Agamir Somoy E-Paper
বৃহস্পতিবার, ১ অক্টোবর, ২০২৬
আগামীর সময়
গরিবের ডাক্তার খুরশীদ আলম
বৃহস্পতিবার, ১ অক্টোবর, ২০২৬
আগামীর সময়
  • সর্বশেষ
  • জাতীয়
  • রাজনীতি
  • অর্থনীতি
  • চট্টগ্রাম
  • সারা দেশ
  • বিদেশ
  • খেলা
  • বিনোদন
  • লাইফস্টাইল
  • মতামত
  • ফিচার
  • ভিডিও
  • শিক্ষা
  • ক্লাব
  • বিচিত্রা
  • চাকরি
  • ছবি
  • সাহিত্য
  • বিবিধ
  • ধর্ম
  • প্রবাস
  • ফ্যাক্টচেক
  • সোশ্যাল মিডিয়া
  • ধন্যবাদ
  • বিশেষ সংখ্যা
  • সর্বজনের গল্প
  • বিশেষ লেখা
EN
  • সর্বশেষ
  • জাতীয়
  • রাজনীতি
  • অর্থনীতি
  • চট্টগ্রাম
  • সারা দেশ
  • বিদেশ
  • খেলা
  • বিনোদন
  • লাইফস্টাইল
  • মতামত
  • ফিচার
  • ভিডিও
  • শিক্ষা
  • ক্লাব
  • ইপেপার
  • EN
লোড হচ্ছে…

প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক : আবদুস সাত্তার মিয়াজী

সম্পাদক : মোস্তফা মামুন

আগামীর সময়
আমাদের সম্পর্কেযোগাযোগশর্তাবলিগোপনীয়তাআমরা

ইডিবি ট্রেড সেন্টার (লেভেল-৬ ও ৭), ৯৩ কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ, কারওয়ানবাজার, ঢাকা-১২১৫

যোগাযোগ: ০৯৬৬৬ ৭৭১০১০

বিজ্ঞাপন: ০১৭৫৫ ৬৫১১৬৪

[email protected]

স্বত্ব © ২০২৬ | দৈনিক আগামীর সময়

আগামীর সময় গান

জন্মদিনে স্মরণ

অমর সুরস্রষ্টা শচীন দেববর্মণ

শিমুল সালাহ্‌উদ্দিন
শিমুল সালাহ্‌উদ্দিন
agamir somoy
প্রকাশ: ০১ অক্টোবর ২০২৬, ১৭:১৪
অমর সুরস্রষ্টা শচীন দেববর্মণ

শচীন দেববর্মন (১ অক্টোবর, ১৯০৬ - ৩১ অক্টোবর, ১৯৭৫)

প্রথম অক্টোবর। আশ্বিনের আকাশে ময়লা কালিকাঁথার কোনো চিহ্ন নেই। শরতের সাদা মেঘের ভেলা বাংলার আকাশে আকাশে। নিচে দিগন্তজোড়া কাশফুলের হিল্লোল। এমন এক দিনেই কি জন্মেছিলেন বাংলা গানের এক অমর কিংবদন্তি শচীন দেববর্মণ? যাঁর সুরের জাদুতে মুগ্ধ হয়েছেন লতা মঙ্গেশকর থেকে কিশোর কুমার, হেমন্ত মুখোপাধ্যায় থেকে মান্না দে, প্রায় সব প্রজন্মের গায়ক-শ্রোতা। যাঁর কণ্ঠে ছিল এক আশ্চর্য অনুনাসিক মাধুর্য, যাঁর সুরসৃষ্টিতে মিশে ছিল বাংলার মাটি আর লোকগানের গভীর থেকে উঠে আসা আত্মা।

আজ তাঁর জন্মদিনে আমরা দাঁড়িয়ে, যখন কুমিল্লার চর্থায় সেই ঐতিহাসিক পৈতৃক ভিটাটি এখনো ভগ্নপ্রায় অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে, তখন প্রশ্ন জাগে, আমরা কি আমাদের ইতিহাসের প্রতি সুবিচার করছি? শচীন দেববর্মণ শুধু একজন সংগীত পরিচালক ছিলেন না, তিনি ছিলেন বাংলার লোকসংগীতের ধারক ও বাহক, প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সংগীতের সেতু এবং সেই বিরল প্রতিভা, যিনি রাজপরিবারের সন্তান হয়েও সাধারণ মানুষের গান গেয়েছেন, সাধারণ মানুষের জন্য তৈরি করেছেন এমন সুর, যা তাঁদের রন্ধ্রে রন্ধ্রে বয়ে চলে। তাই বুঝি তিনি শচীনকর্তা।


