রিভিউ
সময়ের অস্বস্তিকর প্রতিচ্ছবি
- দ্যা ইউনিভার্সিটি অফ চানখাঁরপুল

দ্যা ইউনিভার্সিটি অফ চানখাঁরপুল সিনেমার দৃশ্য- আইএমডিবি
রাজনৈতিক স্যাটায়ারের ভঙ্গিতে ‘দ্যা ইউনিভার্সিটি অফ চানখাঁরপুল’-এ উপস্থাপিত হয়েছে একটি বিশ্ববিদ্যালয়, নামহীন একদল শিক্ষার্থী, রাজনৈতিক পদ পাওয়ার স্বপ্নে বিভোর কতিপয় তরুণ এবং একটি ঘোড়া। আকাশ হকের এই চলচ্চিত্র ছাত্র রাজনীতিকে শুধু একটি নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ সমস্যা হিসেবে দেখে না; বরং বিশ্ববিদ্যালয়কে একটি ক্ষুদ্র রাষ্ট্রের মতো বিবেচনা করে— যেখানে ক্ষমতা, সম্পদ, আনুগত্য, তোষামোদ এবং পরিচয়ের লড়াই একই সঙ্গে কাজ করে।
২০২৬ সালের এই চলচ্চিত্র ঢাকা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের বাংলাদেশ প্যানোরামায় ফ্রিপ্রেসি পুরস্কার অর্জন করেছে। পরবর্তী সময়ে প্রেক্ষাগৃহ ও ওটিটি প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে পৌঁছেছে দর্শকের কাছে।
এই চলচ্চিত্রের কেন্দ্রে রয়েছে একদল সম্ভাবনাময় বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী, যারা শুরুতে একসঙ্গে খায়, মিছিল করে, লড়াই করে। কিন্তু ধীরে ধীরে সেই বন্ধুত্ব রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার কাছে পরাজিত হয়। চলচ্চিত্রটির সবচেয়ে স্মরণীয় রূপক হলো ঘোড়া। প্রধান চরিত্রটি রাজনীতিতে ওপরে উঠতে চায়। কিন্তু তার নেই মোটরবাইক, যা এই জগতে দ্রুত যোগাযোগ ও সামাজিক অবস্থানের বাস্তব হাতিয়ার। অর্থের অভাবে সে হতাশ হয়, নানা অপমানজনক উপায়ে টাকা জোগাড়ের চেষ্টা করে। তারপর একদিন মোটরবাইকের বদলে ঘোড়ায় চড়ে ক্যাম্পাসে ফিরে আসে। এখানেই ‘দ্যা ইউনিভার্সিটি অফ চানখাঁরপুল’ বাস্তবতা থেকে স্যাটায়ারের দিকে লাফ দেয়। ঘোড়াটি বাস্তবিক অর্থে তাকে কোনো ক্ষমতা দেয় না; কিন্তু মানুষ তাকে ক্ষমতাবান ভাবতে শুরু করে। আর ক্ষমতার রাজনীতিতে পারসেপশনই অনেক সময় রিয়েলিটি হয়ে ওঠে। ঘোড়া তখন এমন এক রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়, যেখানে যোগ্যতার চেয়ে দৃশ্যমানতা, নীতির চেয়ে আনুগত্য এবং বাস্তব ক্ষমতার চেয়ে ক্ষমতার অভিনয় বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
দ্যা ইউনিভার্সিটি অফ চানখাঁরপুল
কাহিনি, চিত্রনাট্য, প্রযোজনা, চিত্রগ্রহণ, সম্পাদনা ও পরিচালনা: আকাশ হক
অভিনয়শিল্পী: দেবদ্যুতি আইচ, রকি খান, ববি বিশ্বাস, আখতারুজ্জামান আজাদহফম্যান, অ্যালান রিকম্যান
মুক্তি: ১২ জুন ২০২৬
