মাতৃত্ব সবসময় আনন্দদায়ক নয়, কেন বললেন কাল্কি কোয়েচলিন

‘বেলি অব দ্য বিস্ট’ নির্মিত হয়েছে বলিউড অভিনেত্রী কাল্কি কোয়েচলিনের ২০২১ সালে প্রকাশিত একই নামের বই অবলম্বনে
আচ্ছা যদি প্রশ্ন করা হয়, একজন নারীর জীবনের সবথেকে বড় অর্জন কী? নিশ্চিত উত্তর আসবে মা হওয়া। পরিবারে যখন একটি শিশুর জন্ম হয় তখন সেই পরিবারে বয়ে যায় আনন্দের বন্যা।
সমাজ আমাদের সবসময় এটাই শিখিয়ে এসেছে যে মাতৃত্ব হলো একজন নারীর জীবনের সবচেয়ে সুন্দর উপহার এবং পরম পবিত্র এক অনুভূতি।
কিন্তু এই সুন্দর মোড়কের পেছনে যে তীব্র শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রণা, নির্ঘুম রাত, নিজের আগের পরিচয় হারিয়ে ফেলার হাহাকার আর ‘পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশন’ লুকিয়ে থাকে, তা নিয়ে সমাজ সাধারণত মুখে কুলুপ এঁটে থাকে।
মায়েদের এই আড়ালে থাকা জাদুকরি ও একই সঙ্গে ক্ষতবিক্ষত জীবনের গল্প এবার কোনো রকম আড়াল ছাড়াই মঞ্চে নিয়ে এলেন বলিউডের ঠোঁটকাটা ও প্রতিভাবান অভিনেত্রী কাল্কি কোয়েচলিন।
তার লেখা ২০২১ সালের জনপ্রিয় বই ‘দ্য এলিফ্যান্ট ইন দ্য ওম্ব’-এর ওপর ভিত্তি করে নির্মিত নতুন নাটক ‘বেলি অব দ্য বিস্ট’-এর প্রিমিয়ার সম্প্রতি অনুষ্ঠিত হলো দিল্লিতে। নাটকটির নির্দেশনা দিয়েছেন প্রখ্যাত থিয়েটার ডিরেক্টর শীনা খালিদ।
দুই ঘণ্টা ১০ মিনিটের এই নাটকে বিভিন্ন বয়সের ও স্তরের পাঁচজন নারীর জীবনের গল্প বলা হয়েছে। গর্ভধারণের প্রথম দিন থেকে শুরু করে প্রসবের তীব্র যন্ত্রণা এবং সন্তান জন্মের পর কর্মজীবনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে গিয়ে একজন নতুন মায়ের কতটা নাজেহাল অবস্থা হয়, তা খুব সূক্ষ্ম রসবোধ ও বাস্তবতার সঙ্গে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
নাটকটিতে মাতৃত্বের অন্ধকার দিক যেমন গর্ভপাত, মিসক্যারেজ এবং প্রসবোত্তর মানসিক অবসাদকে সরাসরি তুলে ধরা হয়েছে।
বিবিসি-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে কাল্কি বলেছেন, ‘ভারত বা আমাদের দক্ষিণ এশীয় সমাজে নারীদের মাতৃত্বের কষ্টের কথা মুখ ফুটে বলতে দেওয়া হয় না। হরমোনের পরিবর্তন বা নিজের আগের স্বাধীন জীবনটা হারিয়ে ফেলার যে কষ্ট— তা নিয়ে কথা বললে সমাজ তাকে ‘খারাপ মা’ বা ‘অকৃতজ্ঞ’ বলে দাগিয়ে দেয়। আমরা যদি সমাজকে বলি যে সন্তান লালন-পালন করাটা কতটা ক্লান্তিকর এবং মগজ অসাড় করে দেওয়ার মতো কাজ, তবে সমাজ হয়তো ভেঙে পড়বে! তাই সবাই এই সত্যটা চেপে যায়।’
