জন্ম আর মৃত্যুর মাঝখানের সময়টাই গুরুত্বপূর্ণ
- আজ অভিনেতা চঞ্চল চৌধুরীর জন্মদিন। বিশেষ দিনটি নিয়ে ব্যক্তিগত অনুভূতি, অভিনয়, পরিবারসহ নানা বিষয়ে আলাপ করেছেন তিনি। তার সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মীর রাকিব হাসান

চঞ্চল চৌধুরী
প্রতিবছর জন্মদিন আসে। এবারের জন্মদিন কি কোনো দিক থেকে আপনার কাছে আলাদা মনে হচ্ছে?
আলাদা বলতে তেমন কিছু না। একটা করে বছর যায়, এটা তো নিয়তিরই বিধান। সময় পার হবে, জন্মদিন আসবে— এটি প্রত্যেক মানুষের জন্যই প্রযোজ্য। আমি যেভাবে থাকি ও যেভাবে কাজ করি, সেভাবেই আছি। তবে একটা নতুন বিষয় আছে, যেটি মজার ছলে বলা যায়। গত বছর যে পাঞ্জাবি আমার ছেলে পরত, এবার সেই পাঞ্জাবি আমি পরছি। আগে আমি ‘এল’ সাইজ পরতাম, আর শুদ্ধ পরত মিডিয়াম। আমি কিছুটা ওজন কমিয়েছি, তাই এবার মিডিয়াম সাইজ পরছি। আর গত এক বছরে ছেলে একটু বড় হয়েছে। এখন আমার পোশাকের আগের সাইজ তাকে মানিয়ে গেছে। এমন ছোটখাটো পরিবর্তনই হয়তো বয়সের পার্থক্য বোঝায়।
বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে কি কোনো বিশেষ উপলব্ধি আসে জীবনে?
বয়স তো মূলত বাড়ছে না, কমছে। একটা সময় পর এসে মানুষ বুঝতে পারে, সবকিছু নিয়ন্ত্রণে রাখতে হয়। খাবার-দাবার, জীবনযাপন, শরীরের যত্ন— সবকিছু। বয়স বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে এসব বিষয় আরও পরিষ্কার হয়।
জন্মদিন এলে জীবনের কোন সময়টা সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে?
আমরা ছিলাম আট ভাইবোন। এখন চিন্তা করে দেখেন, আট সন্তানের বছরে আটটা জন্মদিন আয়োজন করা আমাদের পরিবারের জন্য কতটা সম্ভব ছিল? মা-বাবার কাছে তখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল সন্তানদের প্রয়োজন মেটানো। খাওয়া-দাওয়া, পড়াশোনা, সংসার— এসবই ছিল মূল বিষয়। স্বাভাবিকভাবে মা-বাবার সংগ্রাম বিশেষ দিনে একটু বেশি মনে পড়ে। তা ছাড়া জন্ম স্বাভাবিক ঘটনা। পৃথিবীতে মানুষ জন্মগ্রহণ করবে— এটাই স্বাভাবিক। আবার একদিন মৃত্যুবরণ করবে— এটাও অবধারিত। আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ হলো, জন্ম আর মৃত্যুর মাঝখানের সময়টা। একজন মানুষ সেই সময়টাকে কীভাবে ব্যবহার করল, কী কাজ করল, কী অবদান রেখে গেল— সেসবই আসল। মানুষের জন্মের চেয়ে তার কর্ম অনেক বড়। আমি সবসময় এভাবেই বিষয়টা দেখি।
কেক কেটে জন্মদিন উদযাপনের প্রথম কোনো স্মৃতি কি মনে আছে?
ছোটবেলায় গ্রামে থাকতে এসব হতো না। জন্মদিন মানে মা হয়তো একটু পায়েস রান্না করলেন, কিছু মিষ্টি আনা হলো, বাড়িতে একটু ভালো খাবার রান্না হলো— এই পর্যন্তই হয়তো হতো। ঢাকায় আসার পর ধীরে ধীরে বন্ধুবান্ধবদের মাধ্যমে জন্মদিন পালন শুরু হয়। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে বা তারও আগে জন্মদিন নিয়ে বিশেষ কোনো ভাবনা ছিল না। পরে অভিনয় শুরু করলাম, মানুষ চিনতে থাকল, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এলো; তখন জন্মদিন উদযাপনের পরিসর আরও বড় হলো। তবে আমার অনেক জন্মদিন আয়োজন হয়েছে বৃন্দাবনদা-খুশিদের বাসায়। তাদের দুই ছেলে দিব্য ও সৌম্য বেড়ে ওঠার পর তারাই সব আয়োজন করেছে।
ইদানীং সিনেমা এবং ওটিটিতে কাজ করলে অভিনয়শিল্পীরা নাটক এড়িয়ে চলেন। কিন্তু আপনাকে এখনো নাটকে দেখা যায়...
