স্প্যানিশ রূপসী বললেন
বাংলাদেশের জন্য হৃদয় উজাড় করা ভালোবাসা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
পেনেলোপি ক্রুজ। বিশ্ব চলচ্চিত্রের এক দারুণ চেনা মুখ। চলমান টরন্টো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে তার সঙ্গে কথা বলেছেন জনি হক
গাঢ় বাদামি চোখজোড়ায় যেন শান্ত দীঘির জল। কাঁধ ছুঁয়ে থাকা গাঢ় বাদামি-সোনালি খোলা চুলের নরম ঢেউ ঘিরে রেখেছে কপাল ও মুখের দুই পাশ। সাদা-হালকা ধূসর শর্ট জ্যাকেট ও স্কার্ট দারুণ মানিয়েছে। পোশাকে অলংকৃত কালো রেখার সঙ্গে মিলিয়ে পায়ে কালো স্ট্র্যাপের জুতা। হাসিতে ঠিকরে পড়ছে স্নিগ্ধ সৌন্দর্য। কী এক অসামান্য রূপবতী পেনেলোপি ক্রুজ! একেই বুঝি বলে আধুনিক ইউরোপীয় আভিজাত্য। দেখে কে বলবে তার বয়স ৫২ বছর!
রবিবার (১৩ সেপ্টেম্বর) দুপুরে টরন্টোর শাংরি-লা হোটেলে পেনেলোপি ক্রুজের দেখা পেলাম। ৫১তম টরন্টো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে (টিআইএফএফ) রয়েছে তার অভিনীত দুটি চলচ্চিত্র— গালা প্রেজেন্টেশন বিভাগে ‘বাঙ্কার’ এবং স্পেশাল প্রেজেন্টেশন বিভাগে ‘লা বোলা নেগ্রা’। এর মধ্যে ৭৯তম কান চলচ্চিত্র উৎসবে সেরা পরিচালকের পুরস্কার পাওয়া হাভিয়ের আমব্রোসি ও হাভিয়ের কালভোর ‘লা বোলা নেগ্রা’ নিয়ে আয়োজিত বিশেষ সংবাদ সম্মেলনে অংশ নিয়েছেন তিনি। গোল্ডেন গ্লোব অ্যাওয়ার্ডসের আন্তর্জাতিক ভোটার হিসেবে এর সাক্ষী হওয়ার নিমন্ত্রণ পেলাম আমি। বসেছিলাম মঞ্চের সামনে, দ্বিতীয় সারির শুরুতে। পেনেলোপির দ্যুতি উপভোগের পাশাপাশি তাকে প্রশ্ন করার সুযোগ খুঁজছিলাম। সংবাদ সম্মেলন শেষে তিনি কক্ষ থেকে বেরিয়ে যেতেই পিছু নিয়ে বলে ফেললাম, ‘আমার একটা প্রশ্ন ছিল!’ পেনেলোপি একটু থামলেন। বোধ হয় পুরোটা বুঝলেন না। তার এজেন্টের কাছে জানতে চাইলেন, ‘তিনি কি কোনো প্রশ্ন করতে চেয়েছেন?’ এজেন্ট আমার দিকে তাকাতেই বললাম, ‘ঠিক তাই।’ পেনেলোপি তখন সুযোগটা দিলেন। তাকে বললাম, ‘আমি বাংলাদেশ থেকে এসেছি। বাংলাদেশে আপনার অনেক ভক্ত। তাদের জন্য কিছু বলবেন?’ ভক্তদের খবর জেনে একগাল হেসে দুই হাত বুকে নিয়ে পেনেলোপি দুটি বাক্য বললেন, ‘আমি তাহলে ভাগ্যবতী! বাংলাদেশের সিনেমাভক্তদের জন্য আমার হৃদয় উজাড় করা ভালোবাসা জানাই।’
পেনেলোপি ক্রুজকে কান উৎসবে একাধিকবার সামনাসামনি দেখেছি। তবে কখনো প্রশ্ন করা হয়নি। টরন্টোতে সেই সুযোগ মিলে গেল। আসরে টিআইএফএফ স্পেশাল ট্রিবিউট অ্যাওয়ার্ড পেয়েছেন অস্কারজয়ী এই স্প্যানিশ অভিনেত্রী। উৎসবে তার দুটি চলচ্চিত্র নিয়েই দর্শকের মধ্যে ব্যাপক কৌতূহল। ‘লা বোলা নেগ্রা’র ইংরেজি নাম ‘দ্য ব্ল্যাক বল’। নামটি এসেছে সামাজিক বর্জনের এক প্রতীকী রীতি থেকে, যেখানে গ্রানাডার একটি ক্লাবে এক তরুণ সমকামী পুরুষের সদস্যপদ বাতিল করতে ভোটের বাক্সে কালো বল ফেলা হয়। এ সিনেমায় একটি অতিথি চরিত্রে অভিনয় করেছেন পেনেলোপি ক্রুজ। স্পেনের ৮৫ বছরের ইতিহাস জুড়ে বিস্তৃত এই চলচ্চিত্রে তিনটি ভিন্ন সময়ের (১৯৩২, ১৯৩৭ ও ২০১৭) তিন সমকামী পুরুষের জীবনকাহিনি তুলে ধরা হয়েছে। চলচ্চিত্রটি নির্মাণে স্প্যানিশ কবি-নাট্যকার ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকার অসমাপ্ত উপন্যাসের চারটি পৃষ্ঠা থেকে অনুপ্রেরণা পেয়েছেন ‘লোস-হাভিস’ নামে পরিচিত স্পেনের পরিচালক জুটি।
