মৃত্যুর আগে মরা যাবে না

কাশবনে সস্ত্রীক জাহাঙ্গীর হোসেন
২০২০ সালে পুরো বিশ্ব যখন করোনার লকডাউনে, ঠিক তখনই আমার ডিফিউজ পেরিটোনিয়াল মেসোথেলিওমা নামের এক গুরুতর ক্যানসার ধরা পড়ে। ঢাকার ডাক্তার কন্যাকে আড়ালে নিয়ে বললেন, ‘সময় বেশি নেই, স্টেজ ফোর, সপ্তাহ দুয়েক বাঁচতে পারে!’ কন্যা সিঙ্গাপুর, ব্যাংককের নামকরা হাসপাতালে যোগাযোগ করেও কিছু করতে পারল না। কারণ বিমান, ভিসা সব বন্ধ। শুধু ভারত মেডিকেল ভিসা দিল। বিমানে চড়ে কলকাতার টাটা ক্যানসার হাসপাতালে পৌঁছালাম। প্রায় দুমাস নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর টাটার টিম বলল, হ্যাঁ, ক্যানসারটি খুবই অ্যাগ্রেসিভ; তাই অপারেশন করতে হবে। খরচ হবে ১৮ লাখ রুপি। অপারেশন শেষে ডা. বিপ্রদাস রায় বললেন, ‘ঘাবড়াবেন না। ভয় পেলে ক্যানসার চেপে ধরবে, ছিনিয়ে নেবে জীবন। দেশে গিয়ে শখের ছাদবাগান আর লেখালেখিতে মগ্ন থাকুন।’ তাই করলাম, ক্যানসারকে ভুলে থাকতে ছাদবাগানে পুরো মনোযোগ আর লেখালেখিতে মগ্ন থাকলাম। ২০২১ সালের মাঝামাঝি আবার ফিরে এলো ক্যানসার। কেমো দিতে শুরু করলাম প্রতি ২১ দিন পরপর। কিন্তু ৪০ সাইকেল কেমো দেওয়ার পর মাথার একটা চুলও পড়ল না। কারণ, সারাক্ষণ ব্যস্ত থাকি বৃক্ষরোপণ আর লেখালেখি নিয়ে। তবে কেমোথেরাপি শেষে বাঁ হাতটা অবশ হয়ে যায়। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে চীনের শিয়ানে গিয়ে নানা পরীক্ষা করাই। চিকিৎসকের পরামর্শে আকুপাংচারসহ চীনা লোকজ চিকিৎসা শুরু করি। মাত্র ১৮ দিনের থেরাপিতে হাত ৫০ শতাংশ ভালো হয়। এরপর ২০২৫ সালের শেষ দিকে সাংহাই ফুদান ক্যানসার হাসপাতালে আবার চিকিৎসা নিই। ৫৬ সাইকেল কেমোথেরাপি শেষ হওয়ায় চিকিৎসক কেমো বন্ধ করে চীনা ভেষজ ও বিভিন্ন সাপ্লিমেন্ট খাওয়ার পরামর্শ দেন। বর্তমানে ৩২ ধরনের চীনা ভেষজ ও সাপ্লিমেন্ট নিয়মিত গ্রহণ করছি। আমি জানি, বিশ্বে কেউ অমর নয়। কেমোর বিষক্রিয়ায় সব ক্যানসার রোগী একদিন মারা যাবেই। কিন্তু মৃত্যু নামক অমোঘ সত্যকে অগ্রাহ্য করে আমি স্বাভাবিক জীবনকে হাসি-আনন্দ, দুঃখ-বেদনার মাঝেই এখনো টিকে আছি। এর নামই হয়তো ক্যানসার রোগীর জীবন! ক্যানসার আক্রান্ত সহযোদ্ধাদের বলব, হাল ছাড়বেন না; যুদ্ধ চালিয়ে যান, যতদিন পারেন। ক্যানসার পরাস্ত হবে এবং শেষতক হয়তো আপনিও পরাজিত হবেন ক্যানসারের কাছে! কিন্তু মৃত্যুর আগে মরবেন কেন!
লেখক: সাবেক উপসচিব, শিক্ষা মন্ত্রণালয়



