ডিআইএতে পদায়ন ঘিরে তোলপাড়
গোপনে অর্ডার, গোপনে যোগদানের পরিকল্পনা

আব্দুস সালাম আজাদ
শিক্ষার ঘুষের হাটখ্যাত পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরে (ডিআইএ)। ১ সেপ্টেম্বর (মঙ্গলবার) দপ্তরটির যুগ্ম পরিচালক হিসেবে পদায়ন পেয়েছেন ২১তম বিসিএসের শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তা আব্দুস সালাম আজাদ। বুধবার রাত ৮টা পর্যন্ত পদায়নের আদেশ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়নি।
এর মধ্যে আগামীকাল বৃহস্পতিবার তিনি যোগদান করবেন বলে জানা গেছে। তার এ অর্ডার ঘিরে তোলপাড় শুরু হয়েছে। নানা বিতর্কে থাকা এই কর্মকর্তাকে গোপনে পদায়ন করে চুপিসারে যোগদান করানোর উদ্যোগকে ‘ঘুষ হালাল’ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র বলছে, আগে তাকে যোগদান করিয়ে পরে ওয়েবসাইটে আদেশ প্রকাশের পরিকল্পনা রয়েছে। আগামীর সময়ের হাতে আসা পদায়নসংক্রান্ত আদেশ অনুযায়ী, তাকে ৭ সেপ্টেম্বরের মধ্যে বর্তমান কর্মস্থল জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থাপনা একাডেমি (নায়েম) থেকে অবমুক্ত হতে বলা হয়েছে। কিন্তু তিনি কোনো ধরনের ঝুঁকি নিতে রাজি হননি। বৃহস্পতিবার ডিআইএতে যোগদান করবেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। অন্য একটি সূত্রের দাবি, তার বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর বিতর্কে এড়াতে তার অর্ডার বাতিল হতে পারে।
সালাম আজাদের ব্যক্তিগত ফাইল থেকে জানা গেছে, এই কর্মকর্তা ২০১৩ সালে আওয়ামী লীগের যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী বীরেন শিকদারের সুপারিশে এই দপ্তরে পরিদর্শক হিসেবে পদায়ন পান এবং ২০১৮ সাল পর্যন্ত ছিলেন। বিগত সরকারের সুবিধাভোগী একজন কর্মকর্তাকে ফের দপ্তরটির যুগ্ম পরিচালক হিসেবে কীভাবে পদায়ন করা হয়েছে তা প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা। বিষয়টি মন্ত্রণালয় জানার পর তার অর্ডার অনলাইনে না দিয়ে গোপনে যোগদান করার পরামর্শ দিয়েছে। তিনিও বৃহস্পতিবার যোগদান করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এরমধ্যে কয়েকজন মন্ত্রী বিষয়টি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিবসহ ঊর্ধ্বতনকে জানানো পর চরম বেকায়দায় পড়েছে মন্ত্রণালয়।
ডিআইএতে থাকাকালে তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিদর্শন ও নিরীক্ষার নামে ঘুষ গ্রহণের ব্যাপক অভিযোগ ওঠে। কেবল ঘুষের অভিযোগই নয়, গুলশানে হোলি আর্টিজান জঙ্গি হামলাসংক্রান্ত মামলার তদন্তে তাকে তলব করা হয়েছিল এমন অভিযোগও রয়েছে। সালাম আজাদের ভাই আবুল কালাম আজাদও একই শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তা ছিলেন। তার প্রভাবে তিনি দুর্নীতি করতেন এমন অভিযোগও ওই কর্মকর্তার ব্যক্তিগত নথি থেকে পাওয়া গেছে। তার বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ ওঠার পর ২০১৯ সালে তাকে পানিশমেন্ট পোস্টিং হিসেবে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর সরকারি কলেজে পদায়ন করা হয়।
এসব অভিযোগের বিষয়ে আব্দুস সালাম আজাদ আগামীর সময়ের কাছে দাবি করেন, পদায়নের আদেশ মন্ত্রণালয় কেন অনলাইনে দেয়নি সেটি তো আমি বলতে পারব না। আপনি তাহলে কীভাবে পেয়েছেন এমন প্রশ্নে কিছুটা নীবর থেকে উত্তর, আমার এক শুভাকাঙ্ক্ষী হোয়াটসঅ্যাপে দিয়েছেন।