এই চলচ্চিত্রের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হলো চরিত্রগুলোর কোনো নাম নেই। তারা পরিচিত হয় ‘ভাই’, ‘মামা’, ‘দোস্ত’ কিংবা তাদের রাজনৈতিক অবস্থান দিয়ে। একজন মানুষের নাম তার ব্যক্তিগত পরিচয় বহন করে। কিন্তু সেই নামের জায়গায় যখন একটি পদ, সম্পর্ক কিংবা রাজনৈতিক সম্বোধন বসে যায়, তখন ব্যক্তি ধীরে ধীরে তার নিজস্ব সত্তা হারাতে শুরু করে। ফলে চরিত্রগুলোর আচরণে অবিশ্বাস তৈরি হয়, সম্পর্কের মধ্যে ফাটল ধরে। শুরুতে বন্ধুত্ব একটি আবেগ; শেষে তা পরিণত হয় লেনদেনে। রাজনৈতিক ক্ষমতার সিঁড়িতে ওঠার জন্য যখন একে অপরকে পেছনে ফেলতে হয়, তখন বন্ধুত্ব হয়ে ওঠে একটি সাময়িক, স্বার্থকেন্দ্রিক জোট। এই রূপান্তরই সিনেমাটির ইমোশনাল কোর। কারণ রাজনৈতিক ব্যঙ্গ তখনই গভীর হয়, যখন তা শুধু ব্যবস্থাকে উপহাস করে না; বরং দেখায় সেই ব্যবস্থার ভেতরে থাকা মানুষগুলো কীভাবে নিজেদেরও বদলে ফেলে।
এই চলচ্চিত্রের অভিনয়শিল্পীদের প্রায় সবাই নতুন মুখ। এই সিদ্ধান্তে ঝুঁকি যেমন আছে, তেমনি রয়েছে বাস্তবতার সম্ভাবনাও। কারণ এই গল্পে অতিরিক্ত অভিনয় বা নাটকীয়তা সহজেই চরিত্রগুলোকে ক্যারিক্যাচারে পরিণত করতে পারত। কিন্তু নির্মাতা আকাশ হক চরিত্রগুলোকে শুধু অভিনয়গুণসম্পন্ন নয়, বিশ্বাসযোগ্য করে তোলার চেষ্টা করেছেন। বিশেষ করে ক্ষমতার সঙ্গে সঙ্গে প্রধান চরিত্রের আচরণ ও মানসিকতার যে পরিবর্তন, সেটিকে অতিনাটকীয় না করে ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠা করার ক্ষেত্রে তিনি অনেকখানি সফল।
‘দ্যা ইউনিভার্সিটি অফ চানখাঁরপুল’ ছাত্র রাজনীতির গল্প। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এটি শুধু রাজনীতির গল্প হয়ে থাকে না; বরং ক্ষমতার আকাঙ্ক্ষায় একজন তরুণের ধীরে ধীরে নিজের কাছ থেকে দূরে সরে যাওয়ার গল্পে পরিণত হয়। যে তরুণ ক্ষমতার সিঁড়িতে উঠতে চেয়েছিল, একসময় সেই ক্ষমতারই প্রতীক হয়ে ওঠে ঘোড়া। আর যখন রাতের অন্ধকারে প্রতিপক্ষের হাতে ঘোড়াটি মারা যায়, তখন শুধু একটি প্রাণীর মৃত্যু ঘটে না; ভেঙে পড়ে তার তৈরি করা ক্ষমতার পৃথিবীও। খবর পেয়ে ছুটে এসে মৃত ঘোড়াটির পাশে বসে যখন প্রটাগনিস্ট কান্নায় ভেঙে পড়ে, দৃশ্যটি তখন আর শুধু একটি প্রাণী হারানোর শোক থাকে না। তার কান্নায় যেন একসঙ্গে মিশে যায় ক্ষমতা হারানোর বেদনা, উচ্চাকাঙ্ক্ষার পতন এবং নিজের হারিয়ে যাওয়া পরিচয়ের শোক।
সিনেমাটি শেষ হয়, কিন্তু একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন রেখে যায়— যে ক্ষমতার জন্য আমরা নিজেদের এতটা বদলে ফেলি, সেই ক্ষমতাই যদি একদিন হারিয়ে যায়, তখন আমাদের কাছে আসলে কী অবশিষ্ট থাকে?




