কেন ‘টোটাল ইক্লিপস অফ দ্য হার্ট’ ইতিহাসের সবচেয়ে নাটকীয় পপ গান

বনি টাইলার
পপ ও রক মিউজিকের ইতিহাসের একটি সোনালি অধ্যায়ের অবসান ঘটল। ৭৫ বছর বয়সে ওপারে পাড়ি জমিয়েছেন কর্কশ অথচ তীব্র জাদুকরী কণ্ঠের ওয়েলশ গায়িকা বনি টাইলার। তার মৃত্যুর পর বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি ভক্তের মনে বেজে উঠছে সেই চিরচেনা সুর—‘টার্ন অ্যারাউন্ড, ব্রাইট আইজ’।
১৯৮৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে মুক্তি পাওয়া তার আইকনিক মাস্টারপিস ‘টোটাল ইক্লিপস অফ দ্য হার্ট’ কেবল একটি গান ছিল না; এটি ছিল পপ ও রক মিউজিকের ব্যাকরণ ওলটপালট করে দেওয়া এক সুরের সুনামি।
বনি টাইলারের প্রয়াণে বিশ্বসংগীত মূল্যায়ন করছে, কেন এই গানটি আজ ৪ দশকেরও বেশি সময় ধরে সর্বকালের সবচেয়ে ড্রামাটিক ও মহাকাব্যিক পপ গান হিসেবে অমর হয়ে আছে।
১৯৮২ সালের এক গ্রীষ্মের দিনে নিউ ইয়র্কের একটি স্টুডিওতে গানটির ব্যাক-আপ ভোল্টেজ মিক্স শুনে সুরকার জিম স্টেইনম্যানের বন্ধু ররি ডড চমকে উঠে চিৎকার করে বলেছিলেন, ‘হায় ঈশ্বর! মিক্সে তো সবকিছুই দিয়ে দিলে, রান্নাঘরের বেসিনটা দেওয়া কি বাকি আছে?’ সত্যিই তাই, গানটির মিউজিক অ্যারেঞ্জমেন্ট ছিল এতটাই ভারী, পম্পাস এবং রাজকীয়।
মুক্তির পরপরই ১৯৮৩ সালের মার্চে গানটি যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের চার্টের শীর্ষস্থান ছিনিয়ে নেয়। সে সময় বিশ্ব কাঁপানো মাইকেল জ্যাকসনের ‘বিলি জিন’-কে হটিয়ে এক নম্বরে বসেছিল বনি টাইলারের এই গথিক অপেরা!
অথচ এর আগে বনির ক্যারিয়ার প্রায় থমকে গিয়েছিল। সবাই ভেবেছিল বনি টাইলার হয়তো হারিয়ে গেছেন, কিন্তু জিম স্টেইনম্যানের সাথে তার যুগলবন্দী ইতিহাস বদলে দেয়।
সংগীতের ভাষায় ৮০-এর দশকের ধীরগতির, গিটার রিফ আর ড্রামের তাণ্ডবে ভরা আবেগী গানগুলোকে ‘পাওয়ার ব্যালাড’ বলা হতো। জার্নি, ফরেনার কিংবা হার্ট ব্যান্ডের গানগুলো এই তালিকায় থাকত।
কিন্তু সংগীত বিশেষজ্ঞদের মতে, ‘টোটাল ইক্লিপস অব দ্য হার্ট’-কে শুধু পাওয়ার ব্যালাড বললে ভুল হবে। কারণ এর গভীরতা, এর আকস্মিক সুরের মোড় এবং সাত মিনিটের দীর্ঘ মহাকাব্যিক ক্যানভাস এই ক্যাটাগরির চেয়ে অনেক বড়।
বিশ্বখ্যাত রক সমালোচকদের মতে, ‘পাওয়ার ব্যালাড’ শব্দটির নিজেরই এত শক্তি নেই যা বনির এই গানটিকে পুরোপুরি ব্যাখ্যা করতে পারে!
গানটির ভেতরে লুকিয়ে ছিল জার্মান সুরকার রিচার্ড ওয়াগনারের অপেরা স্টাইল এবং ফিল স্পেক্টরের সিম্ফোনিক প্রতিধ্বনির মিশ্রণ। গানটি রেকর্ড করার সময় স্টুডিওর প্রতিধ্বনিযুক্ত সিঁড়ি ব্যবহার করা হয়েছিল যাতে শ্রোতাদের মনে হয় তারা কোনো তুষারঝড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছেন!
এই গানের লিরিক্সের মধ্যে জিম স্টেইনম্যান এক অদ্ভুত জাদু লুকিয়ে রেখেছিলেন। আজ ২০২৬ সালের এই আধুনিক যুগেও, যখনই পৃথিবীর কোথাও সূর্যগ্রহণ হয়, অমনি ইউটিউব এবং স্পটিফাইতে বনি টাইলারের এই গানের ভিউ ও স্ট্রিম কোটি কোটি গুণ বেড়ে যায়!
প্রকৃতির মহাজাগতিক ঘটনার সাথে গানের এই অদ্ভুত সংযোগ সত্যিই বিরল। এছাড়া গানটির রহস্যময় ও অদ্ভুত মিউজিক ভিডিও, যেখানে গথিক বোর্ডিং স্কুল, নিনজা আর শূন্যে ভাসমান গায়কদের দেখা যেত, তাও গানটিকে অমর করতে সাহায্য করেছে।
বনি টাইলার আজ আমাদের মাঝে নেই, ২০২১ সালে চলে গেছেন এই গানের স্রষ্টা জিম স্টেইনম্যানও। কিন্তু তাদের তৈরি সেই ‘বিউটি অ্যান্ড দ্য বিস্ট’ ফর্মুলার তীব্র কর্কশ কণ্ঠ আর মেলোড্রামার মেলবন্ধন লেডি গাগা থেকে শুরু করে অলিভিয়া রদ্রিগোর মতো আজকের প্রজন্মের তারকাদেরও অনুপ্রাণিত করে চলেছে।
বনি টাইলারের প্রয়াণে বিশ্বজুড়ে থাকা সমস্ত অল্টারনেটিভ মিউজিকপ্রেমীরা আজ নতজানু হয়ে স্যালুট জানাচ্ছেন এই ‘ইনএসকেপেবলি এপিক’ বা অনিবার্য মহাকাব্যের রানিকে!





