সাইবার সিকিউরিটি এক্সপার্টদের গুরুত্ব বাড়ছে

মডেল: নাজিম ইসলাম; ছবি: সাজ্জাদ হোসেন
আমাদের জীবনের বড় একটি অংশ এখন ডিজিটালনির্ভর। তাই ডিজিটাল দুনিয়ার একজন গেটকিপার হতে কীভাবে প্রস্তুতি নিতে হবে, সেই রোডম্যাপ জানাচ্ছেন ভাওয়ান সাইবারটেক এফজেড এলএলসির দুবাই শাখার প্রজেক্ট ম্যানেজার এ বি এম কালিম উল্লাহ
ব্যাংকের অ্যাপ, মোবাইল ওয়ালেট, অনলাইন কেনাকাটা থেকে শুরু করে সরকারি ই-সেবা— প্রতিদিনের নানা কাজেই প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ছে। এর সঙ্গে বাড়ছে ডেটা চুরি, ফিশিং, র্যানসমওয়্যার ও অনলাইন প্রতারণার মতো সাইবার ঝুঁকিও। ফলে প্রতিষ্ঠান ও ব্যবহারকারীর তথ্য, অর্থ এবং ডিজিটাল নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সাইবার সিকিউরিটি বিশেষজ্ঞদের গুরুত্ব বাড়ছে। দেশে ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এই পেশায় তৈরি হচ্ছে চাকরির নতুন সুযোগ।
কর্মক্ষেত্রের পরিধি
সাইবার সিকিউরিটি নিয়ে কাজ করতে হলে প্রথমেই একটি ভুল ধারণা থেকে বেরিয়ে আসা জরুরি। অনেকের ধারণা, এই পেশা মানেই হ্যাকিং শেখা এবং এটি শুধু কম্পিউটার সায়েন্সের শিক্ষার্থীদের জন্য। বাস্তবে এর পরিধি অনেক বিস্তৃত। প্রযুক্তিগত দক্ষতার পাশাপাশি সাইবার ঝুঁকি বিশ্লেষণ, অডিট, আইন, কমপ্লায়েন্স, প্রকল্প ব্যবস্থাপনাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রেও এ ধরনের দক্ষ জনবল প্রয়োজন। ফলে প্রযুক্তির প্রতি আগ্রহ, শেখার মানসিকতা এবং প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জনের প্রস্তুতি থাকলে ভিন্ন শিক্ষাগত পটভূমি থেকেও এই পেশায় আসার সুযোগ রয়েছে। বিশেষ করে ব্যাংকিং, হিসাববিজ্ঞান, আইন বা ব্যবস্থাপনার মতো বিষয়ে পড়াশোনা করা কেউ নিজের বিষয়ভিত্তিক জ্ঞানের সঙ্গে সাইবার সিকিউরিটির দক্ষতা যুক্ত করতে পারলে কর্মক্ষেত্রে আলাদা সুবিধা পেতে পারেন।
প্রথম তিন মাস
সাইবার সিকিউরিটিতে কর্মজীবন শুরু করার আগে প্রযুক্তির মৌলিক বিষয়গুলো ভালোভাবে আয়ত্ত করতে হবে। প্রথম ধাপে নেটওয়ার্কিং সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা তৈরি করা প্রয়োজন। টিসিপি/ আইপি (ট্রান্সমিশন কন্ট্রোল প্রটোকল/ ইন্টারনেট প্রটোকল), ডিএনএস/ আইপি (ডোমেইন নেম সিস্টেম/ ইন্টারনেট প্রটোকল), ডিএনএস, এইচটিটিপি (হাইপারটেক্সট ট্রান্সফার প্রটোকল), এইচটিটিপিএস (হাইপারটেক্সট ট্রান্সফার প্রটোকল সিকিউর), ফায়ারওয়াল (নেটওয়ার্ক নিরাপত্তাব্যবস্থা বিশেষ) ও ভিপিএনের (ভার্চুয়াল প্রাইভেট নেটওয়ার্ক) মতো বিষয়গুলো সম্পর্কে জানা থাকা জরুরি। এর পাশাপাশি অপারেটিং সিস্টেম— লিনাক্স ও উইন্ডোজের কমান্ড লাইন ব্যবহারের দক্ষতা তৈরি করা দরকার। স্ক্রিপ্টিংয়ের জন্য পাইথন (প্রোগ্রামিং ল্যাঙ্গুয়েজ বিশেষ) ও ব্যাশ (বোর্ন অ্যাগেইন শেল) এবং ডেটাবেজের কাজের জন্য এসকিউএল (স্ট্রাকচারড কুয়েরি ল্যাঙ্গুয়েজ) শেখাও গুরুত্বপূর্ণ। এই ভিত্তি পরবর্তী ধাপের জটিল বিষয়গুলো বুঝতে সহায়তা করবে।
