হিমু থেকে মিসির আলি, কালজয়ী এই চরিত্রগুলো আজও কেন জনপ্রিয়?

ছবিঃ এআই
হলুদ পাঞ্জাবি বা নীল শাড়ি, আবার পানির মতো চা পান করে অদ্ভুত সব সমস্যার সহজ সমাধান। কিংবা গলায় চেইন ঝুলানো এবং মোটরসাইকেল চালানো কোন পরোপকারী মাস্তান। শব্দগুলো পড়তেই কি চরিত্রগুলো চোখের সামনে ভেসে উঠল?
এই চরিত্রগুলোর কারিগর হুমায়ূন আহমেদ। আজ তার ১৪তম প্রয়াণ দিবস। ২০১২ সালের এই দিনে তিনি না ফেরার দেশে চলে গেলেও, তার সৃষ্টি আজও বাঙালির প্রতিদিনের আবেগ, আড্ডা আর মনস্তত্ত্বে সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।
বাংলা কথাসাহিত্য ও নাট্যকলায় চরিত্র সৃষ্টির ক্ষেত্রে হুমায়ূন আহমেদ ছিলেন এক জাদুকরী রূপকার। বইয়ের পাতা আর টেলিভিশনের পর্দা ছাড়িয়ে তার তৈরি চরিত্রগুলো বাঙালির যাপনচিত্রের অংশ হয়ে উঠেছে।
আজও সমানভাবে জনপ্রিয় হিমু, রুপা, মিসির আলী ও বাকের ভাই। হুমায়ূন আহমেদের স্মরণে ফিরে দেখি তার সৃষ্টি করা জনপ্রিয় কয়েকটি কালজয়ী চরিত্র।
১. হিমু
১৯৯০ সালে প্রকাশিত ‘ময়ূরাক্ষী’ উপন্যাসের মাধ্যমে হিমুর আত্মপ্রকাশ ঘটে। হলুদ পাঞ্জাবির এক ছকভাঙা ভবঘুরে হিমু। ভালো নাম হিমালয়। হিমুর বাবা একজন সাইকোপ্যাথিক চরিত্রের মানুষ ছিলেন, যিনি বিশ্বাস করতেন কঠোর সাধনার মাধ্যমে মানুষকে ‘মহাপুরুষ’ বানানো সম্ভব। মহাপুরুষ হওয়ার কিছু পদ্ধতি তার বাবা ডায়েরিতে লিখে রেখে যান। সেই নির্দেশনা মেনে হিমু সারাজীবন মহাপুরুষ হওয়ার এক অদ্ভুত সাধনা করে যায়।
আসলে মধ্যবিত্তের চেনা ছক, নিয়ম আর শৃঙ্খলের বাইরে বাঁচবার এক তীব্র প্রতীক হিমু। পকেটবিহীন হলুদ পাঞ্জাবি পরে খালি পায়ে হেঁটে চলা এই তরুণের কোনো উদ্দেশ্য নেই। যেখানে পুরো পৃথিবী যুক্তির ওপর চলে, হিমু চলে তার উল্টো পথে। সে যুক্তি দিয়ে কোনো কিছু বিচার করে না। অবচেতন মনের ইশারা বা মনস্তাত্ত্বিক অনুমান দিয়ে সে মানুষের ভবিষ্যৎ বা মনের কথা বলে দিতে পারে, যা সাধারণ মানুষের কাছে অলৌকিক মনে হয়।
২. মিসির আলি
মিসির আলি হলেন হুমায়ূন আহমেদের সৃষ্টি করা বাংলা সাহিত্যের এক কালজয়ী, অপ্রতিদ্বন্দ্বী এবং তুমুল জনপ্রিয় মনস্তাত্ত্বিক চরিত্র। ১৯৮৫ সালে প্রকাশিত ‘দেবী’ উপন্যাসের মাধ্যমে তার প্রথম আত্মপ্রকাশ ঘটে। হিমু যেখানে চলে যুক্তির বাইরে, মিসির আলি সেখানে চলেন কঠোর যুক্তি ও বিজ্ঞানের পথ ধরে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাইকোলজির এই খণ্ডকালীন অধ্যাপক কোনো অলৌকিকতায় বিশ্বাস করেন না। তার মতে, পৃথিবীতে ‘অলৌকিক’ বলে কিছু নেই। যা কিছু অলৌকিক মনে হয়, তা আসলে মানুষের অজ্ঞতা অথবা মনের এক জটিল রোগ বা বিভ্রম। প্রতিটি রহস্যের পেছনে মনস্তাত্ত্বিক ও বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা খোঁজা এই চশমা পরা, মৃদুভাষী মানুষটি বাঙালির যৌক্তিক মননকে দারুণভাবে নাড়া দেয়।
