আরমান কোহলির এক ভুলে যেভাবে বলিউডের ‘কিং খান’ হয়ে উঠলেন শাহরুখ

শাহরুখ খান
মান্নাতের সামনে প্রতিদিন হাজার হাজার অনুরাগীর উপচেপড়া ভিড় আর বারান্দায় দাঁড়িয়ে ‘কিং খান’-এর এক চিলতে হাসি। শাহরুখ খানের আজকের এই রাজকীয় রূপকথা কিন্তু মোটেই গোলাপ বিছানো পথে শুরু হয়নি।
থিয়েটারের অনিশ্চিত দিনগুলো, পকেটে টাকার টানাপড়েন আর এক বুক স্বপ্ন নিয়ে দিল্লি থেকে মুম্বাই এসেছিলেন এক সাধারণ তরুণ। কোনো পারিবারিক ব্যাকগ্রাউন্ড ছিল না, ছিল না ইন্ডাস্ট্রিতে কোনো গডফাদার। কিন্তু ছিল অগাধ আত্মবিশ্বাস আর বাবার দেওয়া সততার শিক্ষা।
নব্বইয়ের দশকের শেষের দিকে ‘ফৌজি’ বা ‘সার্কাস’-এর মতো টিভি সিরিয়াল দিয়ে অভিনয় জীবন শুরু করেছিলেন শাহরুখ। কিন্তু প্রশ্ন হলো, রুপালি পর্দায় তার অভিষেক ঘটল কীভাবে?
১৯৯২ সালের কথা। সেই সময়ে প্রযোজক গুড্ডু ধানয়ার ‘দিওয়ানা’ সিনেমায় মূল নায়ক হিসেবে অভিনয় করার কথা ছিল তৎকালীন জনপ্রিয় অভিনেতা আরমান কোহলির। ছবির শুটিংও অনেকটাই এগিয়েছিল। কিন্তু হঠাৎই এক ভুল-বোঝাবুঝির কারণে সিনেমা থেকে সরে দাঁড়ান আরমান।
আরমান কোহলির বাবা প্রখ্যাত পরিচালক রাজকুমার কোহলি রাগের মাথায় ছেলেকে ওই প্রজেক্ট থেকে বের করে নেন। আর ঠিক সেই ফাঁকা জায়গাতেই ভাগ্য খুলে যায় ২৬ বছরের তরুণ শাহরুখ খানের।
যদিও ‘দিওয়ানা’র আগে শাহরুখ আরও পাঁচটি সিনেমায় চুক্তিবদ্ধ হয়েছিলেন, কিন্তু প্রেক্ষাগৃহে প্রথম মুক্তি পায় এই ‘দিওয়ানা’ই। প্রথম সিনেমাতেই ঋষি কাপুর ও দিব্যা ভারতীর পাশে নিজের অভিনয় দক্ষতায় বাজিমাত করেন শাহরুখ। অর্জন করে নেন ফিল্মফেয়ারের ‘সেরা নতুন অভিনেতা’র পুরস্কার।
এরপরের ইতিহাস তো সবারই জানা। তবে শুরুতেই কিন্তু রোমান্টিক হিরো হননি শাহরুখ। ১৯৯৩-৯৪ সালে ‘বাজিগর’, ‘ডর’ কিংবা ‘অঞ্জাম’-এর মতো সিনেমায় ভিলেন বা অ্যান্টি-হিরো চরিত্রে অভিনয় করে কাঁপিয়ে দেন পুরো বলিউড।
এরপর ১৯৯৫ সালে মুক্তি পায় অল-টাইম ব্লকবাস্টার ‘দিলওয়ালে দুলহানিয়া লে যায়েঙ্গে’। আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে। ‘দিল তো পাগল হ্যায়’, ‘কুছ কুছ হোতা হ্যায়’, ‘মহব্বতেঁ’, ‘কাভি খুশি কাভি গম’ দিয়ে তিনি হয়ে ওঠেন বলিউডের একচ্ছত্র ‘কিং অব রোমান্স’।
কেবল প্রেমের ছবিই নয়; ‘দেবদাস’-এর মদ্যপ প্রেমিক, ‘স্বদেশ’-এর নাসা বিজ্ঞানী, ‘চক দে ইন্ডিয়া’র হকি কোচ কিংবা ‘মাই নেম ইজ খান’-এর বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মানুষের চরিত্রে অভিনয় করে নিজেকে নিয়ে গেছেন অন্য এক উচ্চতায়।
পরবর্তীতে ‘চেন্নাই এক্সপ্রেস’, ‘রেইস’, ‘ফ্যান’ থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক সময়ে ‘পাঠান’ ও ‘জাওয়ান’ দিয়ে বক্স অফিসে অব্যাহত রেখেছেন নিজের একচ্ছত্র আধিপত্য।
৮০টিরও বেশি চলচ্চিত্রে অভিনয় করা এই অভিনেতার ঝুলিতে রয়েছে ১৪টি ফিল্মফেয়ার পুরস্কার এবং ভারতের সর্বোচ্চ সম্মাননা ‘পদ্মশ্রী’। এমনকি ফরাসি সরকারও তাকে ভূষিত করেছে তাদের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মানে। ২০২৫ সালে অনুষ্ঠিত ৭১তম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে ‘জওয়ান’ সিনেমার জন্য তিনি নিজের ক্যারিয়ারের প্রথম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করে এক নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করেন।
দিল্লির সেই সাধারণ ছেলেটি আজ বিশ্ব জুড়ে পরিচিত ‘বলিউডের বাদশা’ বা ‘কিং খান’ নামে। তিনি প্রমাণ করে দিয়েছেন—স্বপ্ন সত্যি করার ইচ্ছা থাকলে কোনো বাধাই আটকে রাখতে পারে না।





