প্রয়াণস্মরণে আবদুল আলীম
বাংলা গানের প্রথম তারা

গান রেকর্ডের সময় আবদুল আলীম। সংগৃহীত ছবি
মাটির গান, নদীর টান
একবার একটা প্রত্যন্ত গ্রামে অনুষ্ঠান শেষ করে রাতে রেলস্টেশনে আটকে গেলেন আবদুল আলীম। ঢাকার কোনো ট্রেন নেই, অথচ পরদিন সকালে রেডিওতে তার লাইভ প্রোগ্রাম। হঠাৎ তিনি জানতে পারেন, একটা কয়লার ইঞ্জিন ঢাকা যাবে। তিনি ড্রাইভারের সাথে খাতির জমাতে শুরু করলেন। ড্রাইভারের তো মন গলেনা। শেষে পরিচয় দিয়ে, অনুরোধ করেন তাকেও যেন নিয়ে যান ড্রাইভার। ড্রাইভার শুরুতে বিশ্বাস করেননি। ড্রাইভারের সোজা কথা, ‘আপনি যদি সত্যিই আবদুল আলীম হন, তবে গান শোনান’।
আবদুল আলীম গান ধরেন। ড্রাইভার বিমোহিত হয়ে তারপর তাকে গাড়িতে উঠতে দেন। সেই রাতে ঢাকা পৌঁছানো পর্যন্ত তাকে নাকি সারারাত গান শোনাতে হয়েছিল।
এই গল্পটি আবদুল আলীমের জীবন ও জনপ্রিয়তার এক উজ্জ্বল দলিল। রেলের কয়লার ইঞ্জিনের চালক থেকে শুরু করে শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক, কাজী নজরুল ইসলাম—সবাই তার কণ্ঠের জাদুতে মুগ্ধ হয়েছিলেন। বাংলা লোকসংগীতের আকাশে আবদুল আলীম এক উজ্জ্বল নক্ষত্র, যার সুর আজও বাঙালির হৃদয়ে বয়ে চলে। তার জীবন ছিল সংগ্রাম, ভালোবাসা আর সুরের এক অসাধারণ মহাকাব্য।
তালিবপুরের লাজুক ছেলেটি
আবদুল আলীমের জন্ম হয়েছিল মুর্শিদাবাদে। ১৯৩১ সালের ২৭ জুলাই তালিবপুর গ্রামে তার জন্ম। তার পিতামাতার ছিল ৫ ছেলে, ১ মেয়ে। ছেলেদের মধ্যে আবদুল আলীম ছিলেন সবার ছোট। গ্রামের মাটি, নদীর বাতাস, আর সহজ-সরল মানুষের মাঝে বেড়ে ওঠা এই ছেলেটির ভেতরে প্রকৃতি যেন সুরের বীজ বপন করেছিল জন্ম থেকেই।
নিজের সাক্ষাৎকারে আবদুল আলীম সেই প্রথম সুরের সন্ধানের কথা বলেছেন অত্যন্ত আবেগে। তার যখন নয় কিংবা দশ বছর বয়স, তখন তার এক চাচা কলকাতা থেকে একটা কলের গান কিনে নিয়ে গেলেন। তখন গ্রামোফোনকে সবাই ‘কলের গান’ বলেই চিনত। সকাল আনুমানিক নয়টা বাজে, আবদুল আলীম বাড়িতে বসে পান্তাভাত খাচ্ছিলেন। হঠাৎ কানে ভেসে এল এক অসাধারণ গানের আওয়াজ। ভাত রেখেই তিনি ছুটে গেলেন পাশের বাড়ি চাচার বাসায়। সেখানে গিয়ে দেখলেন, একটা গোল জিনিস ঘুরছে—রেকর্ড। সেদিন যে গানটি বাজছিল, সেটির কথা ছিল—‘সদা মন চাহে মদিনা যাবো’। এই গান শুনেই তার মনে গানের প্রতি গভীর পাগলামি জন্মে যায়। গানটি রেকর্ড ছিল কে. এল মল্লিকের কণ্ঠে।