বর্ণে গন্ধে ছন্দে গীতিতে

১৯০৬ সালের ১ অক্টোবর। কুমিল্লার চর্থা এলাকার এখন পরিত্যক্ত হয়ে যাওয়া তৎকালীন ঝলমলে প্রাসাদে জন্ম নিলেন এক শিশু, যাঁর কপালে লেখা ছিল উপমহাদেশের সংগীত-ইতিহাস নতুন করে লেখার মহান ভবিতব্য। তিনি ছিলেন ত্রিপুরার চন্দ্রবংশীয় মানিক্য রাজপরিবারের সন্তান। পিতা নবদ্বীপচন্দ্র দেববর্মণ ছিলেন ত্রিপুরা রাজ্যের মহারাজা বীরচন্দ্র মাণিক্য বাহাদুরের বৈমাত্রেয় ভাই এবং একজন সেতারবাদক ও ধ্রুপদি সংগীতশিল্পী। মা নিরুপমা দেবী ছিলেন মণিপুর রাজবংশের মেয়ে।

কুমিল্লায় শচীন দেববর্মণের বাড়ির বর্তমান দশা

বীরচন্দ্র মাণিক্যের অর্থানুকূল্যে কুমিল্লার চর্থায় ৬০ একর জমি নিয়ে প্রাসাদ নির্মাণ করেছিলেন কুমার বাহাদুর নবদ্বীপচন্দ্র। এই প্রাসাদে ১৯০৬ সালের পয়লা অক্টোবর তাঁর ছোট সন্তান শচীন দেববর্মণের জন্ম। সিংহাসনের দাবিদার থাকা সত্ত্বেও বীরচন্দ্রের হিংস্রতার কারণে কৈলাসচন্দ্র সিংহের পরামর্শে নবদ্বীপচন্দ্র সপরিবারে কুমিল্লায় চলে আসেন এবং সেখানেই স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। রাজা-রাজড়ার সেই বিলাসবহুল জীবন যেন তাঁদের নিয়তিতে ছিল না। তাই সংগীতের আবহাওয়াতেই বেড়ে উঠেছিলেন তিনি, যেন বিধাতা তাঁকে সুরের সন্তান হয়েই পাঠিয়েছিলেন এই পৃথিবীতে।

ত্রিপুরার আগরতলায় কুমার বোর্ডিং স্কুলে শচীন দেববর্মণের প্রাথমিক শিক্ষা সম্পূর্ণ হয়। ত্রিপুরার রাজপরিবারের সন্তানদের এবং তথাকথিত ধনী ঘরের সন্তানদের পড়াশোনার জন্যই এই স্কুলটি বিশেষভাবে তৈরি হয়েছিল। পরে তাঁর বাবা নবদ্বীপচন্দ্র তাঁকে কুমিল্লার ইউসুফ স্কুলে ভর্তি করে দেন। এই স্কুলে কিছুদিন কাটিয়ে কুমিল্লা জেলা স্কুলে পঞ্চম শ্রেণিতে ভর্তি হন শচীন দেববর্মণ। ১৯২০ সালে কুমিল্লা জেলা স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাস করে ভিক্টোরিয়া কলেজে ভর্তি হন শচীন। ১৯২২ সালে ওই কলেজ থেকে আইএ পাস করেন মেধাবী শচীন। ১৯২৪ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে এমএতে ভর্তি হন।

কুমিল্লায় থাকাকালীন বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে তাঁর পারিবারিক সখ্য গড়ে উঠেছিল। ১৯১০ থেকে ১৯২০ সাল পর্যন্ত ঠাকুরপাড়ার সুরলোক, কান্দিরপাড়ের সবুজ সংঘ নাট্যদল, দ্য গ্রেট জার্নাল থিয়েটার পার্টি, ইয়ংম্যান্স ক্লাব ইত্যাদি নিয়ে গড়ে উঠেছিল কুমিল্লার সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল। ত্রিপুরার মহারাজারা কুমিল্লায় তৈরি করেছেন টাউন হল, নাট্যশালা, লাইব্রেরি এবং নানা সাংস্কৃতিক কেন্দ্র।

