প্রবীণ উৎসব
আপনারা হৃদয় নিয়ে পাশে দাঁড়ান

কুমারখালীতে প্রবীণ উৎসবে আগত প্রবীণদের একাংশ। ছবি তুলেছেন মহুবার রহমান
কেউ এলেন নাতি-নাতনির হাত ধরে, কেউ লাঠিতে ভর দিয়ে। অনেক প্রবীণ এলেন তরুণের মতো দৃপ্ত পায়ে হেঁটে। চারশ মানুষের ধারণক্ষমতাসম্পন্ন মিলনায়তনে দুই শতাধিক আসন পূর্ণ করলেন প্রবীণরা।
বলছি প্রবীণ উৎসবের কথা। ২৪ অক্টোবর কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে অনুষ্ঠিত হলো এই আনন্দ আয়োজন। সকাল সাড়ে ১০টায় শুরু হয়ে অনুষ্ঠান চলল হেমন্তের বিকাল পর্যন্ত।
আয়োজনের উদ্যোক্তা দ্য প্রিমিয়াম হোমস লিমিটেড ও দৈনিক আগামীর সময়। প্রবীণদের আলাপচারিতা ও উৎসবের কিছু খণ্ডচিত্রের মধ্য দিয়ে আনন্দময় আয়োজনটির আবহ তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে। লিখেছেন দন্ত্যস রওশন
হৃদয় নিয়ে আসুন
বাংলাদেশের প্রথম হার্ট সার্জন ডা. সিরাজুর রহমান খান। তিনি এস আর খান নামে পরিচিত। বাংলাদেশে প্রথম হার্টের অস্ত্রোপচার করেছিলেন তিনি, ১৯৮১ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর, জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে। এখন কুষ্টিয়া শহরে নিজের বাসায় পরামর্শসেবা দেন।
মঞ্চে দাঁড়িয়ে হাসিমুখে বললেন, ‘হৃদয় নিয়ে আমার কাছে আসুন, হৃদয়ের পরামর্শ নিন।’ দর্শক সারির একজন বললেন, আপনারা হৃদয় নিয়ে পাশে দাঁড়ান। খুবই রসিক মানুষ তিনি। সারাক্ষণ মুখে হাসি লেগে থাকে। চলাফেরা করেন একজন তরুণের মতো। আশি পেরিয়েছেন।
কী খবর, দোস্ত?
কতজনের সঙ্গে কতজনের দেখা! কতদিন পর! প্রবীণ উৎসব সেই সুযোগ করে দিল। পরিচিতজন, আপনজন, বন্ধুর সঙ্গে দেখা। নতুন করে বন্ধুত্ব। ‘কেমন আছেন? নাতি-নাতনি কয়জন? ছেলেরা দেখভাল করে তো?’
প্রবীণদের মধ্যে কত কথা জমে থাকে! কথা বলার একটা সুযোগও তো দরকার। উৎসবে দেখা গেল দুই প্রবীণের মধুর ঘনিষ্ঠতা।
সহায়হীন
কুমারখালী শহরে ঘুরে বেড়ান। অন্যের সহযোগিতায় বেঁচে আছেন। তিনিও উৎসবে শরিক হয়েছিলেন। আমাদের আলোকচিত্রী মহুবার রহমান তার চোখ পরীক্ষা করাতে সহযোগিতা করলেন। একজন স্বেচ্ছাসেবক তাকে পরিয়ে দিলেন উৎসবের উত্তরীয়।
আশির হাসি
মাইকে অনুরোধ করলাম, ‘যারা আশি বছর পার করেছেন, তারা যদি দয়া করে দর্শকসারি থেকে উঠে আসতেন!’
আশি পেরোনো প্রবীণরা চেয়ার ছেড়ে উঠে এলেন। ক্যামেরা তাক করা হলো তাদের দিকে। ছবি উঠছে। সবাই খুব খুশি। তারা আশি পেরিয়েছেন!
