করল। আমি যখন ইউপিএলে যাই, তখন বাংলাবাজারে কোনো কাউন্টার ছিল না, সেলস সেন্টার ছিল না। বাংলাবাজারের সেলস সেন্টার আমি তৈরি করেছি, যাতে বই বেচাকেনার সুবিধা হয়। তাতে ওদের বিক্রি বেড়েছিল। এরপর অনেকে সেলস সেন্টার করেছে।
মহিউদ্দিন আহমেদ আপনাকে কীভাবে দেখতেন?
ছোট ভাইয়ের মতো দেখতেন। বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিল। বেতন দিতেন ঠিকই, কিন্তু কর্মচারীর মতো কখনো ট্রিট করেননি। লেখাপড়া জানা লোক ছিলেন। পাঞ্জাব ইউনিভার্সিটি থেকে জার্নালিজম ইংলিশে ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট। ওখানেই লেকচারার হিসেবে জয়েন করেছিলেন। সেখান থেকে পাকিস্তান অক্সফোর্ড প্রেসের করাচি শাখায় যোগ দেন এডিটরিয়াল বিভাগে। স্বাধীনতার পর তৈরি করেন ইউপিএল।
আপনি বইয়ের মান উন্নয়ন করতেন কীভাবে?
দেখেন, বাংলাদেশের কোনো লেখক মনে করে না, তার লেখায় কারও হাত দেওয়ার অধিকার আছে। এ অবস্থায় মানোন্নয়ন করা খুবই দুরূহ। যারা সে সুযোগটা দেন, সেখানে কাজ করতে গিয়ে বাক্য বদলে দিতে হয়, প্রয়োজনে প্যারা ফেলে দিতে হয়, নতুন প্যারা লিখে দিতে হয়। হয়তো ঠিকভাবে উপসংহার টানতে পারেনি; উপসংহারটা নিজে থেকে লিখে দিতে হয়। কখনো লেখককে বলেও কাজটা করিয়ে নেওয়া যায়।
আপনার কর্মজীবনের মূল কাজটি কী ছিল?
বুক ডেভেলপমেন্টের কাজ। বাংলাদেশের বই উন্নয়নের যে কাজ, তার জন্যই আমি জীবন উৎসর্গ করেছি।
আমরা যারা বই লিখতে চাই, তাদের জন্য আপনার পরামর্শ কী?
একটি একটি করে বোঝানো মুশকিল। সেজন্য একেবারে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কী করতে হবে— সব ডিটেইলে একটা বই লিখেছি ‘বই প্রকাশে লেখকের প্রস্তুতি’। দুই নম্বর হচ্ছে ‘বাংলাদেশে গ্রন্থ প্রকাশনা’। তারপর লিখেছি ‘বাংলাদেশে গ্রন্থ উন্নয়ন’। গ্রন্থের প্রকৃত উন্নয়ন কীভাবে হবে, সেটির জন্য বইটি লেখা।
ছোটদের জন্যও তো আপনি বই লিখেছেন?
আমার রূপকথার বেশ কটি বই রয়েছে। এ বছরই প্রায় পাঁচটি ছোটদের বই বেরিয়েছে। মোট বই ১০-১২টি তো হবেই।
(৩০ জুন, ২০২৬, ধানমন্ডি, ঢাকা)