এই ঘটনার পর থেকেই তিনি কলের গান শুনে শুনে গান শিখতে শুরু করেন। শুধু গানের কথা নয়, তাল এবং লয়ও তিনি শুনেশুনেই বুঝে গিয়েছিলেন। তার মাথায় সেসব ঢুকে গিয়েছিল এমনভাবে যে কোনো আলাদা চর্চার প্রয়োজন হয়নি। তবে তিনি গ্রামের ভিতরে গান গাইতেন না। তিনি গাইতেন মাঠে, যেখানে কোনো লোকজন নেই। কারণ তাঁর খুব লজ্জা লাগত। একদিন গ্রামের কয়েকজন লোক এসে তার ভাইকে ধরল—‘আলীমকে তোমরা গান শেখাও। তার গলাটা এত মিষ্টি!’ ভাই টাকার লোভ দেখালেন, নানা কিছু দেখালেন—তবু তিনি রাজি নন। শেষপর্যন্ত ভাই-ই টাকা দিলেন, তখন তিনি গান গাইলেন। গ্রামের গোলাম আলী নামের এক ভদ্রলোক হারমোনিয়াম নিয়ে এসে তাকে গান গাওয়ালেন। গান শুনে সবাই খুব প্রশংসা করল। তারপরই তার লজ্জা ভেঙে গেল। তখন থেকেই ওস্তাদ গোলাম আলী সাহেবের কাছে তার আনুষ্ঠানিক সংগীত শিক্ষা শুরু হয়।
শেরে বাংলার চোখে জল
সেই সময় গ্রামে থিয়েটার হতো, বিভিন্ন জায়গায় অনুষ্ঠান হতো। আবদুল আলীমকে সেখানে নিয়ে যাওয়া হতো, অনেক মেডেল দেওয়া হতো। তার উৎসাহ তখন বেড়ে গেল বহুগুণ। ওস্তাদ গোলাম আলী সাহেব একদিন তাকে কলকাতা নিয়ে গেলেন। সেখানে গ্রামোফোন কোম্পানিতে বেড়াতে গিয়ে কে. মল্লিক সাহেবের সাথে দেখা হলো। তখন কাজী নজরুল ইসলাম ভালো ছিলেন, তবে সেদিন তার সঙ্গে পরিচয় হয়নি।
এরপর একদিন তিনি আলিয়া মাদ্রাসায় গেলেন। সেখানে এ কে ফজলুল হক আসবেন, বক্তৃতা হবে। আবদুল আলীম তার ভাইয়ের সঙ্গে সেখানে গিয়েছিলেন। তার ভাই গোপনে গোপনে তার নাম একটা তালিকায় লিখে দিয়ে এসেছিলেন যে, এই ছেলে একটা গান গাইবে। আবদুল আলীম ভয়ে গান গাইতে পারছিলেন না—কলকাতার মতো জায়গায় প্রথম গিয়েছেন। কিন্তু যখন মঞ্চে ডাক পড়ল, তখন গাইতে হলো। তিনি গান শুরু করলেন—‘সদা মন চাহে মদিনা যাবো’। হঠাৎ দেখলেন, হক সাহেব পেছনে এসে বসেছেন। সেই গান শুনে শেরে বাংলা অঝোর ধারায় কাঁদছেন। গান শেষে তিনি আবদুল আলীমকে বললেন, ‘ভাই তুমি আমার সাথে দেখা করে যাবে, তোমাকে আমি পোশাক তৈরি করে দেবো’। এরপর থেকে তিনি যেখানেই কলকাতার মধ্যে—খিদিরপুর বা আলিপুর—অনুষ্ঠান করতেন, আবদুল আলীমের বাসায় গাড়ি পাঠিয়ে দিতেন। তখন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী সাহেবও সেখানে থাকতেন। আবদুল আলীমের গান শুনে তিনিও খুব খুশি হলেন। তখন আবদুল আলীমের বয়স ছিল মাত্র দশ থেকে এগারো বছর।
নজরুলের আশীর্বাদ ও প্রথম রেকর্ড
কলকাতার সংগীতাঙ্গনে তখন এক উত্তাল সময়। গ্রামোফোন কোম্পানিগুলোতে চলছে রমরমা রেকর্ডিং। এক ভদ্রলোক ছিলেন হুগলির বাসিন্দা মোহাম্মদ সুলতান—খুব নামকরা কবি ও লেখক। তিনিই আবদুল আলীমকে গ্রামোফোন কোম্পানিতে নিয়ে গেলেন। বিকালে সেখানে গিয়ে দেখলেন, কাজী নজরুল ইসলাম বসে আছেন। তিনি তখন হয়তো কিছু লিখছিলেন। মোহাম্মদ সুলতান সাহেব বললেন, ‘কাজীদা, একটা ছেলেকে নিয়ে এসেছি একটু গান শুনুন’। নজরুল আবদুল