হাসির মানুষ হারাল কোথায়

দিলদার, হাসমত, টেলি সামাদ, মনিরা মিঠু, ফারুক আহমেদ ও রবিউলের মতো অভিনয়শিল্পীরা চলচ্চিত্র দর্শকের মনে হাসির খোরাক জুগিয়েছেন
বাংলাদেশি চলচ্চিত্রের ইতিহাসের শুরু থেকেই বিশেষ অভিনেতারা জোগাতেন হাসির খোরাক। কমেডিয়ান হিসেবেই নামডাক ছিল তাদের। ধীরে ধীরে এমন অভিনেতাদের উপস্থিতি ম্লান হয়ে যাচ্ছে। লিখেছেন স্বর্ণা রায়
একসময় কৌতুক ছিল বাংলাদেশি চলচ্চিত্রের স্বাভাবিক অংশ। সেটি আলাদা কোনো ‘কমেডি দৃশ্য’ হিসেবে হাজির হতো না। গল্পের মধ্যেই থাকত পরিবার, বন্ধু, ভাই-বোন, প্রতিবেশী কিংবা আড্ডার মানুষ হিসেবে। সেই সম্পর্কের টানাপড়েন, ভুল বোঝাবুঝি কিংবা দৈনন্দিন জীবনের ছোট ছোট ঘটনায় তৈরি হতো হাসির মুহূর্ত। একজন কৌতুক অভিনেতা তাই শুধু দর্শককে হাসানোর দায়িত্ব নিতেন না; কাহিনির ভারসাম্যও অনেক সময় তারই কাঁধে থাকত।
এই ধারার অন্যতম বড় নাম দিলদার। দীর্ঘ অভিনয়জীবনে পাঁচ শতাধিক চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন তিনি। ‘বেদের মেয়ে জোসনা’, ‘বিক্ষোভ’, ‘অন্তরে অন্তরে’, ‘কন্যাদান’সহ প্রচুর চলচ্চিত্রে তার অভিনীত চরিত্র দর্শকের কাছে জনপ্রিয় হয়েছে। শুধু সংলাপ নয়; শরীরী ভাষা, মুখের অভিব্যক্তি ও নিজস্ব অভিনয়ভঙ্গিই ছিল তার শক্তি। এমনকি একসময় তাকে কেন্দ্রীয় চরিত্র করে ‘আব্দুল্লাহ’ চলচ্চিত্রও নির্মিত হয়। ২০০৩ সালে ‘তুমি শুধু আমার’ চলচ্চিত্রের জন্য কৌতুক অভিনেতা হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান তিনি।
বাংলা চলচ্চিত্রের শুরুর সময় থেকেই এই ধারার সুপরিচিত দুই নাম হাবা হাসমত ও রবিউল। হাসমত ছিলেন নির্মাতাও। তবু তার নাম আসতেই কমেডি চরিত্রে অভিনয়গুলো মনে পড়ে যায়। সাদাকালো থেকে রঙিন, চলচ্চিত্রের বিবর্তনে ‘নীল আকাশের নিচে’, ‘অবুঝ মন’, ‘রংবাজ’, ‘আলোর মিছিল’সহ শতাধিক চলচ্চিত্রে তার অভিনয় দর্শককে হাস্যরস দেওয়ার পাশাপাশি মুগ্ধও করেছে। অন্যদিকে, সহজ-সরল হাসির মানুষের ভূমিকায় রবিউলও অভিনয় করেছেন শতাধিক চলচ্চিত্রে। যার মধ্যে ষাটের দশকের ‘আকাশ আর মাটি’ থেকে শুরু করে সত্তর ও আশির দশকের ‘গুন্ডা’ ও ‘ছুটির ঘণ্টা’ও রয়েছে।
