তারেক মাসুদের ১৫তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ

তারেক মাসুদ। ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশের বিখ্যাত চলচ্চিত্রকার তারেক মাসুদ এর মৃত্যুবার্ষিকী আজ। ২০১১ সালের এই দিনে তার পরবর্তী চলচ্চিত্র কাগজের ফুল-এর শুটিং স্পট নির্বাচন করে ফেরার পথে মানিকগঞ্জের ঘিওরে এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন। একই দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান বিশিষ্ট সাংবাদিক ও চিত্রগ্রাহক মিশুক মুনীরসহ আরও তিনজন।
১৯৫৬ সালের ৬ ডিসেম্বর ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলার নূরপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তার শিক্ষাজীবনের শুরু হয় মাদরাসায়। ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দের মুক্তিযুদ্ধের পরে তিনি সাধারণ শিক্ষা গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাস বিষয়ে অনার্স ডিগ্রি ও মাস্টার্স কোর্স সম্পন্ন করেন।
বিশ্ববিদ্যালয় জীবন থেকেই রাজনীতি, শিল্প-সংস্কৃতি ও দর্শনচর্চার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী হিসেবে তিনি আশির দশকের মাঝামাঝি শুরু হওয়া স্বাধীনধারার চলচ্চিত্র আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন।
চিত্রশিল্পী এস.এম সুলতানের জীবনভিত্তিক প্রামাণ্যচিত্র ‘আদম সুরত’ নির্মাণের অংশ হিসেবে প্রায় সাত বছর তিনি শিল্পীর সান্নিধ্যে কাটান। সেই সময়েই তার সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক দর্শনের ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত হয়। তবে বিশ্ববিদ্যালয় জীবন থেকেই রাজনীতি, শিল্প-সংস্কৃতি ও দর্শনচর্চায় তারেক মাসুদ নিজেকে যুক্ত করেছিলেন। ১৯৮৯ সালে মুক্তি পাওয়া ‘আদম সুরত’-এর মাধ্যমে চলচ্চিত্রকার হিসেবে তার যাত্রা শুরু।
‘মুক্তির গান’ প্রামাণ্যচিত্রটির মাধ্যমে তারেক মাসুদ বাংলাদেশে চলচ্চিত্রকার হিসেবে বিশেষভাবে পরিচিত হয়ে ওঠেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে থাকাকালীন তিনি আমেরিকান পরিচালক লিয়ার লেভিনের ১৯৭১ সালের ধারণকৃত ফুটেজ খুঁজে পান, যা তার জীবন ও কাজের গতিপথ বদলে দেয়। পরবর্তীতে সেই ফুটেজ এবং বিশ্বের বিভিন্ন স্থান থেকে সংগ্রহ করা দৃশ্য মিলিয়ে তিনি ও তার স্ত্রী ক্যাথরিন মাসুদ যৌথভাবে নির্মাণ করেন ‘মুক্তির গান’।
এটি জহির রায়হানের ‘স্টপ জেনোসাইড’- এর পর মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রামাণ্য দলিল হিসেবে গণ্য হয় এবং ‘ফিল্ম সাউথ এশিয়া’ থেকে বিশেষ সম্মাননা অর্জন করে। সিনেমাটি দেশের বিভিন্ন স্থানে বিকল্প উপায়ে সাধারণ মানুষকে দেখানো হয়। দর্শকদের সেই প্রতিক্রিয়া ও মতামতকে ভিত্তি করে পরবর্তীতে তৈরি হয় ‘মুক্তির কথা’, যা মধ্যবিত্ত ধারণার বাইরে সাধারণ মানুষের দৃষ্টিকোণ থেকে মুক্তিযুদ্ধের একটি নতুন ও ভিন্ন ভাষ্য তুলে ধরে।
