মন ছুঁয়েছে দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড

‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’-এর একটি দৃশ্য - খনা টকিজ
টরন্টো শহরের কিং স্ট্রিটে অবস্থিত টিআইএফএফ লাইটবক্স। এটাই কানাডার মর্যাদাপূর্ণ টরন্টো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের মূল কেন্দ্র। এতে আছে পাঁচটি প্রেক্ষাগৃহ। এর মধ্যে লাইটবক্স সিনেমা ফোরে বাংলাদেশের সিনেমা ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’ দেখে মুগ্ধতা প্রকাশ করলেন বিভিন্ন দেশের দর্শক। বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) স্থানীয় সময় বিকাল ৪টায় ছিল এর প্রদর্শনী। রুবাইয়াত হোসেন পরিচালিত এই চলচ্চিত্রে নারীর মুক্তির গল্প জিতে নিয়েছে নানা বয়সী দর্শকের মন। তারা নির্মাণশৈলী ও কলাকুশলীদের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন।
৫১তম টরন্টো উৎসবে দেখানো হচ্ছে প্রায় ৩০০ চলচ্চিত্র। এর মধ্যে সেন্টারপিস বিভাগে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করছে ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’। সিনেমাটি দেখতে বিভিন্ন দেশের দর্শক উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। গতকাল বৃহস্পতিবার স্থানীয় সময় রাত ১০টায় লাইটবক্স ভবনে এর আরেকটি প্রদর্শনী হয়েছে। শনিবার স্কশিয়া ব্যাংক প্রেক্ষাগৃহে আবার দেখা যাবে এটি।
দর্শক প্রতিক্রিয়া
কানাডায় বেড়াতে এসে টরন্টো উৎসবের অভিজ্ঞতা নিলেন জন নামের এক আমেরিকান তরুণ। এর অংশ হিসেবে ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’ দেখে তিনি আগামীর সময়ের প্রতিনিধিকে বললেন, ‘সিনেমাটি বেশ ভৌতিক। সত্যি বলতে, ভুতুড়ে কনেদের দৃশ্যগুলো নিয়ে ভাবছি। সাধারণত ভৌতিক চলচ্চিত্রে দেখা যায়, ভূত বা কোনো অতিপ্রাকৃত সত্তা সহিংস কিছু করে। কিন্তু এখানে ভূতকে মানুষের ভেতরের ভয়, দ্বন্দ্ব বা মানসিক অবস্থার প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে অনেকটাই। আমার কাছে এটাকে হররের মাধ্যমে গল্প বলার খুবই চমৎকার ও আকর্ষণীয় একটি পন্থা মনে হয়েছে। সিনেমাটি দেখে যে বিষয় আমাকে সবচেয়ে নাড়া দিয়েছে, তা হলো— জীবনে কখনো কখনো অন্তর্দৃষ্টি বা নিজের মনের কথা অনুসরণ করা জরুরি। এমনকি যদি সংস্কৃতি কিংবা পরিবারের প্রত্যাশার বিপরীতে গিয়ে ভিন্ন কিছু করতে হয়, তবুও। কারণ যদি নিজের মনের কথা না শোনেন কিংবা নিজের ওপর আস্থা না রাখেন— তাহলে এর পরিণতি কী হতে পারে, এ সিনেমা যেন সেটাও দেখিয়েছে। আশা করি, সিনেমাটি আরও অনেকদূর যাবে এবং সাফল্য পাবে।’