আলীমকে বললেন, ‘তুমি গাও’। আবদুল আলীম তখন কাজী সাহেবেরই লেখা একটি গান গাইলেন—‘উঠলো তুফান পাপ দরিয়ায়’। নজরুল শুনে খুব খুশি হলেন। তারপর গ্রামোফোন কোম্পানির ট্রেনারকে বললেন এই ছেলেটির দুটি গান রেকর্ড করতে। গান দুটি ছিল—‘তোর মোস্তফাকে দেনা মাগো, সঙ্গে লয়ে যাই, মোদের সাথে মেষচারণে ময়দানে ভয় নাই’ এবং ‘আফতাব ওই বসলো পাটে আঁধার এল ছেয়ে, চল ফিরে চল মা হালিমা আছে রে পথ চেয়ে’। এই ছিল আবদুল আলীমের জীবনের প্রথম গ্রামোফোন রেকর্ড। দুর্ভাগ্যবশত সেই রেকর্ডটি পরে ভেঙে ফেলেছিলেন তিনি।
দেশভাগ ও ঢাকায় নতুন জীবন
প্রথম রেকর্ডের কিছুদিন পরই দেশভাগের ঘটনা ঘটে। আবদুল আলীমের বয়স তখন প্রায় ১৭ বছর। দেশভাগের দিন পনেরোর মাথায় তিনি ঢাকায় চলে আসেন। তার ভাই তাকে বললেন, ‘চলো ঢাকা যাই’। আর এটাই তার ভাগ্য চিরতরে পাল্টে দেয়। ঢাকা শহর তাকে আপন করে নিল, আর তিনিও ঢাকাকে দিলেন তার জীবনের সেরা সব গান।
ঢাকায় এসে শুরু হলো নতুন সংগ্রাম। তখন ঢাকার সংগীতাঙ্গন ছোট, রেডিও পাকিস্তানের ঢাকা কেন্দ্রই প্রধান মাধ্যম। আবদুল আলীম সুযোগ পেলেন রেডিওতে গান করার। ধীরে ধীরে তার কণ্ঠ ছড়িয়ে পড়তে লাগল পূর্ব বাংলার ঘরে ঘরে। ১৯৫০-এর দশকের শুরুতে রেডিওতে ‘ও মুর্শিদ পথ দেখায়া দাও’ রিলিজের পর তোলপাড় পড়ে গেল সারাদেশে। গ্রামের চায়ের দোকানে, শহরের রেস্তোরাঁয়, নৌকার মাঝির মুখে—সবখানে এই গান।
ঢাকায় এসে তিনি মমতাজ আলী খান সাহেবের কাছে তিন-চার বছর একাধারে গান শিখেছিলেন। এরপর মরহুম আব্বাসউদ্দীন সাহেব সাদেকুর রহমান সাহেবের বাড়িতে তার গান শুনলেন। শুনেই বললেন, ‘তোমাকে আমি চাকরি দেবো পাবলিসিটি ডিপার্টমেন্টে’। তখন আবদুল আলীম বেশ অভাবে ছিলেন। রেডিওতে গান গেয়ে দশ টাকা করে পেতেন, সারাদিন গান গেয়েও দশ টাকাই আয় হতো। তখন রেডিও অফিস ছিল নাজিমুদ্দিন রোডে। আব্বাসউদ্দীন সাহেব তাকে চাকরি দিলেন। তিন বছর চাকরি করার পর তিনি আবদুল আলীমকে বললেন, ‘তুমি ক্লাসিক্যাল গান শেখো, উচ্চাঙ্গ সংগীত শেখো’। তখন ওস্তাদ মোহাম্মদ হোসেন খসরু সাহেবের কাছে তিন বছর উচ্চাঙ্গ সংগীত চর্চা করলেন। কিন্তু খসরু সাহেব ইন্তেকাল করলে তার সংগীত শিক্ষা থেমে যায়। তবুও তিনি বাড়িতে নিয়মিত রেওয়াজ করতেন।
কানাইলাল শীলের ভাবধারা
আবদুল আলীমের সংগীত জীবনে আরেক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় যুক্ত হয় বাবু কানাইলাল শীলের সান্নিধ্যে এসে। এই ওস্তাদ তাকে চার-পাঁচ বছর গান শিখিয়েছিলেন। কানাইলাল শীলের গানের ভাবধারা ছিল অন্যরকম—আলাদা। আবদুল আলীম নিজেই স্বীকার করেছেন, তার ভাবধারায় গান করে তিনি আরও বেশি নাম করলেন বাংলাদেশে। কানাইলাল শীলের প্রথম যে গানটি তিনি গাইলেন, সেটি ছিল—‘ভাটি গাঙের ভাইটাল সুরে’। এই গানটি তার কণ্ঠে নতুন মাত্রা পেয়েছিল।