‘লা বোলা নেগ্রা’য় অতিথি চরিত্রে অভিনয় প্রসঙ্গে সংবাদ সম্মেলনে সঞ্চালকের এক প্রশ্নের জবাবে পেনেলোপি ক্রুজ বললেন, “পর্দা উপস্থিতি কত মিনিটের, সেটির ভিত্তিতে আমি কখনো চরিত্র নির্বাচন করি না। এ সিনেমার গল্পটি পড়ে নেনে রোমেরো চরিত্রটির প্রেমে পড়ে গেলাম। এই চরিত্র আমাকে আবার নাচ ও গান করার সুযোগ দিয়েছে। নাচ ও গান— দুটোই আমার কাছে সবসময় বড় চ্যালেঞ্জ। এর আগে ‘নাইন’ সিনেমাতে এমন সুযোগ পেয়েছিলাম, অনেক বছর আগে। আমি সবসময় এ ধরনের কাজ খুঁজি, কিন্তু পাওয়া খুব কঠিন। এ জন্য কয়েক মাস ধরে প্রস্তুতি নিতে হয়েছে। যদিও শেষ পর্যন্ত শুটিং করেছি মাত্র কয়েক সপ্তাহ। কিন্তু প্রস্তুতির সেই মাসগুলো ভীষণ উপভোগ করেছি। কারণ, এতে আবার ফিরে গিয়েছিলাম সেই সময়ে, যখন আমি ছিলাম নাচের ছাত্রী।”
কী এক অসামান্য রূপবতী পেনেলোপি ক্রুজ! একেই বুঝি বলে আধুনিক ইউরোপীয় আভিজাত্য। দেখে কে বলবে তার বয়স ৫২ বছর
‘বাঙ্কার’ সিনেমায় হাভিয়ের বারদেমের সঙ্গে অভিনয় করেছেন পেনেলোপি ক্রুজ। বাস্তবে তারা স্বামী-স্ত্রী। এ চলচ্চিত্রের একটি দৃশ্যে পেনেলোপি গ্যালারিতে দাঁড়িয়ে চিত্রকর্ম দেখছেন। একসময় ছবিটি তার সঙ্গে কথা বলতে শুরু করে। চলতি বছর পেনেলোপি ক্রুজের আরও দুটি সিনেমা মুক্তি পেয়েছে— ‘দ্য ব্রাইড’ ও ‘দি ইনভাইট’। এক সাংবাদিক বলে ফেললেন, ‘ক্যারিয়ারের এই পর্যায়ে এসে মনে হচ্ছে, ২০ বছর আগের তুলনায় আপনি যেন আরও ব্যস্ত; তাই না?’ পেনেলোপি বললেন, ‘সন্তান হওয়ার পর বছরে কয়টি কাজ করব, সেই ভাবনা পুরোপুরি বদলে ফেলেছি। এর আগে বছরে তিনটি, কখনো চারটি সিনেমাও করতাম। কিন্তু মা হওয়ার পর বুঝেছিলাম, সন্তানরাই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার। তাই কয়েক বছর ধরে বছরে সাধারণত একটি করে সিনেমা করেছি। কখনো অবশ্য দুটি করেছি, যদি সেগুলোর শুটিং খুব দীর্ঘ না হয়, লোকেশন নিয়ে সমস্যা না থাকে। আমি নিজেই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। এভাবেই আমার সন্তানদের বড় করতে চেয়েছি। গত কয়েক বছর এভাবে কাজ করার কারণেই এখন একই সময়ে আমার তিন-চারটি সিনেমা মুক্তি পাচ্ছে। এটাও সত্যি, এত বছর কাজ করার পর এমন একটা জায়গায় পৌঁছেছি, যার ফলে এখন কাজ বেছে নেওয়ার সুযোগ পাই। সবচেয়ে বেশি ভালো লাগে ভেবে, আমার বয়সী নারীদের জন্য এখন আগের চেয়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র লেখা হচ্ছে। আমি যখন ক্যারিয়ার শুরু করেছিলাম, তখন বিষয়টি এত স্বাভাবিক ছিল না। ধীরে ধীরে অনেক কিছু বদলেছে। সবকিছু অবশ্যই বদলায়নি, তবে পরিবর্তন চলমান। আমার ক্যারিয়ারের শুরুর সময়ের সঙ্গে আজকের পার্থক্য স্পষ্টভাবে দেখতে পাই।’