শচীন দেববর্মণ, ছবিতে তাঁর অটোগ্রাফ

১৯২০ সালের দিকে শচীনদেবের বন্ধুদের মধ্যে ছিলেন সুরসাগর হিমাংশু দত্ত, অজয় ভট্টাচার্য, মোহিনী চৌধুরী, সমরেন্দ্র পাল, কাজী নজরুল ইসলাম, শৈলবালা দাম, ধ্রুপদীয়া সৌরেন দাশ, সুধীন দাশের মতো পরবর্তীকালে স্ব-স্ব ক্ষেত্রে বিখ্যাত ব্যক্তিরা। সেখানে নিয়মিত আসতেন চলচ্চিত্র পরিচালক সুশীল মজুমদার, ননী মজুমদার, ব্রজেন ব্যানার্জি, জিতু দত্ত, অরুণ মহলানবিশ। গানের ধরন ছিল ভোরকীর্তন, নগরকীর্তন, কবিগান, ঢপযাত্রা। সাহিত্যিক, সুরকার, গীতিকার, কবি ও সংগীতজ্ঞরা একত্রিত হতেন ইয়ংম্যান্স ক্লাবে। আড্ডা থেকে ভেসে আসত নজরুল ও শচীন দেববর্মণের গান।

শচীন দেববর্মণের সংগীতজীবনের পেছনে রয়েছে এক দারুণ কাহিনি। কুমিল্লার চর্থায় তাঁর বাড়ির উল্টো দিকে ছিল মুন্সিবাড়ি। সেই বাড়ির ছেলে মর্তুজ মিয়ার সঙ্গে শচীনের ছিল বাল্যবন্ধুত্ব। একদিন রাতে দুজনে রাস্তায় পায়চারি করছিলেন, আর শচীন গুনগুন করে গান গাইছিলেন। সেই গান শুনে মুগ্ধ হয়ে বাড়ির জমিদার নাবালক মিয়া চাকর সফর আলীকে পাঠিয়ে তাঁকে ডেকে আনলেন। ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে শচীন যখন জমিদারের সামনে হাজির হলেন, তখন নাবালক মিয়া জিজ্ঞাসা করলেন, “তোর তো গলা খুব ভালো। কোনো বাদ্যযন্ত্র আছে কি?” শচীন না-বোধক উত্তর দিলে সেই জমিদার তাঁকে হারমোনিয়াম, তবলা, পিয়ানোসহ নানা বাদ্যযন্ত্র কিনে দেন এবং কানাকেষ্ট নামের এক তবলচিকে রেখে দেন তাঁর সংগীতচর্চার জন্য। সেই রাত থেকেই যেন শুরু হয় এক নতুন অধ্যায়।

বাংলা মায়ের কোল

শচীন দেববর্মণের সংগীতশিক্ষার সূচনা হয়েছিল তাঁর বাবার কাছেই। বাবা নবদ্বীপচন্দ্র দেববর্মণ ছিলেন একজন সেতারবাদক এবং ধ্রুপদি সংগীতশিল্পী। তিনিই ছিলেন শচীন দেববর্মণের প্রথম শিক্ষক। ১৯২৫ থেকে ১৯৩০ সাল পর্যন্ত তিনি সংগীতাচার্য কৃষ্ণচন্দ্র দের কাছে সংগীতচর্চা করেন। এরপর তাঁর সংগীত শিক্ষা চলে ওস্তাদ বাদল খান এবং বিশ্বদেব চট্টোপাধ্যায়ের তত্ত্বাবধানে। ধ্রুপদি সংগীতের এই শিক্ষা তাঁর মধ্যে সংগীতের মৌলিক জ্ঞান সঞ্চারে গভীর ভূমিকা পালন করে। এই শিক্ষা তাঁর পরবর্তী জীবনের সুরসাধনায় প্রভাব বিস্তার করেছিল।

পিতাপুত্র, শচীন দেববর্মণ ও রাহুল দেববর্মণ

পরবর্তীতে তিনি ওস্তাদ আফতাবউদ্দিন খাঁর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। এছাড়াও তিনি ভীষ্মদেব চট্টোপাধ্যায়, সারেঙ্গীবাদক বাদল খান, সরোদবাদক ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ, ওস্তাদ ফৈয়াজ খাঁ, আবদুল করিম খাঁ প্রমুখের কাছে সংগীত ও বাদ্যযন্ত্রের শিক্ষা গ্রহণ করেছেন। এই বিচিত্র শিক্ষকদের কাছ থেকে পাওয়া জ্ঞান তাঁর সংগীতসৃষ্টির ভিত্তি তৈরি করে দিয়েছিল। উচ্চাঙ্গসংগীতের গভীরতা আর বাংলার লোকগীতির মমত্ব, এই দুইয়ের অপূর্ব সমন্বয় ঘটেছিল তাঁর সুরে। এজন্যই তাঁর সৃষ্টি হয়ে উঠেছিল কালোত্তীর্ণ।