নাটকটির একটি দৃশ্য দর্শকদের চোখে পানি এনে দিয়েছে, যা আমাদের সমাজের প্রতিটি ঘরে প্রতিদিন ঘটে। কাজ শেষে ক্লান্ত হয়ে স্বামী ঘরে ফেরার পর স্ত্রী তাকে জিজ্ঞেস করে দিনটি কেমন কাটল। স্বামীর কাছে বলার মতো অনেক গল্প থাকে। কিন্তু স্বামী যখন স্ত্রীকে একই প্রশ্ন করে, স্ত্রী মুখ খুলে কিছুক্ষণ চুপ থেকে মলিন হেসে বলে, বিশেষ কিছু না, সারাদিন শুধু বাচ্চাটাকেই দেখাশোনা করলাম।
এই যে একজন মায়ের ২৪ ঘণ্টার অক্লান্ত পরিশ্রমকে ‘কিছুই না’ বলে ধরে নেওয়া, এই মানসিকতাকেই আঘাত করেছে ‘বেলি অব দ্য বিস্ট’। পরিসংখ্যান বলছে, ভারতের শহরগুলোয় সন্তান ও ঘরের কাজের চাপে প্রায় ৬৯ শতাংশ নারী কর্মক্ষেত্রে যোগ দিতে পারেন না, যেখানে পুরুষদের ক্ষেত্রে এই হার মাত্র ১ শতাংশ।
কাল্কি বলেছেন, ‘আজকের যুগে নারীদের ওপর ‘সুপারমম’ হওয়ার এক অদ্ভুত মানসিক চাপ তৈরি করা হয়েছে। আপনি চাকরিও করবেন, আবার ঘরেরও ‘সিইও’ হয়ে থাকবেন— কোনো ভুল করা চলবে না। মায়েদের উদ্দেশে আমি বলতে চাই, সব দায়িত্ব একা নিজের ঘাড়ে নেবেন না। বাবা বা পরিবারের অন্য সদস্যদেরও দায়িত্ব দিন। মাঝে মাঝে কোনো কাজ ঠিকঠাক না হলে বা হাল ছেড়ে দিলেও আকাশ ভেঙে পড়বে না। ভালো না থাকাটাও মানুষের অধিকার।’
নাটকটির অন্যতম শক্তিশালী অংশ ছিল মিসক্যারেজের যন্ত্রণা। দক্ষিণ এশিয়ায় কোনো নারীর সন্তান না হওয়া বা গর্ভপাত হওয়াটা এখনো এক বড় সামাজিক কলঙ্ক। সন্তান হারানোর ট্রমার চেয়েও নারীকে সমাজের লজ্জা আর করুণার মুখোমুখি হতে হয় বেশি। নাটকের অন্যতম অভিনেত্রী শ্রুতি ব্যাস নিজের বাস্তব জীবনের মিসক্যারেজের অভিজ্ঞতা মঞ্চে ফুটিয়ে তুলেছেন।
শ্রুতি বলেছেন, ‘আমি যখন সন্তান হারাই, মানুষ আমাকে বলত— ‘তোমাকে দেখে তো বেশ ভালোই লাগছে, মনেই হয় না তোমার মিসক্যারেজ হয়েছে!’ মানুষ বোঝে না যে মনের ভেতরের ক্ষত বাইরে থেকে দেখা যায় না। ভালো না থাকার অভিনয় করতে করতে মায়েরা হাঁপিয়ে ওঠেন।’
মঞ্চে যখন শ্রুতির চরিত্রটি চিৎকার করে বলে ওঠে, হ্যাঁ, আমি ভালো নেই এবং আমার ভালো না থাকাটাই তো স্বাভাবিক, তাই না? তখন মিলনায়তনে উপস্থিত শত শত নারী দর্শক একসঙ্গে ‘হ্যাঁ’ বলে সায় দেন।
২০২৬ সালের এই আধুনিক যুগে দাঁড়িয়েও যেখানে মাতৃত্বকে শুধু ত্যাগের মহিমায় আটকে রাখা হয়, সেখানে কাল্কির ‘বেলি অব দ্য বিস্ট’ মায়েদের মনের ভেতরের লুকিয়ে থাকা ক্ষোভ ও ক্লান্তির এক সাহসী দলিল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করল।
সিনেমা বা নাটকের মাধ্যমে সম্পর্কের এই ধূসর ও বাস্তব রূপগুলো যত বেশি সামনে আসবে, সমাজ তত বেশি সংবেদনশীল হবে—এমনটাই বিশ্বাস নাট্যপ্রেমীদের।