ক্যারিয়ারের শুরুতে বেশ কিছু বিখ্যাত পরিচালকের সঙ্গে কাজ করেছেন পেনেলোপি ক্রুজ। তাদের মধ্যে স্প্যানিশ মাস্টার চলচ্চিত্রকার পেদ্রো আলমোদোভারের সাতটি সিনেমায় দেখা গেছে তাকে। এক সাংবাদিকের প্রশ্নে উঠে এলো এ প্রসঙ্গ। পেদ্রোর সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতা কি চরিত্র নির্মাণের ক্ষেত্রে অন্যভাবে ভাবতে শিখিয়েছে— এমন প্রশ্নে পেনেলোপির উত্তর, “আমার ক্যারিয়ারে ভালো কিছু হলেই পেদ্রোর কথা মনে পড়েছে। এখনো কোনো পুরস্কার পেলে সবার আগে তার কথাই মনে পড়বে। ছোটবেলায় শুধু তার সিনেমা দেখেই মুগ্ধ হতাম না; তিনি কী বলছেন, সেটিও আমাকে ভীষণ অনুপ্রাণিত করত। আমি তখন হয়তো ১২ বছরের। ভাবতাম, তিনি আমাদের দেশের প্রেসিডেন্ট নন কেন! তিনি এতটাই অনুপ্রেরণাদায়ক কথা বলতেন। আজও তিনি আমার জীবনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মানুষ। শুধু ক্যারিয়ারের নয়, জীবনেরও। একইভাবে বিগাস লুনা ও ফার্নান্দো ট্রুবার কথাও মনে পড়ে। তাদের সিনেমায় খুব গুরুত্বপূর্ণ কিছু চরিত্র পেয়েছিলাম। ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই চরিত্র বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে নিজেকে ভাগ্যবতী বলব। কিন্তু একটা সময় বুঝলাম, মাঝেমধ্যে আমাকে ‘না’ বলতে হবে। আমার স্প্যানিশ এজেন্ট ক্যাটরিনা ভ্যালোনাসের সঙ্গে এ নিয়ে অনেক তর্ক হয়েছে। তিনি এখনো আমার এজেন্ট। তার বয়স ৮৩ বছর, কিন্তু এখনো দুর্দান্ত! তিনি যেন এক অদম্য শক্তি। তিনি আমাকে শিখিয়েছিলেন, কখনো কখনো নিজের সিদ্ধান্তে ‘না’ বলতে হয়। আমার মা-বাবাও আমাকে একই শিক্ষা দিয়েছিলেন। তারা আমাকে খুব অল্প বয়সে কাজ করার অনুমতি দিয়ে বলেছিলেন, ‘তাড়াহুড়ো করো না। প্রতিটি সিদ্ধান্ত ভেবেচিন্তে নাও।’ এটি খুব অল্প বয়সেই শেখা একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা ছিল। ইন্ডাস্ট্রির অনেক মানুষ, এমনকি বন্ধুরাও আমাকে বলত, ‘তুমি পাগল! এভাবে না বলা তো অভদ্রতা।’ কিন্তু আমার ভেতরের একটা কণ্ঠ বলত, ‘পরিবারের কথা শোনো। যারা অভিজ্ঞ এবং যারা সত্যিই তোমার ভালো চায়, তাদের কথা শোনো।’ এরপর আরও অনেক ভালো কিছু ঘটেছে।”
স্প্যানিশ চলচ্চিত্রের সবচেয়ে বড় বিজ্ঞাপন পেনেলোপি ক্রুজ। নব্বই দশকের শেষ ভাগে উগান্ডা ও ভারতে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে মাদার তেরেসার সঙ্গে এক সপ্তাহ কাজ করেছিলেন তিনি। তখন ‘দ্য হাই-লো কান্ট্রি’ (১৯৯৯) সিনেমায় অভিনয় করে পাওয়া সম্মানী মাদার তেরেসার হাতে তুলে দিয়েছিলেন। ২০০১ সালে ‘ভ্যানিলা স্কাই’ দেখে তার প্রেমে পড়েননি— এমন চলচ্চিত্রানুরাগী আছে নাকি! তার প্রতি বিশ্ববাসীর মুগ্ধতা তো সেই থেকে শুরু। ২০০৮ সালে উডি অ্যালেনের ‘ভিকি ক্রিস্টিনা বার্সেলোনা’য় প্রাণবন্ত চিত্রশিল্পী মারিয়া এলেনা চরিত্রে দারুণ অভিনয়ের সুবাদে অস্কারে সেরা পার্শ্ব-অভিনেত্রীর পুরস্কার পান তিনি। কোনো স্প্যানিশ অভিনেত্রীর অস্কার জয়ের ঘটনা সেটিই প্রথম।