কানাডিয়ান তরুণী জে বললেন, ‘গল্পের উচ্চবিত্ত মেয়েটির মুক্তি দেখে আমার খুব ভালো লেগেছে। আমার কাছে মনে হয়েছে, সে যেন একটা সোনার খাঁচায় বন্দি ছিল। এ সিনেমাকে ব্যাখ্যা করতে হলে এটাই বলব। আর শেষ দৃশ্য বেশ স্বাধীনচেতা মনে হয়েছে। তখন মেয়েটি চুল কেটে ফেলে, তারপর এমন একটি রাস্তা দিয়ে হাঁটে, যেটি দেখতে অনেকটা সাধারণ ও নিম্নবিত্ত মানুষের এলাকার মতো মনে হয়। অর্থাৎ শেষ পর্যন্ত সে নিজের বন্দিদশা থেকে সত্যিই মুক্ত হতে পারে।’
মায়া নামের এক বয়স্ক কানাডিয়ান নারীর দৃষ্টিতে, ‘আমার কাছে সিনেমাটিকে ভীষণ শক্তিশালী মনে হয়েছে। আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে নারীত্বকে যেভাবে তুলে ধরা হয়েছে, সেটা সত্যিই খুব ভালো লেগেছে। এই বিষয় আমাকে বেশ মুগ্ধ করেছে।’
আরেক কানাডিয়ান নারী সুজান স্মিথ বললেন, ‘আমার কাছে সিনেমাটিকে খুবই আকর্ষণীয় এবং অনেকটা চোখ খুলে দেওয়ার মতো মনে হয়েছে। নির্মাতা বাংলাদেশের শ্রেণিবৈষম্য নিয়েও কথা বলেছেন, যা বেশ তথ্যবহুল ছিল। বিশেষ করে সৌন্দর্য সম্পর্কে তার দৃষ্টিভঙ্গি এবং সুন্দর হতে গিয়ে নারীরা কী কী করেন— এসব বিষয় যেভাবে তিনি তুলে ধরেছেন, সেসব বেশ আকর্ষণীয়। তবে একই সঙ্গে মনে হয়েছে, তিনি হয়তো এ বিষয়কে কিছুটা ব্যঙ্গও করেছেন।’
কানাডাপ্রবাসী নির্মাতা এবং টরন্টো ফিল্ম স্কুলের অ্যালামনাই মেহেদি বললেন, ‘সিনেমাটি নারীবাদ নিয়ে কথা বলেছে। নিজের শরীর ও চেহারা নিয়ে স্বাচ্ছন্দ্যে থাকার কথাও বলে। আর আমার মনে হয়, এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কনে কিংবা বর— যার চেহারা যেমন, তা নিয়েই স্বচ্ছন্দ থাকা উচিত। গায়ের রঙ, শরীরের দাগ— এসব শরীরের নিজস্ব অংশ। তাই এগুলো মেনে নিয়ে নিজের মতো করে আনন্দে থাকতে পারেন সবাই।’
নির্মাতার অভিজ্ঞতা
২০১৯ সালে ৪৪তম টরন্টো চলচ্চিত্র উৎসবের কন্টেমপোরারি ওয়ার্ল্ড সিনেমা বিভাগে দেখানো হয় রুবাইয়াত হোসেন পরিচালিত ‘মেড ইন বাংলাদেশ’। সাত বছর পর ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’ নিয়ে এই আয়োজনে ফিরলেন তিনি। এর আগে ৮৩তম ভেনিস আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের অরিজোন্তি বিভাগে বাংলাদেশের প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য সিনেমা হিসেবে ইতিহাস গড়েছে এটি।
ভেনিস থেকে টরন্টো এসে রুবাইয়াত হোসেন আগামীর সময়কে বললেন, ‘টরন্টোতে আমাদের সিনেমার তিনটি শো। সব কটির টিকিট সোল্ড আউট। আজ প্রেক্ষাগৃহভর্তি দর্শক ছিল। প্রদর্শনী শেষে ২০-২৫ মিনিট প্রশ্নোত্তর সেশন হয়েছে। অনেক বাংলাদেশি দর্শক দেখলাম। টিআইএফএফে শত শত চলচ্চিত্র দেখানো হয়। এটা অনেকটা কনফারেন্স মানে কনভেনশনের মতো। এ উৎসবের দর্শক দারুণ। তারা সারা বছর অপেক্ষা করে। তাদের মধ্যে সাধারণ তরুণ-তরুণী থেকে শুরু করে বৃদ্ধ-বৃদ্ধারা সিনেমা দেখেন।’