আকাশবাণী কলকাতা কেন্দ্রে তিনি প্রথম গান করেন ১৯২৩ সালে। ১৯৩১ সালে শচীন দেববর্মণের পিতা নবদ্বীপচন্দ্র কলকাতায় দেহত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তিনি ছিলেন ত্রিপুরার প্রধানমন্ত্রী। শচীন দেববর্মণ তখন থাকতেন কলকাতার ত্রিপুরা প্যালেসে। নিজের লেখা ‘সরগমের নিখাদ’ নামক আত্মজীবনীতে শচীন দেববর্মণ স্বয়ং লিখেছেন, “পিতার মৃত্যুর পর আমি যেন অগাধ জলে পড়ে গেলাম। এই অবস্থায় আমি আগরতলা বা কুমিল্লা গিয়ে থাকলে রাজকীয় আরামে ও নিশ্চিন্তে নিজেদের বাড়িতে বাস করতে পারতাম এবং রাজ্য সরকারের কোনো উচ্চপদে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারতাম। আমার বড় ভাইরা আমাকে তাই করতে বললেন। আমার কিন্তু এ ব্যবস্থা মনঃপূত হলো না। নিজে একলা সংগ্রাম করে, নিজে উপার্জন করে সংগীতসাধনায় জীবন কাটিয়ে দেব। মনের মধ্যে একমাত্র এই আকাঙ্ক্ষা নিয়ে কলকাতার ত্রিপুরা প্রাসাদ ছেড়ে ভাড়া করা সামান্য একখানা ঘরে আমার আস্তানা বাঁধলাম।”

কই গেল সেই গাঁয়ের মাটি, কই সে মায়ের কোল

১৯৩২ খ্রিষ্টাব্দে তিনি অডিশনে ফেল করলেন ভারতের রেকর্ড প্রস্তুতকারী শীর্ষ প্রতিষ্ঠান এইচএমভিতে। তবে একই বছর তাঁর প্রথম গ্রামোফোন রেকর্ড বের হয় হিন্দুস্তান মিউজিক্যাল প্রোডাক্টস থেকে। শচীন দেববর্মণের প্রথম রেকর্ডকৃত দুটি গান হলো পল্লীগীতির ঢঙে গাওয়া ‘ডাকিলে কোকিল রোজ বিহানে’, যার গীতিকার হেমেন্দ্র কুমার রায় এবং খাম্বাজ ঠুমরি অঙ্গের রাগপ্রধান ‘এ পথে আজ এসো প্রিয়’, যার গীতিকার শৈলেন রায়।

১৯৩০-এর দশকে তিনি রেডিওতে পল্লীগীতি গেয়ে জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। পূর্ব বাংলা এবং উত্তর-পূর্ব বাংলার পল্লীগীতির ওপর তাঁর বিশেষ ঝোঁক ছিল। ১৯৪৪ খ্রিষ্টাব্দ থেকে স্থায়ীভাবে মুম্বাইয়ে বসবাস করতে শুরু করেন। ১৯৪৫ সাল থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত প্রায় তিন দশক ধরে শতাধিক সিনেমাতে সুর ও সংগীত পরিচালনা করেন শচীন ‘কর্তা’। লতা মঙ্গেশকর, মুহাম্মদ রফি, কিশোর কুমার, হেমন্ত মুখার্জি, মান্না দে, গীতা দত্ত, আশা ভোঁসলেসহ আরও অনেকে তাঁদের পরম শ্রদ্ধার ‘দাদা বর্মণ’-এর সুরে গান গাইতে পারলে নিজেদের ধন্য মনে করতেন। এরই ধারাবাহিকতায় আমরা পেয়েছি অসামান্য কিছু সুর আর অমর কিছু গান, যার প্রিয় তালিকা করতে যাওয়া খুব কঠিন কাজ। কোনটি ছেড়ে কোনটি নেব, তা মনস্থির করা যায় না।