এই সময়ের আরেক পরিচিত নাম সাইফুদ্দিন। ‘মুখ ও মুখোশ’ দিয়ে চলচ্চিত্রে যাত্রা শুরু করা এই অভিনেতা কখনো পরিবারের সদস্য, কখনো বন্ধু, কখনো সাধারণ কোনো মানুষের চরিত্রে অভিনয় করেছেন। তার অভিনয়ের বিশেষত্ব ছিল স্বাভাবিকতা। আলাদা করে হাসানোর চেষ্টা না করেও চরিত্রের আচরণ ও সংলাপ থেকেই তৈরি হতো হাসির আবহ।
একজন কৌতুক অভিনেতা শুধু দর্শককে হাসানোর দায়িত্ব নিতেন না কাহিনির ভারসাম্যও অনেক সময় তারই কাঁধে থাকত
আর টেলি সামাদের সেই চেনা হাসি! ‘পায়ে চলার পথ’ দিয়ে চলচ্চিত্রে পরিচিতি পাওয়া এই অভিনেতা পরে ‘ভাত দে’, ‘গোলাপী এখন ট্রেনে’, ‘অশিক্ষিত’, ‘কথা দিলাম’, ‘সখিনার যুদ্ধ’সহ প্রচুর চলচ্চিত্রে কখনো ছিলেন সরাসরি কৌতুকের কেন্দ্র, কখনো গুরুত্বপূর্ণ পার্শ্বচরিত্র। দ্রুত সংলাপ বলা, মুখভঙ্গি, শরীরী অভিনয় এবং নিজস্ব কথনভঙ্গি তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করে তুলেছিল। এমনকি তাকে কেন্দ্রীয় চরিত্রে নিয়ে ১৯৮০ সালে ‘দিলদার আলী’ চলচ্চিত্রটি নির্মাণ করেছিলেন কাজী হায়াৎ।
ফারুক আহমেদের অভিনয়ের ক্ষেত্রটিও ছিল কিছুটা ভিন্ন। হুমায়ূন আহমেদের নাটক ও চলচ্চিত্রের মাধ্যমে দর্শকের কাছে পরিচিত হয়ে ওঠা এই অভিনেতা চরিত্রের মধ্যে হাস্যরসের পাশাপাশি মানবিকতাও নিয়ে এসেছেন। ‘চন্দ্রকথা’, ‘শ্যামল ছায়া’সহ বিভিন্ন চলচ্চিত্রে সাধারণ মানুষ, পরিবারের সদস্য কিংবা অদ্ভুত স্বভাবের চরিত্রে তার উপস্থিতি কাহিনিকে দিয়েছে আলাদা মাত্রা। তার অভিনয়ে কৌতুক শুধু হাসানোর জন্য আসেনি; চরিত্রের নিজস্ব জীবন থেকেই তা তৈরি হয়েছে।
একইভাবে মনিরা মিঠুর মতো অভিনয়শিল্পীরাও বাংলা নাটক ও চলচ্চিত্রে পার্শ্বচরিত্রকে প্রাণবন্ত করেছেন। মা, ভাবি, পরিবারের সদস্য কিংবা সমাজের পরিচিত নানা চরিত্রে তার অভিনয়ে হাস্যরসের সঙ্গে মিশেছে জীবনঘনিষ্ঠতা। বিশেষ করে হুমায়ূন আহমেদের নির্মাণে পরিবার, আত্মীয়তা, বন্ধুত্ব ও দৈনন্দিন সম্পর্কের ভেতর যে স্বাভাবিক হাস্যরস তৈরি হতো, মনিরা মিঠুর মতো শিল্পীরা সেই আবহকে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলেছেন।
সেই চরিত্রগুলো আজ কোথায়
‘বিয়ের ফুল’, ‘রং নাম্বার’-এর মতো জনপ্রিয় চলচ্চিত্রের পরিচালক মতিন রহমান মনে করেন, এর উত্তর শুধু নির্মাতাদের সিদ্ধান্তের মধ্যে খুঁজলে পুরো বিষয়টি বোঝা যাবে না। এর সঙ্গে বদলে যাওয়া দর্শকমানসও জড়িয়ে আছে। তিনি বললেন, ‘দর্শকের মানসিক ক্রিয়ার ভেতরে হাসিটা নেই। সেজন্যই চরিত্রে হাসি আসে না, সেটি আলাদা কথা। কিন্তু মানুষ তো হাসিটাই দেখতে পছন্দ করছে না। কেননা, আমরা নিজেরাই হাসতে জানি না।’
