এখনো সুন্দরের খোঁজে মঈন চৌধুরী

মঈন চৌধুরীর শিল্পসংগ্রহশালার একাংশ। ছবি: সাজ্জাদ হোসেন
লাইব্রেরি, না শিল্পসংগ্রহশালা? কবি লেখক ও ভূ-প্রকৌশলী মঈন চৌধুরীর বাড়ির অন্দরে প্রবেশ করলে রীতিমতো ধন্দে পড়ে যেতে হয়। তার সঙ্গে আড্ডা দিয়েছেন সৈয়দ ফরহাদ
চারপাশে বই আর দেশ-বিদেশের শিল্পীদের চিত্রকর্ম। বসার ঘরটার এক পাশ দখল করেছে সারি করে সাজানো ভাস্কর্য। তার নিজের আঁকা ছবি তো আছেই। চায়ে চুমুক দিতে দিতে বেশ নান্দনিক একটি আর্ট পিসের ওপর চোখ পড়ল। গাছের গুঁড়িই হবে। বেশ দক্ষ হাতের ছোঁয়ায় ওটা পেয়েছে ভাস্কর্যের মর্যাদা। টি-টেবিলের এক কোণে শোভা পাচ্ছে। বাড়িতে তখন আরও অতিথি এসেছেন। ওই ভাস্কর্যের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলাম বলেই কি না— এক অতিথি যেচে বললেন, ‘এটা কিন্তু স্যারের করা।’ ততক্ষণে তার বেশ কিছু পেইন্টিংয়ের সঙ্গে পরিচয় ঘটে গেছে। তাই এ কথায় অবাক হইনি।
বসার ঘরের সঙ্গেই লাগোয়া বারান্দা। বারান্দা জুড়ে শিল্পীর হাতে গড়া বাগান। শুনছিলাম তার শিল্পচর্চার কথা, রাজনীতির প্রসঙ্গও এলো। তরুণ বয়সে ছিলেন বামপন্থী রাজনৈতিক কর্মী। ফিরে গেলেন ঊনসত্তরের উত্তাল গণঅভ্যুত্থানে। এই মানুষটির লেখা একটি কবিতার পঙ্ক্তি দশকের পর দশক ধরে দেয়াললিখন, পোস্টার আর আন্দোলনের স্লোগানে উচ্চারিত হয়েছে, অথচ মানুষটিই বেশিরভাগের কাছে অচেনা। তিনি কবি, চিত্রশিল্পী, ও লেখক মঈন চৌধুরী। পেশায় ছিলেন ভূ-প্রকৌশলী। ‘যতবারই হত্যা করো, জন্মাব আবার, দারুণ সূর্য হবো লিখবো নতুন ইতিহাস’— বাংলাদেশের আন্দোলন-সংগ্রামের ইতিহাসে বহুল উদ্ধৃত এই পঙ্ক্তিটি তারই লেখা।
কবিতার এই বিখ্যাত পঙ্ক্তি প্রসঙ্গে বললেন, “এখানকার সমতলের মানুষ ঝড়-ঝঞ্ঝা, সাইক্লোন এসবে প্রচণ্ডভাবে আহত হতো, নিহত হতো। কিন্তু মানুষ বারবার জেগে ওঠে। মানুষের এই বাঁচার স্পৃহা থেকেই আমি লিখেছিলাম— ‘যতবার হত্যা করো, জন্মাব আবার।’”
কবিতার আগে তার পরিচয় ছিল ছবি আঁকার মানুষ হিসেবে। শৈশব থেকেই আঁকতেন। কিন্তু শিল্পকে নতুনভাবে আবিষ্কার করেন অস্ট্রিয়ায় পড়তে গিয়ে। সেখানে জাদুঘর, গ্যালারি, মোজার্টের শহর, ইউরোপীয় শিল্প-ঐতিহ্য তাকে নতুন চোখে পৃথিবী দেখতে শেখায়। নন্দনতত্ত্ব, দর্শন আর শিল্পচর্চা নিয়ে তখনই গভীরভাবে ভাবতে শুরু করেন।
সপ্তাহ জুড়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস শেষে রাতে বসে একের পর এক অ্যাক্রিলিক ও জলরঙের ছবি আঁকতেন
অস্ট্রিয়ায় ভূ-প্রকৌশল এবং ব্যবস্থাপনা বিষয়ে পড়ার সময় ইউরোপ ঘুরে দেখার প্রবল সাধ জাগে। সমাধান খুঁজে নেন ছবি আঁকায়। সপ্তাহ জুড়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস শেষে রাতে বসে একের পর এক অ্যাক্রিলিক ও জলরঙের ছবি আঁকতেন। ছুটির দিনে সেই ছবিগুলো নিয়ে ভিয়েনা কিংবা সালজবুর্গের বিভিন্ন স্কয়ারে দাঁড়িয়ে যেতেন।