শচীনকর্তা তখন মৃত্যুশয্যায়, পাশে বাংলা গানের আরেক কিংবদন্তী কিশোর কুমার

তাঁর অনুপম সৃষ্টি হিন্দি ও বাংলা গানগুলো আমাদের ঐতিহ্যবাহী ভাটিয়ালি, ভাওয়াইয়া, সারি, মুর্শিদি, বাউল, ঝুমুর গানের ভিত্তির ওপর রচিত হয়। উচ্চাঙ্গসংগীত ও বাংলা লোকগীতির এক অপূর্ব সংমিশ্রণে তিনি তৈরি করেছিলেন নিজস্ব এক সংগীতজগৎ। ‘সুন মেরে বন্ধু রে, সুন মেরে মিতওয়া...’ শুনে কারও বুঝতে এক মুহূর্তও লাগে না, এ সুরে কোন মাটির গন্ধ লেগে আছে।

সংগীত এক মহাসমুদ্র। যিনি ভালোবেসে এতে অবগাহন করেন, তিনি এতে ডুবেই থাকেন। সা-রে-গা-মা-পা-ধা-নি-সা শুধু এই সাতটি স্বরের ৫,০৪০টি প্যাটার্ন হয়, যাকে ভেঙে ভেঙে নানান তালের সংমিশ্রণে অসংখ্য সুরবিন্যাস ও সুরবৈচিত্র্য সৃষ্টি করা সম্ভব। শচীন দেববর্মণ নিজস্ব এক অপূর্ব সংগীতজগৎ তৈরি করেছিলেন, যার মূল উপাদান হচ্ছে উচ্চাঙ্গসংগীত ও আমাদের বাংলা লোকগীতির এক অপূর্ব সংমিশ্রণ।

দেশভাগ শচীন দেববর্মণকে বাংলাদেশ থেকে শারীরিকভাবে বিচ্ছিন্ন করলেও কুমিল্লা তথা বাংলাদেশকেই নিজের সংগীতের সূতিকাগার হিসেবে মনে আজীবন লালন করে গেছেন। তিনি গেয়েছেন, ‘সেই যে দিনগুলি, বাঁশি বাজানোর দিনগুলি, ভাটিয়ালির দিনগুলি, বাউলের দিনগুলি, আজও তারা পিছু ডাকে, কূল ভাঙা গাঙের বাঁকে, তাল সুপারির ফাঁকে ফাঁকে, পিছু ডাকে-পিছু ডাকে...’ আরও গেয়েছেন, ‘কই গেল সেই গাঁয়ের মাটি, কই সে মায়ের কোল, কই সে হাসি, কই সে খেলা, কই সে বুনোরোল। ওই না পাড়ে ঢোল বাজে রে, এই পাড়ে তার সাড়া, মাঝখানে বয় থই থই থই নয়ন জলের ধারা।’

কে যাস রে ভাটি গাঙ বাইয়া

১৯৩৭ সাল শচীন দেববর্মণের জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বছর। এ বছর তিনি বিয়ে করেন মীরা দাশগুপ্তকে, যিনি পরবর্তীতে মীরা দেববর্মণ নামে পরিচিত হন। মীরা ছিলেন তৎকালীন ঢাকা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি রায়বাহাদুর কমলনাথ দাশগুপ্তের নাতনী। ভীষ্মদেব চট্টোপাধ্যায়ের কাছে দুজনেই তালিম নিতেন। একসঙ্গে সংগীতের পাঠ নিতে নিতে তাঁরা প্রণয়সূত্রে আবদ্ধ হন। কিন্তু গুরু ভীষ্মদেব এই সম্পর্ক ভালো চোখে দেখেননি। এরপর ভীষ্মদেবের সঙ্গে শচীন দেবের সম্পর্ক শিথিল হতে শুরু করে এবং শেষে ভীষ্মদেব সব ছেড়েছুড়ে পন্ডিচেরির দিকে রওনা হন। তারপর মীরা দেববর্মণ শচীনকর্তার কাছে সংগীতের দীক্ষা নেওয়া শুরু করেন। একই বছর তাঁদের বিয়েও হয়।

শচীন দেববর্মণ যখন বিজ্ঞাপনের মডেল, কত বড় তারকা ছিলেন সেসময় বোঝা যায় এ বিজ্ঞাপন থেকেই

