ফ্যাশন
আদিবাসী পোশাকের ভাষা

মডেল: কুঁড়ি চিসিম ও রেকসি রিছিল, পোশাক ও গয়না: ট্রাইবাল ক্র্যাফটস, সাজ: অরা বিউটি লাউঞ্জ, ছবি: সাজ্জাদ হোসেন
৯ আগস্ট আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস। বিশেষ এই দিন সামনে রেখে বাংলাদেশের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী পোশাকের বয়ন, রঙ ও উত্তরাধিকারের গল্প শোনাচ্ছেন অলকানন্দা রায়
ফ্যাশনের জগতে নিত্যনতুন ট্রেন্ড আসে। কখনো মিনিমালিজম, কখনো ম্যাক্সিমালিজম, কখনো আবার অতীত ফিরে আসে নতুন ব্যাখ্যায়। কিন্তু এমন কিছু পোশাক আছে, যেগুলোকে শুধু ট্রেন্ড বলা যায় না; কারণ সেগুলো একটি জনগোষ্ঠীর পরিচয়, জীবনযাপন, বিশ্বাস, পরিবেশ এবং সাংস্কৃতিক স্মৃতির ধারক। বাংলাদেশের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর পোশাক সেই বিরল ঐতিহ্যের অংশ, যেখানে প্রতিটি সুতোয় লুকিয়ে থাকে সময়ের দীর্ঘ পথচলা।
প্রকৃতিই প্রথম নকশাকার
পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়, মধুপুরের শালবন, সিলেটের টিলা কিংবা উত্তরাঞ্চলের সমতল। বাংলাদেশের প্রতিটি ভূপ্রকৃতি সেখানকার মানুষের জীবনধারা যেমন গড়ে তুলেছে, তেমনি প্রভাব ফেলেছে তাদের পোশাকেও। চাকমাদের পিনন-হাদি, মারমাদের থামি, ত্রিপুরাদের রিগনাই-রিসা, গারোদের দকমান্দা, মণিপুরী নারীদের ফানেক-ইন্নাফি কিংবা সাঁওতালদের ঐতিহ্যবাহী ফুতা— এসব পোশাকে জলবায়ু, চলাফেরার প্রয়োজন, স্থানীয় উপকরণ এবং প্রাকৃতিক রঙের ছাপ স্পষ্ট। কোথাও উজ্জ্বল লাল, হলুদ ও সবুজ; কোথাও গভীর নীল; আবার কোথাও কালো-সাদার সংযত সৌন্দর্য ছড়িয়ে প্রতিটি রঙ যেন নিজস্ব সাংস্কৃতিক ভাষায় কথা বলে। এসব পোশাক বেশিরভাগ সময় বাড়ির উঠোনে মেয়েরাই তৈরি করেন নিজস্ব রঙ নকশায়।
তাঁতে বোনা পরিচয়
একটি হাতে বোনা কাপড় তৈরি হতে কখনো কয়েক দিন, কখনো কয়েক সপ্তাহ লেগে যায়। সুতা প্রস্তুত, রঙ করা, তাঁত বসানো, নকশা তোলা— প্রতিটি ধাপেই প্রয়োজন দক্ষতা, ধৈর্য ও অভিজ্ঞতা। এ কারণেই একটি আদিবাসী পোশাক শুধু পণ্য নয়; একজন তাঁতশিল্পীর শ্রম, একটি পরিবারের ঐতিহ্য এবং প্রজন্মান্তরে চলে আসা বয়নজ্ঞানকেও ধারণ করে। প্রতিটি কাপড় যেন একটি অদৃশ্য ইতিহাস বয়ে বেড়ায়।
অঞ্চলভেদে রঙ ব্যবহারে ভিন্নতা থাকলেও একটি বিষয় অভিন্ন; এসব পোশাকের রঙ কখনো প্রকৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন নয়
নকশার ভেতরের গল্প