মূল ধারণা আয়ত্ত
ভিত্তি তৈরির পর সাইবার সিকিউরিটির মৌলিক ধারণাগুলোতে মনোযোগ দিতে হবে। গোপনীয়তা, অখণ্ডতা ও সহজলভ্যতা— গুরুত্বপূর্ণ তিনটি স্তম্ভ সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকা দরকার। এর সঙ্গে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, এনক্রিপশন, পরিচয় ও প্রবেশাধিকার ব্যবস্থাপনা এবং ওয়েব অ্যাপ্লিকেশনের সাধারণ দুর্বলতা সম্পর্কে জানা জরুরি। এ ক্ষেত্রে ‘ওডব্লিউএএসপি (ওপেন ওয়েভ অ্যাপ্লিকেশন সিকিউরিটি প্রজেক্ট) টপ টেন’ একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশিকা। শুরুতে ‘কম্পটিয়া (কম্পিউটিং টেকনোলজি ইন্ডাস্ট্রি অ্যাসোসিয়েশন) সিকিউরিটি প্লাস’ ধরনের স্বীকৃত সনদও ভালো ভিত্তি তৈরি করতে পারে।
যা শেখা হচ্ছে, তা ব্লগ বা লিংকডইনে নোট আকারে তুলে ধরলে পরে কাজগুলো নিজের পোর্টফোলিও হিসেবে ব্যবহারের সুযোগ তৈরি করে
হাতে-কলমে
সাইবার সিকিউরিটি শুধু বই পড়ে শেখার বিষয় নয়। বাস্তব পরিস্থিতিতে কীভাবে নিরাপত্তাজনিত দুর্বলতা শনাক্ত ও বিশ্লেষণ করতে হয়, সে জন্য নিয়মিত হাতে-কলমে অনুশীলন প্রয়োজন। ‘ট্রাইহ্যাকমি’ ও ‘হ্যাক দ্য বক্স’-এর মতো প্ল্যাটফর্মে অনুশীলন করা যেতে পারে। পাশাপাশি সিটিএফ (ক্যাপচার দ্য ফ্ল্যাগ) প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া এবং ভার্চুয়াল ল্যাব তৈরি করে ওয়্যারশার্ক, এনম্যাপ (নেটওয়ার্ক ম্যাপার) ও স্প্লাঙ্ক বা ইএলকে (ইলাস্টিকসার্চ, লগস্ট্যাশ অ্যান্ড কিবানা)-এর মতো টুল ব্যবহারের অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারেন। যা শেখা হচ্ছে, তা ব্লগ বা লিংকডইনে নোট আকারে তুলে ধরলেও উপকার পাওয়া যায়। এগুলো ধীরে ধীরে নিজের কাজের পোর্টফোলিও হিসেবে ব্যবহারের সুযোগ তৈরি করে।
দক্ষতা অনুযায়ী কাজ বাছাই
সাইবার সিকিউরিটির ক্ষেত্রটি বড় হওয়ায় প্রাথমিক ধারণা তৈরির পর নিজের আগ্রহ ও দক্ষতা অনুযায়ী একটি বিশেষায়িত ক্ষেত্র বেছে নেওয়া ভালো। এসওসি (সিকিউরিটি অপারেশনস সেন্টার) অ্যানালিস্ট হিসেবে কাজ করলে প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও সাইবার ঘটনা মোকাবিলায় ভূমিকা রাখতে হয়। পেনিট্রেশন টেস্টাররা আক্রমণকারীর দৃষ্টিকোণ থেকে একটি সিস্টেমের দুর্বলতা পরীক্ষা করেন। আবার জিআরসি (গভর্ন্যান্স, রিস্ক অ্যান্ড কমপ্লায়েন্স) ও অডিটের সঙ্গে যুক্ত পেশাজীবীরা প্রতিষ্ঠানের নীতিমালা, ঝুঁকি ও কমপ্লায়েন্স যাচাই করেন। এর বাইরে ক্লাউড সিকিউরিটি ও ডিজিটাল ফরেনসিকসও দ্রুত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। নিজের লক্ষ্য অনুযায়ী সিইএইচ (সার্টিফায়েড এথিক্যাল হ্যাকার), সিআইএসএ (সার্টিফায়েড ইনফরমেশন সিস্টেমস অডিটর), সিআইএসএম (সার্টিফায়েড ইনফরমেশন সিকিউরিটি ম্যানেজার) বা সিআইএসএসপির (সার্টিফায়েড ইনফরমেশন সিস্টেমস সিকিউরিটি প্রফেশনাল) মতো পেশাগত সনদ বেছে নেওয়া যেতে পারে। তবে শুধু সনদ অর্জনের চেয়ে বাস্তব দক্ষতা তৈরিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।