তার মতে, চলচ্চিত্রে হাসির চরিত্র কমে যাওয়ার সঙ্গে সমাজের পরিবর্তনও যুক্ত। মানুষ যে পরিবেশে বাস করে, যে বাস্তবতার মধ্য দিয়ে যায়, তার প্রভাব বিনোদনের পছন্দেও পড়ে। দর্শকের জীবনে যখন হাসি-আনন্দের স্বাভাবিক জায়গা সংকুচিত হয়, তখন চলচ্চিত্রেও এর প্রতিফলন দেখা যায়।
আমাদের দেশে সাংস্কৃতিক অবক্ষয় এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণেও চলচ্চিত্রে বহুমুখী চরিত্রের অভাব তৈরি হয়েছে
মতিন রহমানের মতে, বদলে যাওয়া গল্পের কাঠামোও এর বড় কারণ। তিনি বললেন, ‘পরিবার না থাকলে হাসি হয় না, বন্ধু না থাকলে হাসি হয় না। আড্ডা না থাকলে হাসি হয় না।’ একসময় বাংলা চলচ্চিত্রের কাহিনিতে পরিবার ছিল গুরুত্বপূর্ণ। মা থাকতেন, বড় ভাবি থাকতেন, ভাই-বোন থাকতেন, বন্ধুরা থাকতেন। এসব সম্পর্কের মধ্যেই তৈরি হতো নানা পরিস্থিতি। আর সেই পরিস্থিতি থেকেই জন্ম নিত কৌতুক। এখন অনেক চলচ্চিত্রের কাহিনিই কেন্দ্রীয় চরিত্রনির্ভর। নায়কই কাহিনির শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সবকিছুর কেন্দ্র হয়ে উঠছেন। ফলে সেই কাহিনিতে আলাদা একজন কৌতুক চরিত্রের জন্য প্রয়োজনীয় জায়গাই তৈরি হচ্ছে না।
মতিন রহমান মনে করেন, এখানে অভিনেতার সংকটের চেয়েও বড় হয়ে উঠছে চরিত্রের সংকট। তার ভাষ্য, ‘বাংলাদেশে অভিনয়শিল্পীর অভাব নেই। অনেক শিল্পীই ভালো কাজ করছেন। কিন্তু গল্পে তাদের জন্য জায়গা তৈরি হচ্ছে না। আগে একজন কৌতুক অভিনেতা হয়তো পিয়নের চরিত্র করতেন; কখনো চাকর, কখনো বড় ভাই, কখনো বন্ধুর ভূমিকায় থাকতেন। চরিত্রটি হয়তো গল্পের কেন্দ্রীয় ছিল না, কিন্তু গল্পের আবহ তৈরিতে তার ভূমিকা ছিল।’
অন্যদিকে অভিনেতা ফারুক আহমেদ মনে করেন, ‘শুধু হাস্যরস অভিনেতা নয়, এখনকার চলচ্চিত্র জুড়ে সব ধরনের চরিত্রেরই দ্বৈততা তৈরি হয়েছে। এ ছাড়া আমাদের দেশে সাংস্কৃতিক অবক্ষয় এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণেও চলচ্চিত্রে বহুমুখী চরিত্রের অভাব তৈরি হয়েছে। তা ছাড়া ভালো চিত্রনাট্যকারেরও অভাব রয়েছে।’