পঞ্চাশোর্ধ্ব চিরকুমার মিসির আলি থাকেন ঢাকার একটি অতি সাধারণ, কিছুটা অন্ধকার ও স্যাঁতসেঁতে ফ্ল্যাটে। তার সার্বক্ষণিক সঙ্গী বলতে থাকে একজন কাজের ছেলে, যে তার জন্য চা ও রান্না করে দেয়। চা তার অন্যতম নেশা। ভক্ত হিসেবে ‘মিসির আলি’ পড়ে আমি নিজেও চায়ের প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ি।
৩. বাকের ভাই
পর্দার সীমানা পেরিয়ে রাজপথ কাঁপানো মাস্তান বাকের ভাই। বাংলাদেশের টেলিভিশন নাটকের ইতিহাসের সবচেয়ে জনপ্রিয়, কালজয়ী এবং কিংবদন্তিতুল্য কাল্পনিক চরিত্র।
নব্বইয়ের দশকের শুরুতে বিটিভিতে প্রচারিত হুমায়ূন আহমেদের বিখ্যাত ধারাবাহিক নাটক ‘কোথাও কেউ নেই’-এর প্রধান চরিত্র ছিলেন তিনি। প্রখ্যাত অভিনেতা আসাদুজ্জামান নূর এই চরিত্রে অভিনয় করে দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলেন।
বাকের ভাই ছিলেন নব্বই দশকের ঢাকার তরুণদের ফ্যাশন আইকন। তিনি সাধারণত শার্টের ওপরের কয়েকটি বোতাম খোলা রাখতেন, গলায় একটি চিকন চেইন ঝুলত এবং চোখে থাকত সানগ্লাস। হোন্ডা চালানো বাকের ভাই মূলত একজন নীতিবান ও পরোপকারী মাস্তান ছিলেন।
নাটকে বাকের ভাইয়ের ফাঁসির রায় হলে তা ঠেকাতে বাস্তবের হাজার হাজার মানুষ রাজপথে মিছিল শুরু করে। 'বাকের ভাইয়ের ফাঁসি হলে, জ্বলবে আগুন ঘরে ঘরে’, এই স্লোগানে মিছিল-সমাবেশ করেন।
স্ক্রিপ্ট বদলাতে দর্শকেরা লেখক হুমায়ূন আহমেদের বাসায় পর্যন্ত চড়াও হন। কিন্তু নাটকের স্বার্থে শেষ পর্যন্ত তার ফাঁসিই দেওয়া হয়। ফাঁসির পর্বটি প্রচারের রাতে পুরো দেশ থমকে যায়, বহু ঘরে শোকের ছায়ায় রান্না বন্ধ থাকে এবং অনেক জায়গায় তার গায়েবানা জানাজাও পড়া হয়—যা ইতিহাসে এক বিরল ঘটনা।
৪. শুভ্র
শুভ্র হলেন হুমায়ূন আহমেদের সৃষ্ট এক অনন্য, জনপ্রিয় এবং আদর্শবাদী চরিত্র। হিমু যেখানে ছকভাঙা উদাসীন আর মিসির আলি যেখানে পরম যুক্তিবাদী, শুভ্র সেখানে এক নিষ্কলুষ বিশুদ্ধতা ও মানবিক মূল্যবোধের মূর্ত প্রতীক।
শুভ্রর চোখের দৃষ্টি বেশ দুর্বল। সে সবসময় মোটা পাওয়ারের চশমা পরে। চশমা ছাড়া সে প্রায় অন্ধের মতো, তাই তাকে অনেক সময় ‘কানাবাবা শুভ্র’ নামে ডাকা হয়।
শুভ্রর জীবনের অন্যতম বড় ট্র্যাজেডি হলো তার পরিবার। ধনী পরিবারের সন্তান হিসেবে বড় হওয়া শুভ্র একসময় জানতে পারে, সে দত্তক নেওয়া সন্তান। এই সত্য জানার পর শুভ্র সমস্ত ধন-সম্পদ ত্যাগ করে এক পরম উদাসীনতায় সত্যের সন্ধানে বেরিয়ে পড়ে।
