সুরের মানুষ শান্তি চৌধুরী

ছবি: মহিম উদ্দিন পৃথিবী
ফেনী শহরের গুণীজন শান্তি রঞ্জন রায় চৌধুরী। সংগীতের সাধনায় কেটে গেছে যার পাঁচ দশক। তালিম দিচ্ছেন অসংখ্য সংগীত শিক্ষার্থীকে। করছেন সামাজিক আন্দোলন। তার সঙ্গে আড্ডা দিয়েছেন আসাদুজ্জামান দারা
শহর যখন আড়মোড়া ভেঙে বিছানা ছাড়ার প্রস্তুতি নেয়, তখন শান্তি রঞ্জন রায় চৌধুরী যান গানের কাছে। প্রায় এক ঘণ্টা রেওয়াজ করেন। এই অভ্যাসের বয়সও কম নয়। জীবনের অর্ধশতক পেরিয়ে গেছে সুরের সঙ্গে।
‘প্রতিদিন ভোরে ঘুম থেকে জেগে ঘণ্টাখানেক রেওয়াজ না করলে দিনের শুরুটা যেন ভালো হয় না। আধুনিক গানের পাশাপাশি গণসংগীতের চর্চা করি নিয়মিত। এতে ভেতর থেকে একটা শক্তি পাই,’ বললেন শান্তি চৌধুরী।
বয়স ৬৫ পেরিয়েছে। নিয়ম করে আধুনিক গান করেন, ঝালিয়ে নেন চেনা গণসংগীতগুলো। কখনো কোনো শিষ্যের গলায় আটকে থাকা সুর ঠিক করে দেন। কোথা থেকে আসে সেই শক্তি, তারও একটা ব্যাখ্যা আছে তার কাছে।
‘সংগীতের একটা আলাদা শক্তি আছে, ক্ষমতা আছে। আপনি যখন ক্লান্ত, অবসন্ন হয়ে পড়বেন, জগতের সব হতাশা যখন আপনাকে গ্রাস করবে— তখন গান শুনুন। দেখবেন, সুর থেকে নতুন করে শক্তি পাচ্ছেন।’
কী করে এলেন তিনি এই সংগীতের মহাসাগরে?
১৯৭৫ সালে ফেনী সেন্ট্রাল উচ্চবিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির ছাত্র। ছোট বোন স্বপ্না রায় চৌধুরী গান শিখতেন চট্টগ্রামের ওস্তাদ সমীরণ চক্রবর্তী বাদলের কাছে। ওস্তাদ ফেনীতে এসে তাকে তালিম দিতেন। বোনের গান শেখা দেখতে দেখতে ইচ্ছা হলো— তিনিও শিখবেন। বাবা শিবময় রায় চৌধুরী ছেলের ইচ্ছার কথা শুনে রাজি হয়ে গেলেন। বোনের সঙ্গে বসেই শুরু হলো গান শেখা।
সমীরণ চক্রবর্তীর কাছে প্রথম তালিম। পরে ওস্তাদ রুহুল আমিন গেদু, ওস্তাদ জালাল আহমেদ, মিন্টু কৃষ্ণ পালসহ আরও কয়েকজনের কাছে শিখেছেন।
কৈশোরেই যুক্ত হন ‘কুহেলী সাংস্কৃতিক সংঘে’। ফেনী শিশুনিকেতন হলে ক্লাস ও মহড়া চলত। কৈশোরের সেই দিনগুলো স্মরণ করলেন এভাবে, ‘সে সময় আমরা দেশাত্মবোধক, পল্লীগীতি ও নজরুলসংগীত শিখতাম ও পরিবেশন করতাম। একদিকে বাসায় ওস্তাদ সমীরণ চক্রবর্তী বাদলের কাছে শিখেছি, আরেকদিকে কুহেলীতে এসে পূর্ণেন্দু বাবুর কাছে শিখছি।’
ফেনীতে তখন গিটার বাজানো মানুষ খুব বেশি ছিলেন না। শান্তি চৌধুরীর গিটার শেখার গল্পে তাই একটা সময় যেন ধরা পড়ল। ফেনী বাজারের কমলাপট্টি শাখা অগ্রণী ব্যাংকে চাকরি করতেন রাজশাহীর খলিলুর রহমান সেলিম। শান্তি চৌধুরী মাঝেমধ্যে তার বাসায় যেতেন। সেলিম গিটার বাজাতেন, শান্তি খালি গলায় গান করতেন। একদিন সেলিম বললেন, ‘আপনি গিটার শিখে নিন। ফেনীতে কেউ গিটার বাজায় বলে আমার জানা নেই। আমার বদলির চাকরি। আপনি গিটার শিখে নিলে বাজাতেও পারবেন, শেখাতেও পারবেন।’ কথাটা মনে ধরে গেল তার।