প্রেমের মরা জলে ডোবে না
১৯৬০ সালে স্ত্রী জমিলা খাতুনের কাছ থেকে শেখা ‘প্রেমের মরা জলে ডোবে না’ গানটি এইচএমভি থেকে রিলিজের পর তার জনপ্রিয়তা তুঙ্গে উঠে যায়। বাংলাদেশে এটিই ছিল তার প্রথম রেকর্ড। গানটির কথা ও সুর এমনই ছিল যে, মানুষ একবার শুনলে ভুলতে পারত না। আবদুল আলীমের গায়কী এতটাই হৃদয়স্পর্শী ছিল যে, মনে হতো তিনি শুধু গান গাইছেন না, বরং নিজের জীবনের কথা বলছেন। এই গান তাকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেল।
নিজের সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, তার স্ত্রী একদিন হঠাৎ গানটি গাইছিলেন। গানটি শুনে তার খুব ভালো লাগল। তিনি স্ত্রীকে বললেন, ‘গানটা লিখে দাও তো’। সম্পূর্ণ গানটা লিখে নিলেন। তারপর বিভিন্ন জায়গায় গাইতে লাগলেন। মানুষ খুব প্রশংসা করতে লাগল। তার স্ত্রী বললেন, ‘এইটা মারফতি গান, এইটা তুমি গাইবা এবং রেকর্ড করার চেষ্টা করবা’। স্ত্রীর পরামর্শেই তিনি গানটি রেকর্ড করেন। এখানেই আবদুল আলীমের জীবনের এক অনন্য দিক ফুটে ওঠে—তার স্ত্রীও ছিলেন সংগীতগুণী এবং স্বামীর সংগীত জীবনে প্রেরণার উৎস।
তখন থেকেই সিনেমায় গাওয়ার জন্য পরিচালকরা ধীরে ধীরে তার দ্বারস্থ হতে শুরু করেন। একটা সময় ছিল সিনেমার পরিচালকরা চেষ্টা করতেন সিনেমায় যেন অন্তত একটা হলেও আবদুল আলীমের গান থাকে। এবং অন্তত ৫০টিরও বেশি সিনেমায় আবদুল আলীম গান গেয়েছিলেন। ঢাকার চলচ্চিত্রের সোনালি যুগে তার গান ছিল অন্যতম আকর্ষণ। দর্শকরা সিনেমা হলে গান শোনার জন্যই আসতেন।
ভাটিয়ালির সম্রাট
হামদ, নাত, মুর্শিদী, মারফতি, দেহতত্ত্ব, জারি, সারি, ইসলামি গান সহ বহুধরণের গান গাইলেও আবদুল আলীমের সবচেয়ে বড় লিগ্যাসি তৈরি হয় ভাটিয়ালি গানের মাধ্যমে। নিজের সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, ‘আমার ভালো লাগে খুব ভাটিয়ালি গান। ভাটিয়ালি গান মানে আমাদের দেশ তো নদীমাতৃক দেশ। মাঝিরা যখন সেই ভাটিয়ালি গান গায়, তখন ভাটির গানের সুরটা … আমার অন্তরটা যেন পাগল হয়ে যায়। সেই টান আর সেই সুর, আর যখন পাল তুলে যায় সেই গান গাইতে গাইতে, আমার নিজেকে খুব ভালো লাগে। সেইজন্য ভাটিয়ালি গান আমার সবচেয়ে বেশি মধুর লাগে’।
