পড়ার বিষয়
তৈরি হচ্ছেন আগামীর ফার্মাসিস্ট

গবেষণাগারে ট্যাবলেট বানানোর মেশিন চালাচ্ছেন ছাত্রছাত্রীরা
সাভারের গণবিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মাসি বিভাগের একদল শিক্ষার্থী দাঁড়িয়ে আছেন দেশের অন্যতম শীর্ষ ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ইবনে সিনা ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের উৎপাদন ইউনিটে। সাদা অ্যাপ্রোন, মাথায় হেয়ার ক্যাপ, মুখে মাস্ক। কয়েক মুহূর্ত আগেও যেসব ট্যাবলেট, ক্যাপসুল কিংবা স্টেরাইল ইনজেকশনের উৎপাদন প্রক্রিয়া ছিল শুধু পাঠ্যবইয়ের অধ্যায়, এখন সেগুলো ঘটছে তাদের চোখের সামনেই। বিশাল স্টেইনলেস স্টিলের রিঅ্যাক্টর, জীবাণুমুক্ত উৎপাদন ইউনিট, মান নিয়ন্ত্রণের সূক্ষ্ম পরীক্ষা আর স্বয়ংক্রিয় প্যাকেজিং লাইনের প্রতিটি ধাপ যেন শেখাচ্ছিল, একটি ওষুধ তৈরি হয় শুধু রাসায়নিক উপাদানে নয়; নিখুঁত বিজ্ঞান, কঠোর মাননিয়ন্ত্রণ আর মানুষের জীবনের প্রতি গভীর দায়বদ্ধতায়। ক্যাম্পাসে ফেরার পথে অনেকের মুখে একই কথা, আজ যেন প্রথমবার সত্যিকার অর্থে বুঝলাম, আমরা শুধু ফার্মেসি পড়ছি না; মানুষের সুস্থ জীবন গড়ে তোলার এক বিশাল দায়িত্বের জন্য নিজেদের প্রস্তুত করছি।
‘এই বিভাগের শিক্ষাদর্শ প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর ভাবনা থেকে এসেছে। তিনি এমন এক প্রজন্ম তৈরি করতে চেয়েছিলেন, যারা শুধু পেশাগত দক্ষতায় সীমাবদ্ধ থাকবে না, সমাজের জন্যও কাজ করবে। সেজন্য আমরা ছাত্রছাত্রীদের অ্যাকাডেমিক ও কর্মজীবনের জন্য প্রস্তুত করছি’— বললেন তানিয়া আহমেদ। গণবিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মাসি বিভাগের তিনি সহকারী অধ্যাপক। তার বিভাগটিতে ৫০তম ব্যাচ চলছে। ৪৩তম থেকে ৫০তম ব্যাচ পর্যন্ত মোট ছাত্রছাত্রী পাঁচশর বেশি। অনেক ছাত্রছাত্রী উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার জন্য বিদেশে যাচ্ছেন। অ্যাকাডেমিক কার্যক্রমের পাশাপাশি সহশিক্ষা কার্যক্রমেও ছাত্রছাত্রীদের সক্রিয় সম্পৃক্ততা আছে। ছাত্র সংসদ থেকে শুরু করে বিভিন্ন সংগঠনে ফার্মাসি বিভাগের ছাত্রছাত্রীরা নেতৃত্ব দিচ্ছেন। পাশাপাশি তারা নিয়মিত জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সেমিনার, এক্সপো ও অ্যাকাডেমিক আয়োজনে অংশ নিচ্ছেন।
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন এবং বাংলাদেশ ফার্মাসি কাউন্সিলের নির্দেশনার ভিত্তিতে কারিকুলাম প্রণয়ন ও নিয়মিত হালনাগাদ করা হয়। শিল্প খাতের সঙ্গে সংযোগ জোরদার করতে ইন্ডাস্ট্রি ভিজিট, বিশেষজ্ঞদের ক্লাস ও সেমিনারের আয়োজন করা হয়। বিভাগে রয়েছে সমৃদ্ধ সেমিনার লাইব্রেরি, সেখানে ফার্মাসির বিপুল বই ও গবেষণাসামগ্রী আছে। শিক্ষকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে পাঠদানের মান উন্নয়নে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
ফার্মাসি শিক্ষার মূল শক্তি গবেষণাগার। বিভাগটিতে রয়েছে ৯টি আধুনিক ল্যাবরেটরি ও দুটি গবেষণাগার, যেখানে ছাত্রছাত্রীরা হাতে-কলমে পরীক্ষণ ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে শেখার সুযোগ পান। ল্যাব সুবিধা উন্নয়নে নতুন যন্ত্রপাতি সংযোজনসহ ধারাবাহিক উদ্যোগ চলমান। ৪৭তম ব্যাচের ছাত্রী সুদীপা বিশ্বাস বলেন, ‘আমার কাছে গবেষণা মানে নতুন কিছু খুঁজে বের করা এবং সমস্যার সমাধান খোঁজা।’ তাদের মেডিসিনাল গার্ডেনে শতাধিক ঔষধি উদ্ভিদ রয়েছে। গবেষণার ক্ষেত্রে বিভাগটি সময়োপযোগী বিষয়গুলোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধ কমাতে নতুন রাসায়নিক কাঠামো নিয়ে কাজ চলছে এবং ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে সম্ভাবনাময় নতুন যৌগ উন্নয়নের প্রকল্প এগিয়ে যাচ্ছে। উন্নত কম্পিউটেশনাল কেমিস্ট্রির মাধ্যমে বিভিন্ন রোগের জন্য কার্যকর যৌগ শনাক্তের কাজও পরিচালিত হচ্ছে। প্রি-ক্লিনিক্যাল গবেষণাগার ও অ্যানিমাল হাউসে ডিমেনশিয়া, ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, লিভার ও কিডনি-সংক্রান্ত বিভিন্ন রোগ নিয়ে বিস্তৃত গবেষণা চলছে। বিভাগীয় প্রধান ড. রোজিনা পারুল বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য দক্ষ ও দায়িত্বশীল গ্র্যাজুয়েট তৈরি করা, যারা দেশের স্বাস্থ্য খাতে কার্যকর অবদান রাখতে পারে। পাসের পর ছাত্রছাত্রীদের কর্মসংস্থানের হার প্রায় ৮০ শতাংশ। গবেষণা কার্যক্রম জোরদার, আধুনিক ল্যাব সুবিধা সম্প্রসারণ এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বৃদ্ধির মাধ্যমে আমরা বিভাগটিকে আরও এগিয়ে নিতে চাই।’ ৪৬তম ব্যাচের ছাত্র আরাবী ইমরোজ বলেন, ‘এখানে তাত্ত্বিক শিক্ষার পাশাপাশি সহায়ক শেখার পরিবেশ রয়েছে এবং শিক্ষকরা ছাত্রছাত্রীদের প্রতি আন্তরিক। গবেষণা ও শিল্প খাতের সঙ্গে সংযোগ আরও বিস্তৃত হলে ছাত্রছাত্রীরা ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ারের জন্য আরও ভালোভাবে প্রস্তুত হতে পারবে।’




