১৩ বছরেই সংগীতজগতে পা রাখেন সাবিনা ইয়াসমিন, প্রথম সম্মানি ছিল ৫০০ টাকা

সাবিনা ইয়াসমিন। ছবি: সংগৃহীত
সাত বছর বয়সের এক ছোট্ট মেয়ে যখন প্রথমবার মঞ্চে দাঁড়িয়ে গান গেয়েছিল, কিংবা রেডিওর ‘খেলাঘর’ অনুষ্ঠানে সুরের মূর্ছনা ছড়িয়ে দিত, তখনই হয়তো বাংলা সংগীতজগৎ পেয়েছিল তার ভবিষ্যতের এক একচ্ছত্র সম্রাজ্ঞীকে। শৈশব থেকেই সুরের দীক্ষায় বেড়ে ওঠা সেই ছোট্ট মেয়েটিই আজকের কিংবদন্তি কণ্ঠশিল্পী সাবিনা ইয়াসমিন।
আজ সাবিনা ইয়াসমিনের জন্মদিন। ১৯৫৪ সালে আজকের দিনে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। বয়স সত্তরের কোঠা পেরোলেও বাংলা গানের জগতে তার সুরের দীপ্তি আজও সমান উজ্জ্বল। তার কণ্ঠের জাদুতে প্রজন্মের পর প্রজন্ম মেতে উঠেছে ভালোবাসায়, বিরহে কিংবা দেশপ্রেমে।
১৯৬২ সালে রবীন ঘোষের সুরে ‘নতুন সুর’ চলচ্চিত্রে প্রথম শিশুশিল্পী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলেও বড়দের চলচ্চিত্রে পূর্ণাঙ্গ নেপথ্য গায়িকা হিসেবে তার যাত্রা শুরু হয় ১৯৬৭ সালের ‘আগুন নিয়ে খেলা’ ছবির মাধ্যমে। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। ১৯৭২ সালে ‘অবুঝ মন’ চলচ্চিত্রের ‘শুধু গান গেয়ে পরিচয়’ গানটি গেয়ে প্রথম সারা দেশে তুমুল জনপ্রিয়তা অর্জন করেন তিনি।
তারপর শুরু হয় পুরষ্কার ও স্বীকৃতির এক অনন্য অধ্যায়। ১৯৭৬ সালে আয়োজিত ১ম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে ‘সুজন সখী’ সিনেমার ‘সব সখীরে পার করিতে’ গানের জন্য শ্রেষ্ঠ নারী কণ্ঠশিল্পী হিসেবে স্বীকৃতি পান তিনি। এরপর ১৯৭৮ সালে ‘গোলাপী এখন ট্রেনে’, ১৯৭৯ সালে ‘সুন্দরী’ এবং ১৯৮০ সালে ‘কসাই’ সিনেমায় গান গেয়ে পরপর চারবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার জিতে তিনি নিজের আধিপত্য নিশ্চিত করেন।
আশির দশকে তার কণ্ঠ থেকে বেরিয়ে আসে কালজয়ী সব গান—‘জন্ম থেকে জ্বলছি মাগো’, ‘আমি রজনীগন্ধা ফুলের মত’ কিংবা ‘চিঠি দিও প্রতিদিন’।
এই দশকেও ‘চন্দ্রনাথ’ (১৯৮৪), ‘প্রেমিক’ (১৯৮৫), ‘রাজলক্ষ্মী শ্রীকান্ত’ (১৯৮৭) ও ‘দুই জীবন’ (১৯৮৮) ছবির জন্য টানা চারটি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন তিনি।
পরবর্তীতে ‘দাঙ্গা’, ‘রাধা কৃষ্ণ’, ‘দুই দুয়ারী’, ‘দুই নয়নের আলো’, ‘দেবদাস’ এবং সর্বশেষ ২০১৮ সালে ‘পুত্র’ চলচ্চিত্রের জন্য মোট ১৪টি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার নিজের ঝুলিতে পুরে নেন এই সুরের জাদুকর। অর্জন করেছেন ৬টি বাচসাস পুরস্কারও।
তবে শুধু চলচ্চিত্রের গানই নয়; ক্লাসিক্যাল, ধ্রুপদী, লোকসঙ্গীত থেকে শুরু করে আধুনিক গানের প্রতিটি ধারায় নিজেকে সেরা হিসেবে প্রমাণ করেছেন তিনি। বিশেষ করে তার কণ্ঠে ‘জন্ম আমার ধন্য হলো মা গো’, ‘সব ক’টা জানালা খুলে দাও না’, ‘ও আমার বাংলা মা’, ‘মাঝি নাও ছাড়িয়া দে’, ‘সুন্দর সুবর্ণ’ এবং ‘একটি বাংলাদেশ তুমি জাগ্রত জনতার’ এই গানগুলো প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ে দেশপ্রেমের অমর শিখা জ্বালিয়ে রেখেছে।
সংগীতে অতুলনীয় অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ সরকার তাকে ১৯৮৪ সালে ‘একুশে পদক’ এবং ১৯৯৬ সালে দেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা ‘স্বাধীনতা পুরস্কার’-এ ভূষিত করে।
জীবনের প্রতিটি পরদে সংগীতকে আঁকড়ে রাখা এই গুণী শিল্পী দেশের গণ্ডি পেরিয়ে সুরের জাদুতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বেশ সমাদৃত সাবিনা ইয়াসমিন। গান গাওয়ার সুবাদে তিনি পাড়ি জমিয়েছেন পৃথিবীর নানা প্রান্তে। শ্রোতাদের মন জয় করতে তিনি কণ্ঠ দিয়েছেন বিভিন্ন ভাষার গানেও।
কেবল গানেই নয়, অভিনয়ের আঙিনাতেও দেখা গেছে তার পদচারণা। স্বনামধন্য গীতিকার ও চলচ্চিত্র নির্মাতা গাজী মাজহারুল আনোয়ারের ‘উল্কা’ নামের একটি চলচ্চিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে ক্যামেরার সামনে নিজেকে উপস্থাপন করেছিলেন এই কিংবদন্তি শিল্পী।
ছোট্ট সেই খেলাঘরের বালিকা থেকে আজকের সুরের সম্রাজ্ঞী—সাবিনা ইয়াসমিনের এই পথচলা কেবল একজন শিল্পীর গল্প নয়, বরং বাংলা গানের এক সোনালী ইতিহাসের মহাকাব্য।