১৯৮৩-৮৪ সালের দিকে কয়েকজন বন্ধু মিলে গড়ে তুলেছিলেন ‘নিক্কন’ শিল্পীগোষ্ঠী। অল্প অল্প করে টাকা জমাতেন আর একটা-দুটো করে বাদ্যযন্ত্র কেনা হতো
কি-বোর্ড শেখার পেছনে ছিলেন বন্ধু জগলুল পাশা। চট্টগ্রামের রুটস ব্যান্ডে কি-বোর্ড বাজাতেন তিনি। ফেনীতে এলে একসঙ্গে গান হতো। তার উৎসাহেই কি-বোর্ড শেখা।
এই শেখাগুলোই একসময় তাকে শিক্ষক করে তুলল। ফেনীতে গিটার ও কি-বোর্ড তালিম দিয়েছেন অসংখ্য শিল্পীকে। গত চার দশকে শতাধিক শিল্পী তার কাছে আধুনিক গান, নজরুলসংগীত ও গণসংগীত শিখেছেন। তার অনেক শিষ্য আজ বিটিভি ও বেতারে গান করছেন।
১৯৮৩-৮৪ সালের দিকে কয়েকজন বন্ধু মিলে গড়ে তুলেছিলেন ‘নিক্কন’ শিল্পীগোষ্ঠী। নিজেদের টাকায় বাদ্যযন্ত্র কিনতেন। অল্প অল্প করে টাকা জমাতেন, আর একটা-দুটো করে বাদ্যযন্ত্র কেনা হতো। মহড়া চলত, অনুষ্ঠানও হতো। সেই দিনগুলোর কথা কণ্ঠে ঝরে পড়ল এভাবে— ‘ফেনী সরকারি কলেজ ও শিল্পকলার নানা উৎসবে আমরা গান করতাম। চারদিকে নিক্কন শিল্পীগোষ্ঠীর সুনাম ছড়িয়ে পড়ল। কখনো শিশুনিকেতন, কখনো জেলা পরিষদ, কখনো জহির রায়হান হল, আবার কখনো ফেনী কলেজ মাঠে আমাদের মহড়া চলত।’
যৌবনের একটা বড় সময় কাটিয়েছেন ফেনীর জহির রায়হান হলকে কেন্দ্র করে। তার আলাপে এলো সেই সব দিনের কথা—
‘আমাদের যৌবনের বিশাল সময় আমরা জহির রায়হান হলে কাটিয়েছি। হলের দোতলায় ছিল শিল্পকলা একাডেমি এবং উচ্ছ্বাস সাংস্কৃতিক কেন্দ্র। সেখানে আমরা নিয়মিত চর্চা করতাম। সারা বছর হলটিতে নানা অনুষ্ঠান হতো। আমরা কোথাও গাইতাম, কোথাও শুনতাম।’ ২০০৮ সালে হলটি ভেঙে ফেলা হয়। তার শুধুই মনে হয়, ফেনীর সাংস্কৃতিক জীবনকে আবার জাগাতে হলে জহির রায়হান হলের মতো একটি জায়গা দরকার।
১৯৮০ সালে কুমিল্লার পল্লী উন্নয়ন একাডেমি মাঠে লিও ক্লাবের আয়োজিত সংগীত প্রতিযোগিতায় সারা দেশের প্রতিযোগীদের মধ্যে চ্যাম্পিয়ন হন তিনি। শিল্পকলা একাডেমি ও ঋষিজ শিল্পীগোষ্ঠীর গণসংগীত প্রতিযোগিতায় পুরস্কারও পেয়েছেন। ২০১৫ সালে ফেনী শিল্পকলা একাডেমি তাকে দিয়েছে গুণীজন পদক।
ফেনীতে প্রতিষ্ঠা করেছেন ‘উদয়ন সাংস্কৃতিক কেন্দ্র’। পাশাপাশি ফেনী ডেভেলপমেন্ট কমিউনিটি— এফডিসির সাধারণ সম্পাদক হিসেবে সামাজিক কাজ করছেন। পূর্ণাঙ্গ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ, শহীদ জহির রায়হান হল নির্মাণসহ নানা দাবিতে কাজ করছে সংগঠনটি। বৃক্ষরোপণ, শিক্ষাবৃত্তি, অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোসহ আরও কিছু কর্মসূচি রয়েছে।
শহর বদলেছে। নিক্কনের বন্ধুরা ছড়িয়ে পড়েছেন জীবিকার টানে। কিন্তু ভোর হলে শান্তি চৌধুরী এখনো রেওয়াজ করেন। এই ৬৫-তে কণ্ঠে ঝরে পড়ল দৃঢ়তা— ‘যতদিন বেঁচে আছি, সংগীত সাধনার পাশাপাশি সামাজিক কাজগুলো করে যেতে চাই। সংগীত আমার প্রাণ।’