মীরা দেববর্মণ ছিলেন একজন সার্থক গীতিকার। বাংলা গানের জগতে মীরা ধর তথা মীরা দেববর্মণ অন্যতম সার্থক গীতিকার। তাঁর লেখা গানের মধ্যে রয়েছে ‘শোন গো দক্ষিণ হাওয়া’, ‘বিরহ বড় ভালো লাগে’, ‘সুবল রে বল বল’, ‘বর্ণে গন্ধে ছন্দে গীতিতে’, ‘কে যাস রে ভাটি গাঙ বাইয়া’ এবং ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দে লেখা ‘টাকডুম টাকডুম বাজাই বাংলাদেশের ঢোল’। স্বামীর মতো তিনিও ছিলেন সংগীতের জগতের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র এবং সফল ব্যক্তিত্ব।

বিয়ের দুবছর বাদে তাঁদের একটি সন্তান হয়। সেও পরবর্তীতে বাবার মতো সুরজগতের প্রবাদপুরুষ হয়ে উঠেছিল। হ্যাঁ, রাহুল দেববর্মণের কথাই বলা হচ্ছে। ভারতীয় সিনে-সংগীতের ‘ভগবান’ খ্যাত রাহুল দেববর্মণ তাঁর একমাত্র সন্তান। তিনি ভারতের বিখ্যাত সংগীত পরিচালক, সুরকার ও গায়ক ছিলেন। তাঁর ছাত্রী এবং পরবর্তীতে সহধর্মিণী মীরা দেববর্মণ গীতিকার হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন।

টাকডুম টাকডুম বাজাই বাংলাদেশের ঢোল

শচীন দেববর্মণের প্রাপ্তির ঝুলি ছিল বেশ ভারী। ১৯৩৪ খ্রিষ্টাব্দে অল ইন্ডিয়া মিউজিক কনফারেন্সে তিনি গান গেয়ে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেন এবং স্বর্ণপদক জয় করেন। ১৯৩৫ খ্রিষ্টাব্দে বেঙ্গল মিউজিক কনফারেন্সে ঠুমরি পরিবেশন করে ওস্তাদ ফৈয়াজ খাঁকে মুগ্ধ করেছিলেন। শেখ ভানুর রচনা ‘নিশিথে যাইয়ো ফুলবনে’ দেহ ও সাধনতত্ত্বের গানটিকে প্রেমের গানে রূপান্তর করলেন কবি জসীমউদ্দীনকে দিয়ে এবং রূপান্তরিত এই গানটি রেকর্ড করলেন ১৯৩৫ খ্রিষ্টাব্দে।

তিনি দুবার (১৯৫৫ ও ১৯৭৪) সংগীত পরিচালক হিসেবে ফিল্মফেয়ার পুরস্কার এবং ১৯৭০ সালে শ্রেষ্ঠ নেপথ্য গায়ক হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার (ভারত) লাভ করেন। ১৯৬৯ সালে শচীন দেবকে দেওয়া হয় ভারতের চতুর্থ সর্বোচ্চ বেসামরিক খেতাব পদ্মশ্রী। পরের বছর শক্তি সামন্তের ‘আরাধনা’ ছবির সফল ‘হোগি তেরি আরাধনা’ গানটির জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র শ্রেষ্ঠ পুরুষ প্লেব্যাক গায়ক পুরস্কার পান শচীন দেব। চার বছর পর ‘জিন্দেগি জিন্দেগি’ ছবির সংগীত পরিচালনার জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে শ্রেষ্ঠ সংগীত পরিচালকের পুরস্কার পান। এছাড়াও তিনি সংগীত নাটক একাডেমি অ্যাওয়ার্ড, বিএফজেএ অ্যাওয়ার্ডসহ অনেক সম্মাননা ও পুরস্কার অর্জন করেছেন।
পুত্র রাহুল দেববর্মণকে কোলে নিয়ে শচীন দেববর্মণ।
২০০৭ সালে শচীন দেববর্মণ স্মরণে ১৫ রুপি মূল্যের একটি ডাকটিকিট প্রকাশ করা হয়। তাঁর এই বিপুল পুরস্কার ও সম্মাননা প্রমাণ করে, তিনি শুধু জনপ্রিয় ছিলেন না, ছিলেন সমালোচকদের চোখেও স্বীকৃত এক মহান শিল্পী।

