ক্যানসার নিয়ে স্বপ্নের সিনেমাটি বানাতে চাই

নন্দিত অভিনেতা, লেখক ও নির্দেশক আবুল হায়াত
নন্দিত অভিনেতা, লেখক ও নির্দেশক আবুল হায়াত। প্রতিটি ক্ষেত্রেই আলো ছড়িয়েছেন সমানতালে। তার সঙ্গে কথা বলেছেন পান্থ আফজাল
আপনার বয়স ৮২ বছর পেরিয়েছে কিছুদিন আগে। জন্মদিন নিয়ে আপনার দর্শন কী?
এটা ঠিক যে, আমার বয়স হচ্ছে। তবে আরেকটা বিষয় হলো, জন্মদিন এলে সবাইকে ভাবতে হবে, ‘বিগত দিনগুলোতে তুমি কী করেছ? আর আগামী দিনগুলোতে কী করতে চাও?’ এটা কিন্তু সবার হালখাতা। আসলে আমরা কাজ করতে করতে ভুলে যাই, আমাদের দিনগুলো কীভাবে গেল। অথচ কী করার ছিল আর কী করিনি— এগুলোর সালতামামি; কিন্তু আমরা করি না। তাই জন্মদিন এলেই আমার মনে হয়, এই যে দিনগুলো চলে গেল, কী করলাম? এসব কথা শুনে অনেকেই হয়তো ভাবছেন, আমি জ্ঞানের কথা বলছি; কিন্তু না, এটাই আমার উপলব্ধি।
এখন কি নিয়মিত কাজ করতে পারছেন?
ভালো গল্প ও চরিত্র হলে কাজ করি, তাও হাতে গোনা কিছু। এখন তো আমাদের নিয়ে তেমন করে কেউ ভাবেন না। দুয়েকজন ভাবেন। পছন্দ হলে তারপর কাজ করি।
কয়েকটি নাটক তো শেষ করেছেন।
শেষ করেছি ‘সন্তান’, ‘সাড়ে তিন হাত মাটি’। এ ছাড়া অনেক নাটকে কাজ করেছি, যেগুলো আগামীতে মুক্তি পাবে। আসলে অনেক নাটকই হাতে আছে, নাম বলতে পারছি না। চলতি মাসে আরও কিছু নতুন কাজ আছে। স্ক্রিপ্ট হাতে পেলে নাম বলতে পারব।
বয়স তো হয়েছে, টানা শুটিং করলে শরীর কি মানবে?
আমি কাজ উপভোগ করি। কাজ না করলেই বরং খারাপ লাগে। আসলে শুটিংয়ে গেলে মন ভালো থাকে, শরীরও। আমি কাজের মধ্যেই আনন্দ খুঁজে পাই।
অবসর কীভাবে কাটে?
শুটিং না থাকলে বাসায় থাকি। স্ত্রীর সঙ্গে গল্প করি, কোথাও ঘুরতে যাই, টেলিভিশন দেখি। আর লেখালিখি ও বই পড়ে সময় চলে যায়। নাতি-নাতনিরা তো আছেই, তাদের সঙ্গেও গল্প করি। মেয়েরা ফোন করলে তাদের সঙ্গে কথা বলি।
এই সময়ে নাটক নিয়ে আপনার অভিমত কী?
এখন তো ভিউ আর ভাইরালের যুগ। তাই এসব চিন্তা করে এ সময়ের নির্মাতারা নাটক বানাচ্ছেন। আরেকটা বিরক্তিকর বিষয় হচ্ছে আমাদের পুরনো নাটকগুলোকে নতুনভাবে পরিবর্তন করে শিরোনাম দিয়ে, থাম্বেল দিয়ে দর্শকের সঙ্গে প্রতারণা করা হচ্ছে শুধু ভিউয়ের জন্য। নামগুলোও অদ্ভুত। মূল্যবোধের জায়গাটা কম এখন। তবে ভালো-খারাপ মিলেই তো আমাদের ইন্ডাস্ট্রি। আমার মনে হয় মূল্যবোধের জায়গা ঠিক রেখে কোনো কনটেন্ট তৈরির চেষ্টা করলে এ দেশের নাটক আরও ভালো হতে পারত।
আপনার একটা স্বপ্ন রয়েছে সিনেমা বানাবেন। গল্পও প্রস্তুত আছে, শুনেছি।
হ্যাঁ, আমি গত রাতেও ভাবছিলাম। গল্পটা হাসনাত আবদুল হাইয়ের লেখা। শিরোনাম, ‘ক্যানসার’। এই গল্প নিয়েই সিনেমাটি বানাতে চেয়েছিলাম। অনুমতিও নিয়ে রেখেছি; কিন্তু আর এগোতে পারিনি। মাঝে অসুস্থ ছিলাম। আসলে কাজটি শর্ট ফিল্ম আকারেও হতে পারে। আমার কাছে মনে হয়েছে এটা সুন্দর প্লট। গল্পটি এমন, ক্যানসার আক্রান্ত একজন নারী জীবন সম্পর্কে একেবারে হতাশ। সেই অবস্থা থেকে তিনি আবারো উজ্জীবিত হয়ে ওঠেন। তবে একসময় দেশ সম্পর্কে আশা ছেড়ে দিয়েছিলেন; কারণ তার স্বামী মারা গেছেন রাজাকারদের কারণে। যখন রাজাকাররা দেশে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে, তিনি হতাশ হয়ে পড়েন। তিনি বলছিলেন, ‘আমার কেউ নেই, কারও আমাকে লাগবে না। বেঁচে থেকে কী লাভ!’ তবে তাকে তরুণ প্রজন্ম আশ্বস্ত করে, ‘আমরা আছি দেশের জন্য। দেশকে শত্রুমুক্ত করব। আপনার পাশে আছি আমরা।’
গল্পটি আপনার জীবনের সঙ্গে মিলে গেছে?