আদিবাসী বয়নশিল্পের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য এর জ্যামিতিক নকশা ও প্রকৃতিনির্ভর মোটিফ। সমান্তরাল রেখা, ডোরা, হীরকাকৃতি বিন্যাস, ফুল, পাহাড়, নদী, ধানের শীষ কিংবা সূর্যের অনুপ্রেরণায় তৈরি বহু নকশা আজও বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর বয়নপরম্পরার অংশ। অনেক মোটিফ প্রকৃতি, কৃষিজীবন কিংবা স্থানীয় বিশ্বাস থেকে অনুপ্রাণিত হলেও সব নকশার নির্দিষ্ট প্রতীকী অর্থ আছে— এমনটি বলা যায় না। বরং এগুলো একটি দীর্ঘ সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতার উত্তরাধিকার।
রঙের গল্প
আদিবাসী পোশাকের প্রাণ তার রঙে। পাহাড়ের সবুজ, লাল মাটি, ঝরনার জল, আকাশের নীল কিংবা বুনো ফুলের রঙ বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর তাঁতে নতুন ব্যাখ্যা পেয়েছে। অঞ্চলভেদে রঙ ব্যবহারে ভিন্নতা থাকলেও একটি বিষয় অভিন্ন; এসব পোশাকের রঙ কখনো প্রকৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন নয়।
রানওয়ে থেকে শহুরে ফ্যাশনে
একসময় এসব পোশাক মূলত নিজ নিজ জনগোষ্ঠীর দৈনন্দিন জীবন ও উৎসবের অংশ ছিল। এখন সেই বয়ন নতুন পরিচয়ে হাজির হচ্ছে সমসাময়িক ফ্যাশনে। শহুরে ডিজাইনাররা আদিবাসী তাঁতের কাপড় ব্যবহার করছেন জ্যাকেট, কিমোনো, কুর্তা, শার্ট, শাড়ির পাড়, ব্লাউজ, স্কার্ফ, স্টোল, টোট ব্যাগ এমনকি আধুনিক কো-অর্ড সেটেও। তরুণদের মধ্যেও হাতে বোনা কাপড়ের প্রতি আগ্রহ বাড়ছে। কারণ এটি যেমন আলাদা ব্যক্তিত্ব প্রকাশ করে, তেমনি স্থানীয় তাঁতশিল্প ও কারিগরদের কাজকেও এগিয়ে নেয়। তবে এ ব্যবহার যেন সবসময় সাংস্কৃতিক সম্মান বজায় রেখে হয়, সেদিকে খেয়াল রাখা দরকার। কেননা, কোনো জনগোষ্ঠীর পরিচয়কে শুধু নান্দনিকতার উপাদান হিসেবে নয়; বরং তাদের ঐতিহ্যের স্বীকৃতি হিসেবেও দেখা জরুরি।
ফিউশন ফিরিস্তি
শহুরে বা পশ্চিমা পোশাকের সঙ্গে মিলিয়ে পরতে পারেন আদিবাসী পোশাক। যেমন— সাদা লিনেন শার্টের সঙ্গে পাহাড়ি তাঁতের জ্যাকেট, একরঙা কামিজের সঙ্গে হাতে বোনা আদিবাসী ওড়না, জিনসের সঙ্গে রিগনাই-প্রাণিত টপ, কালো কুর্তার সঙ্গে হাতে বোনা স্কার্ফ বা স্টোল কিংবা সাদামাটা শাড়ির সঙ্গে আদিবাসী তাঁতের ব্লাউজ বা বেল্ট দারুণ মানাবে।
কেনায় সাবধান
বাজারে আদিবাসী মোটিফের অনেক কাপড় পাওয়া যায়, যেগুলো মেশিনে তৈরি। কিন্তু হাতে বোনা কাপড়ে বুননের সূক্ষ্ম তারতম্য, সুতার স্বাভাবিক টেক্সচার এবং কারিগরের হাতের ছাপ স্পষ্ট থাকে। তাই সরাসরি কারিগর বা বিশ্বস্ত উদ্যোগ থেকে কেনা ভালো।






