কারগিল যুদ্ধে সেনা হয়ে লড়েছিলেন নানা পাটেকর

১৯৮০-র দশকের শেষের দিকে নানা পাটেকর আনুষ্ঠানিকভাবে ‘টেরিটোরিয়াল আর্মি’-তে যোগ দেন
সিনে জগতের সফল ক্যারিয়ার, তারকাখ্যাতি ও কোটি টাকার সম্মানীর মোহ একপাশে সরিয়ে রেখেছিলেন তিনি। দেশের প্রয়োজনে লাইট-ক্যামেরার ঝলমলে জীবন ছেড়ে হাতে তুলে নিয়েছিলেন বন্দুক এবং সরাসরি চলে গিয়েছিলেন সীমান্ত পাহারা দিতে। বিশ্ব জুড়ে এমন সাহসিকতা ও ত্যাগ স্বীকার করা তারকার সংখ্যা সত্যিই হাতে গোনা। আর সেই বিরল তারকাদের শীর্ষে যার নাম আসে, তিনি ভারতীয় সিনেমার সদ্য প্রয়াত অভিনেতা নানা পাটেকর।
বৃহস্পতিবার ভোরে গোয়ার বাসভবনে হঠাৎ হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান ৭৫ বছর বয়সী এ অভিনেতা। তার বিদায়ে পুরো বিনোদন জগতেই শুধু শোকের ছায়া নামেনি, বরং স্মরণ করা হচ্ছে তার দেশপ্রেম ও সাহসিকতার এক অবিস্মরণীয় ইতিহাস।
ঘটনা ১৯৮০-র দশকের শেষের দিকের। ১৯৯১ সালে মুক্তি পাওয়া নিজের পরিচালিত সিনেমা ‘প্রহার’-এ এক সেনাকর্তার চরিত্রে অভিনয় করার সিদ্ধান্ত নেন নানা। কিন্তু রূপালি পর্দায় সেনা সাজতে গিয়ে কোনো নকল কায়দা বা শর্টকাট গ্রহণ করতে চাননি তিনি।
আসল সেনার মতো নিজেকে গড়ে তুলতে তিনি তিন বছর ধরে ‘মারাঠা লাইট ইনফ্যান্ট্রি’-র সঙ্গে কঠিন সামরিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন এবং আনুষ্ঠানিকভাবে ‘টেরিটোরিয়াল আর্মি’-তে যোগ দেন।
১৯৯৯ সালে ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে যখন রক্তক্ষয়ী কারগিল যুদ্ধ শুরু হয়, তখন নানা পাটেকর তার অভিনয় জীবনের একদম তুঙ্গে ছিলেন।
কিন্তু দেশের সংকটকালে ঘরে বসে থাকা তার স্বভাবসিদ্ধ ছিল না। তিনি সেনা কর্মকর্তাদের কাছে গিয়ে যুদ্ধে যাওয়ার আবেদন জানান। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানান— একমাত্র প্রতিরক্ষামন্ত্রীই এর অনুমতি দিতে পারেন।
নানা পাটেকর তখন তৎকালীন ভারতীয় প্রতিরক্ষামন্ত্রী জর্জ ফার্নান্দেজের কাছে হাজির হন। মন্ত্রীকে তিনি নিজের নিখুঁত নিশানাবাজি ও সামরিক প্রশিক্ষণের কথা মনে করিয়ে দিয়ে বলেন, ‘আমাকে যুদ্ধের একদম সামনের সারিতে গিয়ে কাজ করার অনুমতি দিন।’
সম্মতি মিলতেই লাইট-ক্যামেরা-অ্যাকশনের গ্ল্যামার জগত পেছনে ফেলে তিনি যোগ দেন সেনাবাহিনীর কুইক রেসপন্স টিমে।
যুদ্ধের সেই কঠিন ৬০ দিন শ্রীনগর, দ্রাস ও লে-র মতো তীব্র শীত ও দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় সেনাবাহিনীর সেনাদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করেছেন নানা পাটেকর। প্রতিদিন খাড়া পাহাড় বেয়ে গোলাবারুদ ও সরঞ্জাম বহনের ফলে যুদ্ধ থেকে যখন ফিরে আসেন, তখন তার শরীরের ওজন ৭৬ কেজি থেকে কমে দাঁড়িয়েছিল মাত্র ৫৬ কেজিতে।
পরে বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে তিনি স্মৃতিচারণ করে বলেছিলেন, ‘পাহাড়ের সেই প্রতিকূল আবহাওয়ায় আমাদের সেনারা যে সাহসিকতায় লড়াই করেছেন, তা নিজ চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা অসম্ভব।’
নানা পাটেকরের এ ঐতিহাসিক ত্যাগ ও অভিনয়ের প্রতি তার অকৃত্রিম ভালোবাসাকে স্মরণ করে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী শোকবার্তায় জানান, ‘নানা পাটেকর জির মধ্যে যে গভীরতা ও নিজস্বতা ছিল, তা আর কারও মধ্যে দেখা যেত না। তিনি বহু স্মরণীয় চরিত্র উপহার দিয়েছেন।’
অভিনেতা অক্ষয় কুমার ও রিতেশ দেশমুখ গভীর শোক প্রকাশ করে জানান, পর্দায় যেমন তিনি দুর্দান্ত অভিনেতা ছিলেন, বাস্তব জীবনে সীমান্তে বন্দুক হাতে কিংবা কৃষকদের পাশে দাঁড়িয়ে তিনি ছিলেন এক সত্যিকারের ‘রিল থেকে রিয়েল হিরো’।