গল্পটি পেয়েছিলাম অনেক আগে। তখন আমার ক্যানসার ধরা পড়েনি। আমার জীবনের এই মিলে যাওয়া নেহাত কাকতাল।
অভিনয়জীবনের শুরুর দিকেই ঋত্বিক ঘটকের সিনেমায় সুযোগ পেয়েছিলেন আপনি।
‘তিতাস একটি নদীর নাম’-এ অভিনয় করা, সে ছিল এক অবিস্মরণীয় ঘটনা। ভোর ৫টায় ঢাকা থেকে নিয়ে গেছে। আরিচা পর্যন্ত যেতে তখন তিনটা ফেরি ছিল। লোকেশনে পৌঁছে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বসে রইলাম। সারা দিন অপেক্ষা করলাম। আমাকে বুঝিয়ে দেওয়া হলো, ‘এই হচ্ছে তোমার সিন। ওই হচ্ছে তোমার সিন।’ এসব করতে করতে সন্ধ্যাবেলায় ঋত্বিকদা বললেন, ‘আইজক্যা তো পারুম না। কাইলক্যা অইবো তোমারটা।’ আমার তো মাথায় হাত। সরকারি চাকরি করি। ছুটি নিয়ে গেছি। এক দিনের ক্যাজুয়াল লিভ নিয়ে আরেক দিন! অনেক হাতে-পায়ে ধরে বললাম, ‘আমাকে মাফ করে দিন।’ পরে যেদিন শুটিং হবে, সেদিন আর স্ক্রিপ্ট খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। সহকারী পরিচালকের সঙ্গে ঝগড়া শেষে ঋত্বিকদা মাটিতে বসে আবার লিখতে শুরু করলেন।
হুমায়ূন আহমেদের সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?
-তাকে চিনতাম ১৯৮৪-৮৫ সাল থেকে। তখন তার লেখা একটি নাটকে প্রথম অভিনয় করেছিলাম। যতদূর মনে পড়ে, নাটকটির নাম ‘প্রথম প্রহর’। অভিনয় দেখে তার ভালো লেগেছিল বলেই যে নাটকই লিখতেন, সেখানে আমার জন্য একটি চরিত্র থাকত। সেই স্ক্রিপ্টের ওপরে লিখে দিতেন, ‘এই চরিত্র হায়াত ভাইয়ের।’ কিন্তু একসময় দেখলাম তার চারপাশে প্রচুর চাটুকার জমে গেছে। এরপর আস্তে আস্তে সরে এলাম। বিশেষ করে হুমায়ূন আহমেদ যখন নুহাশপল্লীতে গেলেন, তখন ওখানে আমার যাওয়া হয়নি। নৌকায় করে যেতে হতো। কয়েকবার আমাকে যেতে বলেছিলেন। আমি বলেছিলাম, ‘হুমায়ূন, আই অ্যাম সরি! আমি যেতে পারব না।’ তার আরেকটা সমস্যা ছিল, শিডিউল ঠিক রাখতে পারতেন না। আমি তখন দারুণ ব্যস্ত। এসব কারণে এরপর তার সঙ্গে তেমন কাজ করা হয়নি। দূরত্ব তৈরি হয়েছিল; কিন্তু আমি এখনো তার ভক্ত। তিনি একজন মেধাবী লেখক। বাংলাদেশের নাটকের ধারা তিনি পাল্টে দিয়েছিলেন। মানুষের মন বোঝার আশ্চর্য ক্ষমতা ছিল তার। লেখার মধ্যে ছিল দারুণ পরিমিতিবোধ।
আপনার লেখা নতুন বই প্রকাশ পাবে কবে?
আমি তো প্রতি বছর বইমেলায় বই প্রকাশ করি। গতবারও করেছি। আগামীতেও করব।