কথা কও, ফুটেছে বিদায়তারা

১৯৭৫ খ্রিষ্টাব্দে প্যারালিটিক স্ট্রোক হয়ে শচীনকর্তা কোমায় ছিলেন পাঁচ মাস। ৩১ অক্টোবর, ১৯৭৫ তাঁর প্রয়াণ হয়। মৃত্যুর কারণ স্ট্রোক। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৬৯ বছর। বোম্বে, মহারাষ্ট্র, ভারতে তাঁর জীবনাবসান ঘটে। উনসত্তরটি বসন্ত পার করে শচীনকর্তা ১৯৭৫ সালে মুম্বাইয়ের একটি হাসপাতালে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে ইহলোক ত্যাগ করেন। তাঁর মৃত্যুতে ভারতীয় সংগীত জগতে এক অপূরণীয় ক্ষতি হয়। কিন্তু তিনি রেখে যান তাঁর অমর সৃষ্টি, যা আজও শ্রোতাদের হৃদয়ে অনুরণিত হয়।

কুমিল্লায় শচীন দেববর্মণের পৈতৃক ভিটা বহু কালের, বহু ইতিহাসের সাক্ষী। সেটি রক্ষণাবেক্ষণ করা আমাদের দায়িত্ব। কিছুদিন আগে যুগান্তর পত্রিকায় প্রকাশিত বাংলাদেশের সাবেক পররাষ্ট্রসচিব সৈয়দ মোয়াজ্জেম আলীর একটি লেখা থেকে জানা যায়, “পাকিস্তান আমলে তাঁর প্রাসাদসম বাড়িটি পরিত্যক্ত ঘোষিত হয় এবং তা মিলিটারি গুদাম হিসেবে ব্যবহৃত হতো। বাংলাদেশ আমলে প্রথমে পশু চিকিৎসা কেন্দ্র হিসেবে এবং বর্তমানে হাঁস-মুরগির খামার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। দিঘি দুটিতে মাছের চাষ হচ্ছে। শচীন দেবের আদি রাজপ্রাসাদটিকে খামারের সরকারি ভবনটি প্রায় ঢেকে ফেলেছে।”

শচীন দেব বর্মন ও মীরা দেব বর্মন

এই অবস্থা আমাদের জাতীয় দৈন্যের পরিচয় বহন করে। কুমিল্লার বাড়িটি ইতোমধ্যে স্মৃতি হিসেবে সংরক্ষণের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অর্থায়নে সংস্কার ও সংরক্ষণ কাজ করা হয়েছে। এখানে আন্তর্জাতিক মানের একটি সংগীত প্রশিক্ষণ কেন্দ্র এবং মিউজিক্যাল আর্কাইভ স্থাপন করা হবে, এমন কথা রয়েছে।

তুমি যে গিয়েছ বকুল বিছানো পথে

শচীন দেববর্মণ বিংশ শতাব্দীতে ভারতীয় বাংলা ও হিন্দি গানের কিংবদন্তিতুল্য ও জনপ্রিয় সংগীত পরিচালক, সুরকার, গায়ক ও লোকসংগীত শিল্পী। প্রায় একশো বছর পার করেও বাংলা গানের শ্রোতাদের কাছে তাঁর কালজয়ী গানের আবেদন কিছুমাত্র লঘু হয়নি। কেবল সংগীতশিল্পী হিসেবে নয়, গীতিকার হিসেবেও তিনি সার্থক। তিনি বিভিন্ন চলচ্চিত্রে সংগীত পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি রবি গুহ মজুমদারের অনেক গানে সুর দিয়েছেন এবং তা শিল্পে রূপান্তরিত করেছেন।

আজও যখন ‘তুমি এসেছিলে পরশু, কাল কেন আসোনি? তুমি কি আমায় বন্ধু, কাল ভালোবাসোনি?’ গানটি বাজে, তখন শ্রোতার মন ভরে ওঠে এক অজানা আবেগে। কয়জন গানটির গীতিকার বা সুরকারের নামটি জানে? তিনি আর কেউ নন, বাংলার শচীন দেববর্মণ। ছোট করে সবাই বলে এসডি বর্মণ।
২০০৭ সালে প্রকাশিত শচীন দেব বর্মন স্মরণে ১৫ রূপি মূল্যের ডাকটিকিট
অনেক বাঙালিই হয়তো জানে না, এসডি বর্মণ এই বাংলাদেশেরই সন্তান। শচীনকর্তা জীবদ্দশায় বাংলাদেশকে না ভুললেও আমরা অনেকেই তাঁর ‘বাংলাদেশের সন্তান’ পরিচয় ভুলে গেছি। গত ৩১ অক্টোবর ছিল শচীন দেববর্মণের প্রয়াণ দিবস। তাঁর গৌরবোজ্জ্বল স্মৃতির প্রতি জানাই পরম শ্রদ্ধা। তিনি অমর হয়ে থাকবেন তাঁর সুরে, তাঁর গানে আর বাংলার মানুষের হৃদয়ে, যুগ যুগ ধরে।

‘আমি সব ভুলে যাই, তাও ভুলি না বাংলা মায়ের কোল...’ শচীনকর্তা কখনোই বাংলাকে ভোলেননি। আমরা কি তাঁকে ভুলতে বসেছি?