ভাটিয়ালি গানের প্রতি এই গভীর ভালোবাসাই তাকে বাংলা লোকসংগীতের ইতিহাসে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিল। সাস্টেইন্ড ভয়েস, ইমোশনার ফ্রেজিং এবং লো রেজিস্টার মুভমেন্টের কম্বিনেশনে তিনি বাংলার ভাটিয়ালিকে বার্মা, চীন, রাশিয়ার মানুষের কাছ পর্যন্ত নিয়ে গিয়েছিলেন। ভাটিয়ালির সুরে বয়ে গেছে বাংলার নদীর টান, মানুষের বেদনা, প্রেমের আকুতি। বিদেশের মঞ্চে দাঁড়িয়ে তিনি যখন গাইতেন ‘সর্বনাশা পদ্মা নদী’, তখন সেখানকার মানুষও বুঝে যেত, এই সুরের ভেতরে কোনো এক গভীর সত্য লুকিয়ে আছে। সঙ্গীতের ভাষা সর্বজনীন, আর আবদুল আলীম সেই ভাষারই এক উজ্জ্বল প্রতিনিধি।
বিদেশ সফরের অভিজ্ঞতা
আবদুল আলীম রাশিয়া, চীন এবং বার্মা সফর করেছিলেন। এই সব দেশে গিয়ে তিনি নিজের দেশের গানই গেয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘আমি গেছি বাংলাদেশের গান গাইতে, বাংলাদেশের গান তুলে ধরেছি যেন বাংলাদেশের গান গেয়ে তাদের খুশি করতে পারি। হয়তো গান গাওয়ার সময় ভাটিয়ালির টান দিছি একটা, ক্ল্যাপস দিতেই থাকল। থামে না!’ বিদেশের মাটিতে দাঁড়িয়ে তিনি নিজের দেশের সংস্কৃতিকে তুলে ধরতেই সচেষ্ট ছিলেন।
বিদেশ সফরের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে তিনি বলেছিলেন, ‘ওরা নিজেদের সংস্কৃতি প্রথম ওরা ভালো করে রাখবার সবসময় চেষ্টা করে। ভিনেদেশিটা হয়তো তাদের ডেস্কে খুশি করবার জন্য কিছুটা শেখে। নিজ দেশের সংগীতটাকে সবসময় শ্রেষ্ঠ স্থানে রাখার জন্য চেষ্টা করে’। এই পর্যবেক্ষণ থেকেই তার দেশীয় সংস্কৃতির প্রতি গভীর ভালোবাসার পরিচয় পাওয়া যায়। তিনি বিদেশি ভাষায় কোনো গান জানতেন না, কারণ তিনি চেষ্টাই করেননি। তার মতে, বাংলাদেশের গান গেয়েই তিনি বিদেশিদের খুশি করতে পেরেছিলেন।
সংগ্রাহক আবদুল আলীম
তিনি যে শুধু গান গাইতেন তা না, তিনি একজন প্রসিদ্ধ লোকগানের সংগ্রাহকও ছিলেন। বাংলার লোকগান যাতে হারিয়ে না যায়, তার জন্য তিনি ছুটে বেরিয়েছেন গ্রাম থেকে গ্রামে। বিভিন্ন অঞ্চলের প্রবীণ শিল্পীদের কাছ থেকে গান সংগ্রহ করেছেন, লিখে রেখেছেন। এই গানগুলো আজ বাংলা লোকসংগীতের অমূল্য ভাণ্ডার।
বাংলাদেশের পল্লী সংস্কৃতির বিকাশ প্রসঙ্গে তিনি বলেছিলেন, ‘এখন আমাদের সকলেরই চেষ্টা করা দরকার যে, দেশের যেসব সম্পদ পড়ে আছে, এগুলি সব সংগ্রহ করে রাখা আমাদের একটা নিজস্ব জায়গায়। এবং যেইসব শিল্পী গ্রামে পড়ে আছে, ভালো ভালো গলা, তারা ভালো ভালো গানও জানে, ভালো ভালো লিখতেও জানে—তাদের একটা বিহিত করা উচিত’। তিনি প্রস্তাব করেছিলেন, ‘মহকুমায়-মহকুমায়, জেলায়-জেলায় যদি একটা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলে … ইশকুল … গান শেখার ইশকুল, সেখানে যদি তাদের নিয়ে এসে গান শেখার ব্যবস্থা করা হয়, আমার মনে হয় বহু শিল্পীর জন্ম হবে বাংলাদেশে’। তার এই দূরদর্শী চিন্তা আজও প্রাসঙ্গিক।