সিনেমায় টিকটিকি, সাপ, কেঁচো, শামুক ব্যবহার করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে একজনের প্রশ্নের জবাবে নির্মাতা বললেন, ‘আমার চাওয়া ছিল এ ফিল্ম দেখার পর দর্শক যেন নিজের শরীরে কিছু একটা অনুভব করে। ক্লোজআপে শামুক, কেঁচো বা টিকটিকি দেখলে কিন্তু সবার ভেতরে একটা স্পন্দন ঘটে। এটা লজিক্যাল কিছু না। আবার কোনো প্রতীক হিসেবেও দেখাইনি। এটি শুধুই একধরনের অনুভূতি।’
উৎসবগুলো থেকে প্রত্যাশার কথা জানতে চাইলে রুবাইয়াত হোসেন বললেন, ‘যেকোনো ফিল্মমেকারের স্বপ্ন থাকে, তার সিনেমা প্রচুর দর্শক দেখবে। আমারও প্রত্যাশা, ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’ যাতে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে পরিবেশন করতে পারি। ভেনিস ও টরন্টোর পর ধাপে ধাপে আমরা বিএফআই লন্ডন চলচ্চিত্র উৎসব এবং শিকাগোতে যাচ্ছি।’
চাটগাঁইয়া তরুণের গান
‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’ সিনেমার সংগীত পরিচালনা করেছেন কানাডাপ্রবাসী দামীর খান। এই তরুণের দাদাবাড়ি চট্টগ্রামে, নানাবাড়ি বরিশালে। তবে বেড়ে উঠেছেন ঢাকায়। এবারই প্রথম নিজের দেশের চলচ্চিত্রে কাজ করেছেন। সিনেমায় তার সুর করা ও গাওয়া গানের শিরোনাম ‘ঢাকা লাভ’ ও ‘বিলিভ’। টরন্টোতে উত্তর আমেরিকান প্রিমিয়ার শেষে দামীর বললেন, ‘এত বড় মঞ্চে বাংলাদেশকে তুলে ধরতে পেরে খুব ভালো লাগছে।’
সৌন্দর্য, শরীর ও নিয়ন্ত্রণের গল্প
সমকালীন ঢাকার একটি বিউটি সেলুনকে কেন্দ্র করে নির্মিত ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’। বিয়ের আগে একজন নারীর শরীরকে ‘সুন্দর’ করে তোলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সৌন্দর্য, আকাঙ্ক্ষা, নারীর শরীরের ওপর সামাজিক নিয়ন্ত্রণ এবং ব্যক্তিস্বাধীনতার প্রশ্ন অনুসন্ধান করে চলচ্চিত্রটি। এতে বাস্তবতার সঙ্গে হরর, অতিপ্রাকৃত উপাদান এবং দক্ষিণ এশীয় লোকবিশ্বাসের সংমিশ্রণ ঘটেছে। কনের সৌন্দর্যচর্চা ধীরে ধীরে এমন এক অভিজ্ঞতায় রূপ নেয় যেখানে সৌন্দর্যের সামাজিক আনুষ্ঠানিকতা হয়ে ওঠে ভয়ের উৎস।
সিনেমায় প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছেন নবাগতা জাইনীন চৌধুরী করিম। তার পাশাপাশি আছেন রিকিতা নন্দিনী শিমু, সুনেরাহ বিনতে কামাল, শতাব্দী ওয়াদুদ, সাবেরী আলম ও মোহাম্মদ বারী। অতিথি চরিত্রে আছেন আজমেরী হক বাঁধন ও দামীর খান। বাংলাদেশের খনা টকিজ এবং জার্মানি, পর্তুগাল ও নরওয়ের প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতায় এটি নির্মিত।