    আগামীর সময় ইপেপার
    শেয়ার করুন:
    শ্রমিক দল নেতার বাড়িতে ককটেল বিস্ফোরণ, ১৭ জনের নামে মামলা

    শ্রমিক দল নেতার বাড়িতে ককটেল বিস্ফোরণ, ১৭ জনের নামে মামলা

    চট্টগ্রাম দক্ষিণের আহ্বায়ক কমিটিকে ‘লালকার্ড দেখাচ্ছেন’ বিএনপির এমপিরা

    চট্টগ্রাম দক্ষিণের আহ্বায়ক কমিটিকে ‘লালকার্ড দেখাচ্ছেন’ বিএনপির এমপিরা

    এমপি নজরুলের সঙ্গে মরিয়মের পরিবারের আপস!

    এমপি নজরুলের সঙ্গে মরিয়মের পরিবারের আপস!

    নারীদের সঙ্গে ‘অবাধ বিচরণ’-চুরির অভিযোগে আম্মারকে অব্যাহতি দেয় শিবির

    নারীদের সঙ্গে ‘অবাধ বিচরণ’-চুরির অভিযোগে আম্মারকে অব্যাহতি দেয় শিবির

    শেখ মুজিব হলের নামফলক থেকে মুছে যাচ্ছে ওসমান হাদির নাম

    শেখ মুজিব হলের নামফলক থেকে মুছে যাচ্ছে ওসমান হাদির নাম

    চাকরিতে পুলিশ ভেরিফিকেশনের বিধি মানে না কোনো সরকারই

    চাকরিতে পুলিশ ভেরিফিকেশনের বিধি মানে না কোনো সরকারই

    পাবিপ্রবিতে খাতা মূল্যায়নে ‘কোডিং সিস্টেম’ চালু

    পাবিপ্রবিতে খাতা মূল্যায়নে ‘কোডিং সিস্টেম’ চালু

    শাবিপ্রবিতে ৬ পদের বিপরীতে ৬ গুণ শিক্ষক নিয়োগ

    শাবিপ্রবিতে ৬ পদের বিপরীতে ৬ গুণ শিক্ষক নিয়োগ

    ফ্লাইটে ‘লালসালু’ ও ‘চিত্রা নদীর পারে’ দেখানো বন্ধ, যা বলছে বিমান

    ফ্লাইটে ‘লালসালু’ ও ‘চিত্রা নদীর পারে’ দেখানো বন্ধ, যা বলছে বিমান

    ক্ষুব্ধ প্রধানমন্ত্রী, এমপি মিষ্টিকে পদত্যাগের নির্দেশ

    ক্ষুব্ধ প্রধানমন্ত্রী, এমপি মিষ্টিকে পদত্যাগের নির্দেশ

    মৃত্যুদণ্ড কার্যকরে দুই দফা ইনজেকশন, তবুও বেঁচে রইলেন নারী

    মৃত্যুদণ্ড কার্যকরে দুই দফা ইনজেকশন, তবুও বেঁচে রইলেন নারী

    পদত্যাগের নির্দেশ পেয়ে এমপি মিষ্টি স্পিকারের দপ্তরে

    পদত্যাগের নির্দেশ পেয়ে এমপি মিষ্টি স্পিকারের দপ্তরে

    শ্রীমঙ্গলে কিশোরীকে অপহরণের পর ধর্ষণের অভিযোগ, গ্রেপ্তার ৩

    শ্রীমঙ্গলে কিশোরীকে অপহরণের পর ধর্ষণের অভিযোগ, গ্রেপ্তার ৩

    অকালে ঝরে যাওয়া এক সুরেলা স্বপ্ন

    অকালে ঝরে যাওয়া এক সুরেলা স্বপ্ন

    ঠাঁই নাই ঠাঁই নাই চট্টগ্রামের ১২ কারাগারে

    ঠাঁই নাই ঠাঁই নাই চট্টগ্রামের ১২ কারাগারে