পল্লীগীতির প্রতি গভীর অনুরাগ
আবদুল আলীম সব ধরনের গানই গাইতেন—রবীন্দ্র সংগীত, নজরুল ইসলামের গান, ভাটিয়ালি, বাউল গান। কিন্তু হঠাৎ পল্লীগীতির সুর যেন তাকে পাগল করে ফেলল। ঢাকায় প্রথম আসার পর একদিন রাস্তায় দাঁড়িয়ে রেডিওতে মমতাজ আলী সাহেবের একটি গান শুনছিলেন। সঙ্গে বাঁশের বাঁশি বাজছিল। সেই গান শুনে তিনি রাস্তায়ই দাঁড়িয়ে গিয়েছিলেন। তার এত ভালো লেগেছিল যে তখনই তিনি ঠিক করলেন—এই গানই শিখবেন, আর কোনো গান শিখবেন না। ভালো শিল্পী হওয়ার প্রসঙ্গে তার মতামত ছিল স্পষ্ট- ‘ভালো শিল্পী হতে গেলে প্রথমে গলা ভালো হতে হবে। গলা ভালো না হলে তার কিছুই হবে না। প্রথম গলা। তারপর সেই গলাকে তৈরি করতে হলে উচ্চাঙ্গ সংগীত শিখতে হবে। এবং সেই রাগরাগিণীর উপর কিছু রেওয়াজ করতে হবে। ফলে, তার গলার কারুকার্য কিছু তৈরি হয়। যেন তার গায়কী একটু ফ্রি হয়, যেন অসুবিধা বোধ করে না’।
পল্লীগীতির সুর সম্পর্কে তিনি বলেছিলেন, ‘এইটা আমি বলতে গেলে—এর সুর বোধহয় হাজার রকমের আছে … কিন্তু সেই সুর আমরা গাইতে চেষ্টা করিনি। একই রকম সুরে ফেলে কোনোরকম চালাই। কিন্তু আমার মনে হয়, সেই সুর যদি ঠিক পরিষ্কারভাবে তুলি আমরা, সেই গানের, নিশ্চয়ই সেই নতুনত্ব, একেক গানের পর আরেক গান … নিশ্চয়ই একঘেয়েমো লাগবে না’। এই মন্তব্যে তার শিল্পীসত্তার গভীরতা ও সংবেদনশীলতা প্রকাশ পায়।
স্ত্রীর প্রেরণা ও পরিবার
আবদুল আলীমের জীবনে স্ত্রী জমিলা খাতুন ছিলেন এক অসাধারণ প্রেরণা। গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে গান গাইতে গিয়ে তার অধিকাংশ সময় বাইরে থাকতে হতো। স্ত্রীর মনে কোনো প্রতিক্রিয়া আছে কিনা—এই প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছিলেন, ‘বউ তো আমাকে সবসময় উৎসাহের সঙ্গে বলেছে যে, যাও গ্রামে যাও। গান গাও। গ্রামের লোককেও শোনাবে। তাহলেই তো তুমি দোয়া পাবে, তবেই তো তুমি বড় হবে’। স্ত্রী নিজেও কিছু গান জানতেন। ‘প্রেমের মরা জলে ডোবে না’ গানটি আবদুল আলীম স্ত্রীর কাছ থেকেই শিখেছিলেন।
তার সাত ছেলেমেয়ে—চার মেয়ে, তিন ছেলে। তিনি নিজে ছেলেমেয়েদের গান শেখাননি। তবে তিনি যখন বাড়িতে থাকতেন না, তখন তিন-চারজন নিজে থেকেই হারমোনিয়াম বাজিয়ে গান শুরু করত। ঘরে ঢোকার সময় তিনি তা শুনতে পেতেন। পরিবারের প্রতি তার এই মমতাই বলে দেয়, মানুষ হিসেবে তিনি কতটা আন্তরিক ছিলেন।
সিলেটের স্মরণীয় ঘটনা