চারপাশের স্বার্থপর ও জটিল জগতের মাঝে শুভ্রর এই চিরন্তন সরলতা ও মানবিক মূল্যবোধ পাঠকদের মনে এক পরম প্রশান্তি ও আদর্শের জন্ম দেয়। সে যেন সমাজের সব কলুষতার ভিড়ে এক টুকরো বিশুদ্ধ বাতাস।
শুভ্রর মতে, মানুষ ভুল করতে পারে, কিন্তু ভুলের ওপর জিদ ধরে থাকাটা বড় অপরাধ।
৫. রূপা
রূপা হলেন হুমায়ূন আহমেদের সৃষ্ট এক অনন্য, রহস্যময়ী এবং চিরন্তন প্রেমিকা চরিত্র। তিনি মূলত হিমু সিরিজের প্রধান নারী চরিত্র। হিমুর উদাসীন ও ছন্নছাড়া জীবনে রূপা হলেন এক পরম আশ্রয়, যার ভালোবাসা নিঃশর্ত ও অনন্ত প্রতীক্ষায় ঘেরা।
উচ্চবিত্ত পরিবারের মেয়ে হওয়া সত্ত্বেও সে হিমুকে প্রচণ্ড ভালোবাসে। রূপার ভালোবাসার কোনো শর্ত নেই। তিনি জানেন হিমু একজন যাযাবর, তার কোনো ভবিষ্যৎ বা ব্যাংক ব্যালেন্স নেই। তবুও তিনি হিমুর এই ছকভাঙা রূপটাকেই মনেপ্রাণে ভালোবাসেন।
রূপা চরিত্রের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য হলো তার দীর্ঘ প্রতীক্ষা। হিমু হঠাৎ করে নিখোঁজ হয়ে যায়, আবার মাসের পর মাস পর মাঝরাতে হঠাৎ ল্যান্ডফোনে রিং করে। রূপা সেই একটি ফোন কল বা বারান্দায় হিমুর আকস্মিক উপস্থিতির জন্য বছরের পর বছর ধরে অপেক্ষা করে যান।
রূপা অনেক সময় হিমুর এই উদাসীনতায় তীব্র কষ্ট পান, কাঁদেন, অভিমান করেন। কিন্তু পরক্ষণেই তিনি হিমুর 'মহাপুরুষ' হওয়ার সাধনাকে শ্রদ্ধা করেন এবং তাকে নিজের খাঁচায় বন্দি না করে ডানা মেলে উড়তে সাহায্য করেন।
হিমুর একটি ফোন বা চিঠির জন্য রুপার দীর্ঘ প্রতীক্ষা বাঙালি তরুণ-তরুণীদের কাছে রোমান্টিকতার এক সর্বোচ্চ শিখর।
হুমায়ূন আহমেদ চলে গেছেন, কিন্তু তার চরিত্রগুলো কোথাও যায়নি। তারা আজও আমাদের হাসায়, ভাবায়, প্রেমে ফেলে, যুক্তির মুখোমুখি দাঁড় করায়। কখনো হলুদ পাঞ্জাবি পরে রাতের শহরে হাঁটা, কখনো এক কাপ চায়ে রহস্যের সমাধান খোঁজা, কখনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে বুক চিতিয়ে দাঁড়ানো, আবার কখনো নিঃশর্ত ভালোবাসার অপেক্ষায় থাকা।
সময়ের চাকা পেরিয়ে ২০২৬। বদলেছে সময়, বদলেছে প্রজন্ম কিন্তু হিমু, মিসির আলী, বাকের ভাই, শুভ্র ও রূপারা আজও বাঙালির কল্পনা, সংস্কৃতি ও জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
এটাই হুমায়ূন আহমেদের সবচেয়ে বড় সার্থকতা—তিনি শুধু গল্প লেখেননি, সৃষ্টি করেছিলেন এমন কিছু চরিত্র, যারা লেখকের মৃত্যুর পরও পাঠকের হৃদয়ে বেঁচে থাকে।