আমি একজনের দিকে হাত বাড়িয়ে বললাম, ‘আপনি চলে আসুন।’ তিনি মুখ ভার করে বললেন, ‘আমার এখনো আশি হয়নি। তিন বছর কম আছে।’
দলগত ছবিতে থাকতে পারলেন না বলে তার মন খারাপ হলো।
পুঁথিপাঠ
প্রবীণদের মধ্যে অনেকে সৃজনশীল কাজের মধ্য দিয়েও সময় কাটান। মজিবর রহমান মঞ্চে উঠে নিজের লেখা পুঁথি পাঠ করে শোনালেন। দুজন প্রবীণ, নবীনদের সঙ্গে একটি নাটিকায়ও অংশ নিয়েছিলেন।
বয়স যে সৃজনশীলতার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে না, এই আয়োজন তারই প্রমাণ।
দাদা-নাতনি
উৎসবে প্রবীণদের সঙ্গে এসেছিলেন তাদের নাতি-নাতনিরাও। শুধু তা-ই নয়, দাদা আব্দুর রাজ্জাক তার নাতনির সঙ্গে নিজের লেখা নাট্যাংশ পাঠ করলেন। দুজনের কথোপকথন শুনে মুগ্ধ হলেন অনেক প্রবীণ।
আয়োজনে শিশু-কিশোরদের উপস্থিতিও কম ছিল না। তারা মঞ্চে সাংস্কৃতিক পরিবেশনায় অংশও নিয়েছে। নাতি-নাতনিদের সঙ্গে নিয়ে প্রবীণদের এই মিলনমেলা দুই প্রজন্মের মধ্যে তৈরি করেছিল আনন্দময় সেতু।
নেপথ্যের কলাকুশলী
আবু নোমান সজীব
প্রথমেই ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা কবি, নাট্যকার লিটন আব্বাস ভাইয়ের প্রতি। মধ্যাহ্নভোজের দায়িত্বে ছিলেন মীর ফরহাদ ফয়সাল রনি ও আশরাফুল আলম হিরু ভাই। সকালের নাশতার পাশাপাশি দিনভর চা সরবরাহে বকুল হোসেন ও জাহান আলী অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন। প্রবীণদের যে উত্তরীয় পরিধান করিয়ে দেওয়া হয়, এর নকশা ও পুরো প্রক্রিয়ার নেপথ্যে ছিলেন মেহেদী হাসান টিটু। যে স্মারক মগ প্রবীণদের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে, এর কৃতিত্ব মীর ফরহাদ ফয়সাল রনি ভাইয়ের। অসচ্ছল প্রবীণদের হাতে স্টেইনলেস স্টিলের যে লাঠি তুলে দেওয়া হয়েছে, তার জোগানে ছিলেন কাজী সাইফুল ও সোহান। নিবন্ধনে বাবুল পিয়ার, মেহেদী হাসান, আব্দুর রাজ্জাক, এম এ ওহাব, শিমুল ও রাকিব রেখেছেন অনবদ্য ভূমিকা। আর্কাইভের দায়িত্ব পালন করেছেন নাসির মাস্টার, ডা. মজিবর রহমান, নীলু শেখ, মোতালেব হোসেন এবং আব্দুর রাজ্জাক। সাগর হোসেন, ফাবিহা ইবনাথ এবং ব্লাড ডোনার্স ক্লাবের সদস্যরা দিনভর পরিশ্রম করেছেন। আয়োজনকে প্রাণবন্ত করে তোলেন শিল্পী জিয়াউর রহমান মানিকের পরিচালনায় কুমারখালী সংগীত বিদ্যালয়ের শিল্পীরা। এতে ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছেন শিল্পী চয়ন এবং কিয়াম বিশ্বাস। নাটিকায় রবীউল করিম, বিশ্বনাথ কর্মকার, হৈমন্তী, রাজ্য, স্নিগ্ধ, মুগ্ধ, মীমসহ সংগীত বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পরিবেশনা ছিল মনে রাখার মতো।
ব্যানার, ফেস্টুন, ফ্লেয়ার ও আমন্ত্রণপত্র তৈরিতে ভূমিকা রাখেন মীর সাদাত হোসেন শুভ এবং কম্পোজের দায়িত্ব পালন করেন মুজিব আলম। বিশেষ ভূমিকা রাখেন তুষার আহমেদ রেজা, মেহেদী হাসান, জয় সিংহ , সোহাগ ভাই, ডমেন ভাই, শুভ করিম, টিপু ভাই, নীলু ভাই ও জাহান ভাই। গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন নাট্যকার জে এ রতন এবং সাংবাদিক মাহবুব-উল আহসান উল্লাস, দন্ত্যস রওশন ও নাজির হোসেন ভাই।