সেই ছবি বিক্রির টাকা দিয়েই ঘুরেছেন সমগ্র ইউরোপ। বিদেশে কাটানো সময়ে কবিতাও নতুনভাবে ফিরে আসে। দেশ আর মানুষের কথা ভাবতে ভাবতেই কবিতা তার ভেতরে স্থায়ী ঠিকানা করে নেয়। দর্শনচর্চায় আগ্রহ তখনই। প্রকাশিত প্রবন্ধের বইয়ের সংখ্যা মোট ৯। আর কবিতার বই সাত।
কবিতা প্রসঙ্গে বললেন, ‘প্রথমে ছড়া লিখতাম। প্রথম ছড়া ছাপা হয় কচি-কাঁচার আসরে। স্কুলের পত্রিকায়ও লিখতাম। তারপর হঠাৎ করে বিদেশে গিয়ে কবিতা লেখা শুরু করলাম। ওই যে নিজেকে অনুভব করা, সেটা আসলে অস্ট্রিয়া গিয়েই।’
দেশে ফিরে ‘আর্ট পিস’ সংগ্রহ শুরু করেন। দশকের পর দশক ধরে সংগ্রহ করেছেন বাংলাদেশের প্রথিতযশা শিল্পীদের কাজ। মঈন চৌধুরীর সংগ্রহে রয়েছে জয়নুল আবেদিন, এস এম সুলতান, কামরুল হাসান, যামিনী রায়, কাইয়ুম চৌধুরী, কালিদাস কর্মকারসহ বহু শিল্পীর চিত্রকর্ম। আছে নানা দেশ থেকে সংগ্রহ করা ভাস্কর্য।
ভারতের কিংবদন্তি শিল্পী মকবুল ফিদা হুসেনের সঙ্গে তার সরাসরি পরিচয় হয়েছিল মুম্বাইয়ের জাহাঙ্গীর আর্ট গ্যালারিতে। নিজের লেখা কয়েকটি বই উপহার দিয়েছিলেন শিল্পীকে। তারই প্রতিদানে হুসেন নিজের স্বাক্ষর করা একটি সেরিগ্রাফ উপহার দেন।
জীবনকে নানাভাবে উদযাপন করেছেন তিনি। নিয়েছেন বিচিত্র অভিজ্ঞতার স্বাদ। ইন্টারমিডিয়েট পড়ার সময় কয়েক রাত কাটিয়েছেন তেজগাঁওয়ের বস্তিতে। পরে থেকেছেন মহেশখালীর জেলেপল্লিতে, বান্দরবানের মারমাপাড়ায়। কাছ থেকে দেখেছেন শ্রমজীবী মানুষের জীবনসংগ্রাম।
সেসব অভিজ্ঞতার ডালা মেলে ধরে বললেন, ‘ইন্টারমিডিয়েটে পড়ার সময় ভাবলাম যে, তেজগাঁওয়ের বস্তি এলাকায় দুই রাত থাকব। তখন তেজগাঁওয়ে অনেক বড় বস্তি ছিল। আমি সেভাবে অ্যারেঞ্জ করে বস্তির একটা ঘরে ছিলাম। দেখলাম, ওরা কীভাবে কাজ করে, বাচ্চারা কীভাবে বড় হয়। চার-পাঁচজন মিলে একজনের কাছে বাচ্চা রেখে কীভাবে কাজে যায়— এগুলো খুব কাছ থেকে দেখেছি।’ কথা বলতে বলতে একসময় নিজের জীবন নিয়ে আক্ষেপের কথা বললেন মইন চৌধুরী। বিদেশে পড়াশোনা করে উচ্চশিক্ষা লাভ করেছেন, নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন ভূ-প্রকৌশলী হিসেবে, জীবনভর সংগ্রহ করেছেন মূল্যবান শিল্পকর্ম। কিন্তু তার মনে হয়, এই সচ্ছলতা তাকে একসময় রাজনীতি থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে। এই আক্ষেপ তিনি লুকান না। তবে শেষ পর্যন্ত তার আশ্রয় শিল্প।
বয়স ৮০ ছুঁয়েছে। সময় কাটছে বাগান করে, ছবি এঁকে আর বই পড়ে। প্রায় ১০ হাজার বইয়ের ব্যক্তিগত সংগ্রহ আছে তার। জীবনের এ পর্যায়ে এসে তার উপলব্ধি হলো— ‘জীবনের অর্থ হলো সুন্দরকে খুঁজে পাওয়া। একটি ছবি, একটি কবিতা, একটি ফুল কিংবা একজন মানুষের ভেতরের সৌন্দর্য— এসবের মধ্যেই আমি জীবনের সবচেয়ে বড় শান্তি খুঁজে পাই।’