বাংলাদেশে কর্মক্ষেত্র
দেশে সাইবার সিকিউরিটিতে কাজ করতে চাইলে স্থানীয় আইন, নীতিমালা ও শিল্পভিত্তিক নিরাপত্তা কাঠামো সম্পর্কেও ধারণা থাকা দরকার। সাইবার সুরক্ষা আইন, বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যপ্রযুক্তি নিরাপত্তা নির্দেশিকা, আইএসও ২৭০০১ এবং কার্ড পেমেন্টের ক্ষেত্রে পিসিআই ডিএসএসের (পেমেন্টে কার্ড ইন্ডাস্ট্রি ডেটা সিকিউরিটি স্ট্যান্ডার্ড) মতো বিষয়গুলো জানা গুরুত্বপূর্ণ। ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, টেলিকম, সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠান ও সরকারি সংস্থায় সাইবার সিকিউরিটিতে দক্ষদের চাহিদা রয়েছে। একই সঙ্গে রিমোট কাজের সুযোগ নিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারেও প্রবেশের দরজা এ ক্ষেত্রে সবসময়ই উন্মুক্ত।
কোথায় শিখবেন
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগের অধীনে সাইবার সিকিউরিটিতে উচ্চশিক্ষার সুযোগ রয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগের অধীনে প্রফেশনাল মাস্টার্স ইন ইনফরমেশন অ্যান্ড সাইবারনিরাপত্তা প্রোগ্রাম পরিচালিত হয়। পেশাজীবীদের কথা বিবেচনায় রেখে সাজানো এই প্রোগ্রামে তথ্যপ্রযুক্তি অবকাঠামো সুরক্ষা ও করপোরেট পর্যায়ে সাইবার ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা গুরুত্ব পায়। এ ছাড়া বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস-এ মাস্টার ইন সাইবারনিরাপত্তা এবং ইনফরমেশন সিস্টেমস নিরাপত্তা বিষয়ে উচ্চশিক্ষা দেওয়া হয়। দুই বছরমেয়াদি এই কোর্সে চাকরিজীবীদের সুবিধা বিবেচনায় ছুটির দিনে ক্লাসের ব্যবস্থা রয়েছে।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়
আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশে বিএসসি ইন কম্পিউটার নেটওয়ার্ক অ্যান্ড সাইবার সিকিউরিটি প্রোগ্রাম রয়েছে। যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব সেন্ট্রাল ল্যাঙ্কাশায়ারের সহযোগিতায় ইউনিভার্সাল কলেজ বাংলাদেশ বিএসসি ইন সাইবার সিকিউরিটি প্রোগ্রাম পরিচালনা করে। ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে এমএসসি ইন কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং প্রোগ্রামের শিক্ষার্থীরা মেজর হিসেবে সাইবার সিকিউরিটিকে বেছে নিতে পারেন। ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটিতে এমএসসি ইন সাইবার সিকিউরিটি প্রোগ্রামে থিসিস ও প্রজেক্ট দুটি ট্র্যাক রয়েছে। ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের এমএসসি ইন সাইবার সিকিউরিটি প্রোগ্রামেও পড়ার সুযোগ রয়েছে।
মাহফুজ কায়সার