২০১৩ সালে ডিআইএ পদায়নে কোনো মন্ত্রীর সুপারিশ নেননি দাবি করে তার উল্টো অভিযোগ পদায়ন পাওয়ার পর তৎকালীন যুগ্ম পরিচালক বিপুল চন্দ্র সরকারের সঙ্গে রাজনৈতিক আদর্শ মেলেনি, এজন্য তাকে কাজ করতে দেননি। তাহলে আপনার রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত আদর্শ কী—এমন প্রশ্নের জবাবে তার স্পষ্ট জবাব, আমার কোনো আদর্শ নেই, আমি একেবারেই নির্দলীয়।
আবার ডিআইএতে পদায়ন প্রসঙ্গে তিনি জানান, আমি আবেদন করেছি। এ ছাড়া দপ্তরের পরিচালক নতুন এসেছেন। তাকে সহযোগিতার জন্য পুরনো একজন লোক খুঁজছিলেন। আমি যেহেতু দপ্তরটিতে পাঁচ বছর ছিলাম, তাই আমাকে পদায়ন করা হয়েছে। বিতর্কিত একটি দপ্তরে আবারও কাজ করতে আগ্রহের ব্যাখা করে বলেন, আমি এখানে কাজ করেই বিতর্কমুক্ত করতে চাই দপ্তরটিকে। তবে ডিআইএকে ঘুষমুক্ত করতে চাওয়া এই কর্মকর্তাই ৩০ লাখ টাকা অর্থ লেনদেন করে পদায়ন বাগিয়েছেন এমন চাউর উঠেছে শিক্ষা ক্যাডারে। ঘুষ লেনদেনের বিষয়ে সালাম আজাদ বলেন, এ ধরনের লেনদেনের বিষয়টি ভুয়া।
সালাম আজাদের সর্বশেষ কর্মস্থল ছিল নারায়ণগঞ্জের সরকারি তোলারাম কলেজ। পিডিএস অনুযায়ী, তিনি ২২ মে ২০২২ থেকে ১ জুলাই ২০২৪ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটিতে কর্মরত ছিলেন। এরপর জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থাপনা একাডেমিতে (নায়েম) ওএসডি হিসেবে সংযুক্ত হন এবং ১৪ ডিসেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত সেখানে ছিলেন। বর্তমানে তিনি নায়েমে কর্মরত রয়েছেন।
সংশ্লিষ্টদের দাবি, নারায়ণগঞ্জের সরকারি তোলারাম কলেজ থেকে তাকে বদলি করা হলে শিক্ষার্থীদের দিয়ে মব তৈরি করে ওই বদলি বাতিল করানো হয়। ঘটনাটি নিয়েও শিক্ষা প্রশাসনে নানা আলোচনা রয়েছে। তবে এ ঘটনায় কারা মব তৈরি করেছিল বা কী প্রক্রিয়ায় বদলি বাতিল হয়েছিল, তার নথিপত্র প্রতিবেদকের হাতে নেই।
এদিকে সালাম আজাদের নতুন পদায়নের আদেশ এখনো সংশ্লিষ্ট ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়নি বলে জানা গেছে। একটি সূত্রের দাবি, আগে তাকে যোগদান করিয়ে পরে ওয়েবসাইটে আদেশ প্রকাশের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে গোপন অর্ডার কিংবা পদায়নের বিনিময়ে অর্থ লেনদেনের অভিযোগের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। আগামীর সময়ের হাতে আসা আদেশ অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) তিনি ডিআইএতে যোগদান করতে পারেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর (ডিআইএ) দেশের বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর (স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা) প্রশাসনিক ও আর্থিক স্বচ্ছতা, তবে বাস্তবে এই দপ্তরটি দীর্ঘদিন ধরেই অনিয়ম ও দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হয়েছে। কর্মকর্তারা পরিদর্শনের নামে ঘুষ বাণিজ্য লিপ্ত হন।
অভিযোগ রয়েছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে পরিদর্শনের নামে পরিদর্শকরা সেখানে গিয়ে জাল সনদ, অবৈধ নিয়োগ কিংবা আর্থিক অনিয়ম ধামাচাপা দেওয়ার বিনিময়ে মোটা অঙ্কের অর্থ লেনদেন করেন। এ ছাড়া পরিদর্শকদের তৈরি করা অডিট রিপোর্ট বা তদন্ত প্রতিবেদন মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে পরিবর্তন বা বেচাকেনা হওয়ার অভিযোগ রয়েছে দপ্তরটির বিরুদ্ধে।
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেক আগামীর সময়কে বলেন, তার বিরুদ্ধে আমি এখন নানান জায়গা থেকে শুনতেছি। আদিষ্ট হয়ে পদায়নের কাজ করেছেন এমনটি জানিয়ে সচিব বলেন, তার পদায়নের পেছনে অর্থ লেনদেনের বিষয়ে তিনি কিছুই জানেন না।






