মনের খেয়াল
ঝেড়ে ফেলুন অহেতুক আবেগ

মডেল: সিনথিয়া আলম। ছবি: সাজ্জাদ হোসেন
অগোছালো ঘর যেমন অস্বস্তি বাড়ায়, তেমনি জমে থাকা আবেগও ভারী করে তোলে মন। এসব আবেগের কেতাবি নাম ইমোশনাল ক্লাটার। জানাচ্ছেন ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট তাহমিনা পারভীন
ইমোশনাল ক্লাটার একদিনে তৈরি হয় না। দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা অভিমান, অমীমাংসিত সম্পর্ক, নিজের প্রতি নেতিবাচক ধারণা, ব্যর্থতার ভয় কিংবা ভবিষ্যৎ নিয়ে অতিরিক্ত উদ্বেগ মানুষের মনকে ধীরে ধীরে ভারাক্রান্ত করে তোলে। অনেক সময় আমরা হয়তো বাইরে থেকে দেখতে স্বাভাবিক থাকি; কিন্তু ভেতরে ভেতরে ভীষণ অস্থিরতা আর মানসিক চাপে ভুগি। এর ফলে আত্মবিশ্বাস কমে যায়, সিদ্ধান্ত নিতে দ্বিধা তৈরি হয় এবং দৈনন্দিন জীবনের আনন্দগুলো হারিয়ে যেতে থাকে।
বুঝবেন কীভাবে: একই বিষয় নিয়ে বারবার ভাবছেন? ছোট ঘটনায় অতিরিক্ত আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ছেন? অতীতের কোনো কষ্ট বা অভিমান কিছুতেই মন থেকে ঝেড়ে ফেলতে পারছেন না? সবসময় অস্থির বা মানসিকভাবে ক্লান্ত লাগছে? অনুভূতি প্রকাশে অস্বস্তি হচ্ছে? এসবই হতে পারে ইমোশনাল ক্লাটারের লক্ষণ। নিজেকে বোঝার জন্য মাঝেমধ্যে কয়েকটি প্রশ্ন করুন, ‘আমি এখন কী অনুভব করছি? কেন করছি? কোন বিষয় আমাকে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করছে?’ নিজের অনুভূতিকে না এড়িয়ে, স্বীকার করাই হতে পারে মনের এই জঞ্জাল পরিষ্কারের প্রথম ধাপ।
অনুভূতির দিনলিপি: কী নিয়ে মন খারাপ, কীসে ভয় বা রাগ— প্রতিদিন ১০-১৫ মিনিট ডায়েরিতে নিজের এমন সব চিন্তা ও অনুভূতি লিখতে পারেন। সমাধান না পেলেও সমস্যা নেই। মাথার ভেতরের চিন্তা কাগজে নামিয়ে আনাটাই অনেক সময় মনের জট খুলতে সাহায্য করে।
ইমোশনাল ক্লাটার দূর করার অর্থ জীবনের সব আবেগ মুছে ফেলা নয়; বরং কোন আবেগ ধরে রাখা প্রয়োজন আর কোনটি শুধু পাহাড় হয়ে আছে, তা বুঝতে শেখা
ছাঁটাই তালিকা: যেসব বিষয় আপনার নিয়ন্ত্রণে নেই, পুরনো যেসব কষ্ট আজও বয়ে বেড়াচ্ছেন কিংবা এমন কোনো অপরাধবোধ যা ইতিবাচক পরিবর্তন আনছে না, সেগুলো আলাদা করে লিখুন। এরপর নিজেকে বোঝান, সবকিছু আঁকড়ে ধরে রাখার প্রয়োজন নেই।
ডিজিটাল জঞ্জাল দূর: সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অতিরিক্ত সময় কাটানোও মানসিক অস্থিরতা বাড়াতে পারে। সোশ্যাল মিডিয়ায় অপ্রয়োজনীয় নোটিফিকেশন বন্ধ করার পাশাপাশি অস্বস্তিকর অ্যাকাউন্ট আনফলো করাই ভালো। এ ছাড়া প্রতিদিন কিছু সময় ফোন থেকে দূরে থাকতে পারলে মন্দ হয় না।
একসঙ্গে সব নয়: অনেক অসমাপ্ত কাজ মাথায় ঘুরতে থাকলেও সব একদিনে শেষ করার চেষ্টা করবেন না। প্রতিদিন এক থেকে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ নির্ধারণ করুন। তারপর সেগুলো সেরে নিন। কেননা, কাজের তালিকা ছোট হলে মনের চাপও কমে।
প্রয়োজনে ‘না’: অন্যকে খুশি করতে গিয়ে নিজের ওপর অতিরিক্ত দায়িত্ব চাপিয়ে দেবেন না। সব নিমন্ত্রণ, অনুরোধ কিংবা দায়িত্ব গ্রহণ করা জরুরি নয়। বিনয়ের সঙ্গে ‘না’ বলতে শেখাও আত্মযত্নের অংশ।
শরীরের খেয়াল: পর্যাপ্ত ঘুম, পানি পান এবং নিয়মিত শরীরচর্চা মানসিক সুস্থতার সঙ্গেও যুক্ত। প্রতিদিন অন্তত ২০-৩০ মিনিট হাঁটার অভ্যাস মনকে সতেজ রাখতে সাহায্য করতে পারে।
কথা বলা: বিশ্বস্ত বন্ধু, পরিবারের সদস্য বা সহকর্মীর সঙ্গে নিজের অনুভূতি ভাগ করে নিন। অনেক সময় সমাধানের চেয়েও এমন একজন মানুষকে বেশি প্রয়োজন হয়, যিনি মন দিয়ে শুনবেন।
বর্তমানে বসবাস: অতীতের ঘটনা বারবার মনে করা কিংবা ভবিষ্যৎ নিয়ে অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা— দুটিই বর্তমানের শান্তি কেড়ে নিতে পারে। ধ্যানের মতো চর্চা মনকে বর্তমান মুহূর্তে ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করে।
নিজেকে একটি প্রশ্ন: কোনো বিষয় নিয়ে খুব দুশ্চিন্তা হলে নিজেকে জিজ্ঞেস করুন— ‘যা নিয়ে এখন এত ভাবছি, পাঁচ বছর পরও কি এটি আমার জীবনে একইরকম গুরুত্বপূর্ণ থাকবে?’ অনেক ক্ষেত্রেই উত্তর হবে ‘না’। প্রশ্নটি অপ্রয়োজনীয় চিন্তা থেকে নিজেকে একটু দূরে সরিয়ে আনতে সাহায্য করতে পারে।
ইমোশনাল ক্লাটার দূর করার অর্থ জীবনের সব আবেগ মুছে ফেলা নয়; বরং কোন আবেগ ধরে রাখা প্রয়োজন আর কোনটি শুধু পাহাড় হয়ে আছে, তা বুঝতে শেখা। মনকে হালকা করার জন্য অতীতের কিছু বিষয় ছেড়ে দেওয়া, নিজের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া এবং নিজের অনুভূতিকে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। তবে দীর্ঘদিন ধরে মানসিক চাপ, অস্থিরতা বা দৈনন্দিন জীবনে নেতিবাচক প্রভাব অনুভূত হলে পেশাদার মনোবিজ্ঞানীর সহায়তা নেওয়া দরকার।