এবারের ঈদুল আজহা উপলক্ষে ‘লাভ স্টেশন’ নামে একটি ধারাবাহিক নাটকে অভিনয় করেছি। ঈদের প্রায় এক মাস আগে এর শুটিং হয়েছে। প্রতিটি মাধ্যমের চাহিদা ও কাজের ধরন আলাদা। আমি বহু বছর টেলিভিশনের জন্য হাজার হাজার নাটক করেছি। টেলিভিশনের প্রতি এখনো আমার আলাদা একটা টান, ভালোবাসা ও মায়া আছে। যাদের সঙ্গে একসময় নিয়মিত কাজ করেছি, তাদের প্রতিও একটা আবেগ কাজ করে। এটা বহু বছরের অভ্যাস। তাই টেলিভিশনে কাজ করতে আমার কোনো সমস্যা হয় না।
নতুন কোনো ওটিটি বা সিনেমার কাজের খবর আছে?
আগামী বছরের কয়েকটি কাজ নিয়ে আলোচনা চলছে। তবে এখনো এমন কিছু হয়নি, যেটি আনুষ্ঠানিকভাবে বলা যায়। এখন বেছে বেছে কাজ করি। ছেলে বড় হচ্ছে, তাকে সময় দিতে হয়। পরিবারকে সময় দিই। মাসে হয়তো পাঁচ-দশ দিন কাজ করি। তবে ঈদের আগে ও বিশেষ সময়গুলোতে কাজের চাপ একটু বেড়ে যায়।
আপনার কোন কাজগুলো মুক্তির অপেক্ষায় আছে?
বাংলাদেশে রায়হান রাফীর ‘আন্ধার’ সিনেমার শুটিং শেষ হয়েছে কয়েক মাস আগে। এ ছাড়া কলকাতার দুটি চলচ্চিত্রে কাজ করেছি— ব্রাত্য বসুর ‘শেকড়’ ও সুমন মুখোপাধ্যায়ের ‘আজাদি’। ‘শেকড়’ সিনেমার গল্পে একজন বৃদ্ধ ও একজন বৃদ্ধা পাশাপাশি গ্রামে বসবাস করেন। যৌবনে তাদের মধ্যে সম্পর্ক ছিল, কিন্তু বিয়ে হয়নি। মূলত দুই পরিবারের গল্প উঠে এসেছে এখানে। আমি বৃদ্ধের সন্তানের চরিত্রে অভিনয় করেছি। অন্যদিকে ‘আজাদি’র গল্প ১৯৪৭ সালের দেশভাগকে কেন্দ্র করে। এতে আমি একজন পুলিশ কর্মকর্তার চরিত্রে অভিনয় করেছি। খুব মানবিক একটি গল্প এটি। চলতি বছর এই আমার অভিনীত তিনটি চলচ্চিত্র মুক্তি পাওয়ার সম্ভাবনা আছে।
পশ্চিমবঙ্গে বাংলাদেশি শিল্পীদের কাজ করা নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে। আপনি বিষয়টি কীভাবে দেখছেন?
‘বাংলাদেশ ডে প্যারেড’ নামে একটি অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে কয়েক দিন আগে আমেরিকা থেকে দেশে ফিরেছি। পুরো বিষয়টির বিস্তারিত আমার জানা নেই। তবে একটা কথা বলতে পারি— শিল্প ও শিল্পীর কোনো গণ্ডি নেই। যেকোনো ভালো গান কিংবা ভালো সিনেমা পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ উপভোগ করে। রাজনৈতিক সীমারেখা ও কাঁটাতারের বেড়া থাকতে পারে, কিন্তু শিল্পের কোনো সীমানা থাকা উচিত নয়। আমি ব্যক্তিগতভাবে এটা বিশ্বাস করি।