আবদুল আলীমের জীবনের এমন অনেক ঘটনা ছিল যা তার মনে গভীর রেখাপাত করেছে। এমনই এক ঘটনার কথা তিনি নিজেই বলেছেন। সিলেট লাইনে এক গ্রামে গান গাইতে গিয়েছিলেন। তার নাম শুনে বহু লোক এসেছে। জায়গা ঘেরাও করে টিকিট বিক্রি হয়েছে, জায়গা ভরে গেছে। বাইরেও দুই-তিন হাজার লোক দাঁড়িয়ে আছে টাকা নিয়ে, টিকিট চাচ্ছে কিন্তু দেওয়া হচ্ছে না—জায়গা নেই। এই নিয়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত। তিনি প্রথম গানটা শুরু করলেন—‘রূপালি নদী রে’। তখন বাইরের লোকগুলো বাউন্ডারি ভেঙে মারপিট শুরু করে দিল। ‘কেন জায়গা দেওয়া হবে না? টিকিট দেবে না কেন, আমরা তো টাকা নিয়ে এসেছি!’ এই অবস্থা দেখে আবদুল আলীম হারমোনিয়াম ছেড়ে দৌড় দিলেন। পরে হাসতে হাসতে বলেছিলেন, ‘সব ফেলে থুয়ে পলাইছি! কে চিনবে আবদুল আলীম! কার মাথায় কোন লাঠি কিভাবে পড়ে যায়, আমার মাথায় দুএকটা পড়ে যেতে পারে!’ এই ঘটনা থেকে বোঝা যায়, তার জনপ্রিয়তা ছিল তুঙ্গে, আর মানুষের ভালোবাসা ছিল উচ্ছ্বসিত।
আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি
ইউনিভার্সিটি অব শিকাগোর একটি গবেষণায় আবদুল আলীমকে বাঙালি মুসলিম কমিউনিটির প্রথম বড় স্কেলের রেকর্ডিং আর্টিস্ট হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। এই স্বীকৃতি তার সংগীতজীবনের আন্তর্জাতিক গুরুত্বকেই প্রমাণ করে। তিনি শুধু বাংলাদেশের শিল্পী ছিলেন না, তিনি ছিলেন বিশ্বের শিল্পী। তার গানের সুরে বাঙালির হৃদয়ের স্পন্দন ফুটে উঠত, আর তা সীমান্ত পেরিয়ে মানুষের মন ছুঁয়ে যেত।
অমর গান, অমর স্মৃতি
আবদুল আলীমের গাওয়া গানগুলোর তালিকা দীর্ঘ। 'সর্বনাশা পদ্মা নদী', 'হলুদিয়া পাখি', 'দুয়ারে আইসাছে পালকি', 'পরের জায়গা পরের জমিন', 'নবী মোর পরশমনি', 'সব সখীরে পার করিতে', 'এই যে দুনিয়া', 'ও যার আপন খবর' সহ অসংখ্য জনপ্রিয় গান তাকে বাংলাদেশি শ্রোতাদের মনে আজীবন অমর করে রেখেছে। এছাড়া তাঁর কণ্ঠে 'রূপালি নদী রে', 'ভাটি গাঙের ভাইটাল সুরে'—এসব গানও মানুষ ভুলতে পারেনি। প্রতিটি গানে তিনি ঢেলে দিয়েছেন নিজের হৃদয়, নিজের অনুভব। গানগুলো শুধু বিনোদনের মাধ্যম নয়, বরং জীবনের দর্শন, প্রেমের গভীরতা, আর মানুষের চিরন্তন আকুতি বহন করে। 'সর্বনাশা পদ্মা নদী' গানটিতে ভাটিয়ালির যে রূপ ফুটে উঠেছে, তা আজও মানুষের মন কাঁদায়। গানটির সেই বিখ্যাত কলি— "সর্বনাশা পদ্মা নদী, তোর কাছে শুধাই/ বল আমারে তোর কী রে আর/ কূল কিনারা নাই, ও নদীর কূল কিনারা নাই"
নদীর ভাঙনে সর্বস্ব হারানো মানুষের বেদনা আবদুল আলীমের কণ্ঠে জীবন্ত হয়ে উঠেছে। 'হলুদিয়া পাখি' গানে পাখির প্রতীকের মাধ্যমে মানুষের মনের আশা-আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ পেয়েছে। 'দুয়ারে আইসাছে পালকি' গানে বিবাহিতা নারীর মনের টানাপোড়েন ফুটে উঠেছে। প্রতিটি গানই যেন এক একটি জীবনদর্শন। এই গানগুলো প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মানুষের হৃদয়ে বেঁচে থাকবে।