‘মুক্তির গান’ প্রামাণ্যচিত্রটি তারেক মাসুদকে দেশে একজন সফল চলচ্চিত্রকার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। তবে তার প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য কাহিনিচিত্র ‘মাটির ময়না’ তাকে এনে দেয় আন্তর্জাতিক খ্যাতি। ২০০২ সালে কান চলচ্চিত্র উৎসবে ছবিটি মর্যাদাপূর্ণ ‘ফিপ্রেস্কি’ পুরস্কার লাভ করে, যা বাংলাদেশের চলচ্চিত্রকে বিশ্বমঞ্চে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যায়।
২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের হামলার পর তৈরি হওয়া বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে ছবিটি পশ্চিমা বিশ্বে ব্যাপক সাড়া ফেলেছিল। মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে তৈরি এই আত্মজৈবনিক চলচ্চিত্রে মাদ্রাসাপড়ুয়া এক কিশোরের চোখে মুক্তিযুদ্ধের ঘটনাবলি এবং বাংলার ঐতিহ্যবাহী লোকজ সংস্কৃতি ও দর্শন ফুটে উঠেছে। ‘মাটির ময়না’ ইউরোপ ও আমেরিকার প্রেক্ষাগৃহে বাণিজ্যিকভাবে প্রদর্শিত হয় এবং এর ডিভিডিও প্রকাশিত হয়।
তারেক মাসুদের অন্যান্য উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রের মধ্যে রয়েছে ‘অন্তর্যাত্রা’, ‘নরসুন্দর’ এবং ‘রানওয়ে’। ‘অন্তর্যাত্রা’ চলচ্চিত্রে যুক্তরাজ্যে প্রবাসী বাংলাদেশিদের আত্মপরিচয় খোঁজা এবং নাড়ির টানে বারবার দেশে ফিরে আসার গল্প তুলে ধরা হয়েছে।
অন্যদিকে, স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘নরসুন্দর’-এ মুক্তিযুদ্ধের প্রচলিত ধারণাকে নতুনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে; যেখানে পাকিস্তানি বাহিনী ও রাজাকারদের তাড়া খাওয়া এক মুক্তিযোদ্ধাকে আশ্রয় দিয়ে প্রাণ বাঁচায় বিহারী নরসুন্দররা—যাদের সাধারণ দৃষ্টিভঙ্গিতে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী বলেই মনে করা হতো।
আর ‘রানওয়ে’ চলচ্চিত্রে সমসাময়িক বাংলাদেশের বিভিন্ন সামাজিক সমস্যা, বিশেষ করে ২০০৪-০৫ সালের জঙ্গিবাদের উত্থান ও সংকটকে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
তারেক মাসুদের চলচ্চিত্রে জাতীয় আত্মপরিচয় এবং বাংলার লোকজ ধর্ম ও সংস্কৃতি বিশেষভাবে ফুটে উঠেছে। মূলত এই কারণেই তার একাধিক কাজের মূল বিষয় ছিল বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, যার মাধ্যমে আমাদের জাতীয় পরিচয় সুনির্দিষ্ট হয়েছিল।
মৃত্যুর আগে তিনি ১৯৪৭ সালের দেশবিভাগের ওপর ভিত্তি করে ‘কাগজের ফুল’ নামের একটি চলচ্চিত্র নির্মাণের কাজ করছিলেন। দেশের চলচ্চিত্র জগতে তিনি বেশ কিছু নতুন ধারার সূচনা করেন; যেমন—প্রথম ভিডিও চলচ্চিত্র ‘সোনার বেড়ি’, প্রথম অ্যানিমেশন চিত্র ‘ইউনিসন’ এবং প্রথম ডিজিটাল চলচ্চিত্র ‘অন্তর্যাত্রা’ তারই তৈরি।
এসবের পাশাপাশি স্ত্রী ক্যাথরিন মাসুদ তার বহু চলচ্চিত্রে সহ-পরিচালনা ও সম্পাদনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। সব মিলিয়ে স্বল্পদৈর্ঘ্য, পূর্ণদৈর্ঘ্য, প্রামাণ্যচিত্র ও অ্যানিমেশনসহ তারেক মাসুদ মোট ১৬টি চলচ্চিত্র উপহার দিয়েছেন।
চলচ্চিত্রে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ২০১২ সালে তাকে মরণোত্তর একুশে পদকে ভূষিত করে বাংলাদেশ সরকার।







