শৈশবে বাবার নির্যাতন, পরে ২২ মামলার আসামি—তবু ভক্তরা গড়েছিলেন অভিনেত্রীর মন্দির

সংগৃহীত ছবি
একসময়ে তিনি দাপিয়ে বেড়িয়েছেন দক্ষিণ ভারতীয় সিনেমা। বলা হত দক্ষিণী সিনেমার রানি। রুপালি পর্দায় তার এক ঝলক দেখার জন্য পাগল হতো লাখো ভক্ত। জনপ্রিয়তা এমন পর্যায়ে ছিল যে, ভক্তরা ভালোবেসে তার নামেই বানিয়ে ফেলেছিল আস্ত এক মন্দির!
কিন্তু এই গ্ল্যামার আর আলোর ঝলকানির পেছনে লুকিয়ে আছে এক অন্ধকার অধ্যায়। শৈশবে নিজের জন্মদাতার হাতেই যৌন নির্যাতন, ক্যারিয়ারের তুঙ্গে থাকা অবস্থায় রক্ষণশীলদের রোষানলে পড়ে ২২টি ফৌজদারি মামলার মুখোমুখি হওয়া—সব ঝড় সামলে ঘুরে দাঁড়ানো এই লড়াকু নায়িকার নাম খুশবু সুন্দর।
আজকে যিনি কোটি মানুষের আইডল, সেই খুশবু সুন্দরের শৈশবটা ছিল বিভীষিকাময়। চাইল্ড আর্টিস্ট হিসেবে হিন্দি সিনেমা দিয়ে ক্যারিয়ার শুরু করা খুশবু এক সাক্ষাৎকারে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য ফাঁস করেন।
তিনি জানান, মাত্র ৮ বছর বয়স থেকে শুরু করে কিশোরী হওয়া পর্যন্ত টানা কয়েক বছর নিজের বাবার কাছেই প্রতিনিয়ত যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।
নিজের পরিবারের ভেতরের সেই ভয়ঙ্কর অতীতকে পেছনে ফেলে আশির দশকের শেষে তিনি তামিল সিনেমায় পা রাখেন এবং অল্প সময়েই শীর্ষ নায়িকাদের একজন হয়ে ওঠেন।
২০০৫ সালে খুশবু সুন্দর ভারতজুড়ে এক বিশাল বিতর্কের জন্ম দেন। একটি সাক্ষাৎকারে তিনি খোলাখুলি বলেছেন, ‘নিরাপদ এবং দায়িত্বশীল উপায়ে করা হলে বিয়ের আগে শারীরিক সম্পর্ক কোনো অপরাধ নয়।’
ব্যস! তার এই এক মন্তব্যেই রক্ষণশীল তামিলনাড়ু জুড়ে প্রতিবাদের আগুন জ্বলে ওঠে। খুশবুর কুশপুত্তলিকা পোড়ানো হয় এবং পুরো রাজ্যজুড়ে তার বিরুদ্ধে ২২টি ফৌজদারি মামলা ঠুকে দেওয়া হয়।
দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর ভারতের সুপ্রিম কোর্ট তার বাকস্বাধীনতার প্রতি সম্মান জানিয়ে সবগুলো মামলা খারিজ করে দেন।
খুশবুর ক্রেজ নব্বইয়ের দশকে কেমন ছিল, তা আজকের যুগের দর্শকেরা কল্পনাও করতে পারবেন না। রজনীকান্ত, কমল হাসান, ভেঙ্কটেশ এবং প্রভুর মতো বড় বড় সুপারস্টারদের সাথে একের পর এক ব্লকবাস্টার সিনেমা উপহার দিয়েছেন তিনি।
তার তামিল ভক্তরা তার প্রতি এতটাই দেওয়ানা ছিলেন যে, তামিলনাড়ুতে খুশবুর নামে একটি আস্ত মন্দির তৈরি করে বসেন তারা! ভারতের ইতিহাসে জীবদ্দশায় কোনো নায়িকার নামে মন্দির তৈরি হওয়ার এমন ঘটনা বিরল।
সিনেমার সেটে কাজ করতে গিয়ে খুশবু প্রেমে পড়েন দক্ষিণ ভারতীয় চলচ্চিত্র নির্মাতা সুন্দর সি-র। ২০০০ সালে তারা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তাদের ঘরে রয়েছে দুটি কন্যাসন্তান।
বিনোদন দুনিয়ায় যেখানে রোজই সংসার ভাঙার খবর আসে, সেখানে গত ২৬ বছর ধরে এই তারকা জুটি বিনোদন জগতের অন্যতম সুখী ও দীর্ঘস্থায়ী দম্পতি হিসেবে উদাহরণ তৈরি করে রেখেছেন।
সিনেমায় নায়িকার চরিত্র কমে আসার পর খুশবু নিজেকে ওটিটি ও টেলিভিশনের পর্দায় নতুন করে মেলে ধরেন। বহু জনপ্রিয় রিয়েলিটি শোর বিচারক ও সঞ্চালক তিনি। এছাড়া স্বামীর সাথে যৌথভাবে সিনেমা ও টিভি সিরিয়াল প্রযোজনাও করছেন।
অভিনয়ের পাশাপাশি ভারতের রাজনীতিতেও খুশবু এক পরিচিত মুখ। প্রথমে তামিলনাড়ুর আঞ্চলিক দল ডিএমকেতে যোগ দিলেও, পরে তিনি জাতীয় দল কংগ্রেসে আসেন। আর বর্তমানে তিনি ভারতীয় জনতা পার্টির একজন সক্রিয় নেত্রী ও তারকা মুখ হিসেবে কাজ করছেন।
সব মিলিয়ে খুশবুর জীবন যেন সিনেমার চেয়েও বড় কোনো থ্রিলার বা অনুপ্রেরণার গল্প!