দুঃখের বিষয়, তার গাওয়া গানের অর্ধেক গানই বর্তমানে সংরক্ষিত নেই। প্রযুক্তির অভাবে, সংরক্ষণের সঠিক ব্যবস্থা না থাকায় অনেক অমূল্য গান চিরতরে হারিয়ে গেছে। তবু যা আছে, তা-ই বাংলা সংগীতের অমূল্য সম্পদ। আজও রেডিওতে, টেলিভিশনে, ইউটিউবে আবদুল আলীমের গান বাজে, আর নতুন প্রজন্মও মুগ্ধ হয়। তাঁর গানের আবেদন কোনো দিন কমবে না, কারণ তিনি গেয়েছিলেন মানুষের হৃদয়ের কথা।
জীবনের শেষ দিনগুলো
স্বাধীনতার মাত্র আড়াই বছর পর ১৯৭৪ সালের ৫ সেপ্টেম্বর মাত্র ৪৩ বছর বয়সে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। এত কম বয়সে চলে যাওয়াটা বাংলা সংগীতের জন্য বিরাট ক্ষতি। মৃত্যুসংবাদ ছড়িয়ে পড়তেই সারাদেশে নেমে আসে শোকের ছায়া। বাংলা সংগীত হারাল তার অন্যতম সেরা রত্নকে। তিনি আরও অনেক গান উপহার দিতে পারতেন, কিন্তু না, আকাশের নক্ষত্র যেন অকালে ঝরে গেল। আবদুল আলীমের মৃত্যুতে বাংলা লোকসংগীতের এক বিশাল অধ্যায়ের অবসান হলো। তবে তার রেখে যাওয়া গানগুলো আজও বেঁচে আছে, থাকবে আগামী প্রজন্মের হৃদয়ে। তার গানের সুরে ভেসে আসে বাংলার মাটি, নদী, আকাশ, মানুষের মুখ। সেই সুর কখনো ম্লান হবে না। যে গানগুলো রেকর্ড হয়েছে, তা-ই তাকে বাংলা সংগীতের ইতিহাসে চিরস্থায়ী করে রেখেছে।
উত্তরাধিকার
আবদুল আলীমের জীবন থেকে আমরা যে শিক্ষা পাই, তা হলো—সাধারণ মাটি থেকেও উঠে আসা যায় অসাধারণ উচ্চতায়। মুর্শিদাবাদের প্রত্যন্ত গ্রামের লাজুক ছেলেটি হয়ে উঠেছিলেন বাংলা লোকসংগীতের সম্রাট। তার গানে যে মাটির গন্ধ, নদীর টান, মানুষের ভালোবাসা, তা কোনোদিন পুরনো হবে না। তার শিষ্য ও অনুসারীরা আজও তার গানের ধারা বহন করছেন। অনেক তরুণ শিল্পী আবদুল আলীমের গান গেয়ে নিজেদের সংগীতজীবন শুরু করেছেন। তিনি শুধু একজন শিল্পীই নন, তিনি একটি ধারা, একটি ঐতিহ্যের নাম। তার গান কেবল বিনোদন নয়—এ গান আমাদের শিকড়ের সন্ধান দেয়, আমাদের মাটির প্রতি ভালোবাসা জাগায়, নদীর মতো বহতা জীবনের কথা মনে করিয়ে দেয়।
আজ এই কিংবদন্তি শিল্পীর ৫২তম মৃত্যুবার্ষিকীতে আমরা জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা। তার গান আমাদের হৃদয়ে বাজুক যুগ যুগ ধরে। বাংলার নদী যেমন চিরকাল বয়ে চলে, তেমনই বয়ে চলুক আবদুল আলীমের সুর—প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে, হৃদয় থেকে হৃদয়ে। এই অমর শিল্পীর প্রতি রইল অফুরান শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।







