অবৈধ অটোরিকশার দাপটে স্বস্তি নেই চট্টগ্রামের সড়কে

ছবি: আগামীর সময়
সকালে হাসিমুখে আট বছরের মেয়েকে স্কুলে পৌঁছে দিয়েছিলেন পুলিশ কর্মকর্তা আনসারুল করিম। দুপুরে খুলশীর জালালাবাদ সোসাইটিতে বাসার সামনে সেই মেয়েকেই রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখলেন স্বজনেরা। স্কুল থেকে ট্যাক্সিতে ফিরে বাসার গেটে ঢোকার সময় পেছন থেকে দ্রুতগতির একটি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ধাক্কা দেয় তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রী নাওয়াল আনসারীকে। কপাল, ঠোঁট, দুই হাতসহ মুখমণ্ডলে গুরুতর আঘাত পায় শিশুটি।
ঘটনার পর ক্ষোভ প্রকাশ করে আনসারুল করিম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, ‘সরকারি চাকরি করে নিজের অবুঝ সন্তানের নিরাপত্তা যেখানে আমরা নিশ্চিত করতে পারি না, সেখানে আমরা কীভাবে অন্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করব।’
নাওয়ালের এই দুর্ঘটনা বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। চট্টগ্রাম নগরের সড়কে এখন ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার দাপট এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে পথচারী থেকে শুরু করে মোটরসাইকেল আরোহী—কেউই স্বস্তিতে নেই। এমনকি এসব অবৈধ যান নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন পুলিশ সদস্যও।
গত মে মাসে টোল রোডে জব্দ করা একটি অটোরিকশা ডাম্পিং স্টেশনে নেওয়ার সময় চলন্ত গাড়ি থেকে ট্রাফিক কনস্টেবল আব্দুল কুদ্দুসকে ফেলে দেন চালক। পরে অটোরিকশার চাকায় পিষ্ট হয়ে মাথায় গুরুতর আঘাত পান তিনি। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউতে পাঁচ দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর মারা যান কুদ্দুস।
নিবন্ধন নেই, নিষেধাজ্ঞাও উপেক্ষিত
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক) কিংবা বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) কোনো নিবন্ধন বা অনুমোদন নেই এসব ব্যাটারিচালিত রিকশার। উচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞাও রয়েছে। এর পরও নগরের প্রায় ৬০ বর্গমাইল এলাকায় ৭০ থেকে ৮০ হাজার ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চলাচল করছে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ধারণা।
জেলার ১৫ উপজেলায় মিলিয়ে এ সংখ্যা এক লাখ ছাড়িয়েছে। এসব যানের কোনো চালকের নেই প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ বা ড্রাইভিং লাইসেন্স। কিশোর ও অনভিজ্ঞ চালকদের হাতেও দেখা যায় এসব যান। ফলে দ্রুতগতির এই বাহনগুলো অনেক সময় চালকের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।
২৬ আগস্ট রাতে হালিশহর বি-ব্লকে বাসার মোড় ঘোরার সময় দ্রুতগতির অটোরিকশার ধাক্কায় মোটরসাইকেল থেকে ছিটকে পড়েন ফ্রিল্যান্সার জোবায়ের আমান। মাথায় হেলমেট থাকায় বড় ধরনের আঘাত থেকে রক্ষা পেলেও হাত-পায়ে জখম হয় তার। ক্ষতিগ্রস্ত হয় মোটরসাইকেলটিও। দুর্ঘটনার পর চালক গাড়ি না থামিয়ে পালিয়ে যায়।
এর কয়েক দিন আগে হালিশহর বাসস্ট্যান্ড এলাকায় রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আসিফ ইসলাম ও তার বন্ধুর ওপর অটোরিকশা তুলে দেন ১২ থেকে ১৫ বছর বয়সী এক কিশোর চালক। তারা ছিটকে পড়ে আহত হন। এখানেও চালক দ্রুত পালিয়ে যায়।
সন্ধ্যার পর বদলে যায় চিত্র
সরেজমিনে দেখা যায়, দিনের বেলায় ট্রাফিক পুলিশের অভিযানের কারণে অনেক অটোরিকশা অলিগলিতে অবস্থান করে। কিন্তু সন্ধ্যার পর গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে বাড়তে থাকে এসব যানের উপস্থিতি। চকবাজার, ডিসি রোড, সিরাজউদ্দৌলা রোড, আগ্রাবাদ এক্সেস রোড, নয়াবাজার বিশ্ব রোড ও বাকলিয়া এক্সেস রোডে একসঙ্গে চলতে দেখা যায় শত শত ব্যাটারিচালিত রিকশা।
উল্টো পথে চলা, যত্রতত্র যাত্রী ওঠা-নামা, সিগন্যাল অমান্য করা এবং বেপরোয়া গতিতে চালানো—এসব এখন নিত্যদিনের চিত্র।
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বললেন, ‘২০১৬ সাল থেকেই তারা এসব যান নিয়ে সরকারকে সতর্ক করে আসছেন। তার মতে, নিয়ন্ত্রণহীনভাবে বাড়তে বাড়তে পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে গেছে যে উচ্ছেদে উদ্যোগ নিলেই চালকরা সড়ক অবরোধ করে জনভোগান্তি তৈরি করেন।’
তিনি জানালেন, প্রধান সড়ক থেকে এসব যান সরানোর পাশাপাশি অলিগলিতে চলাচলকারী চালকদেরও ন্যূনতম প্রশিক্ষণের আওতায় আনতে হবে। রাজনীতিবিদদের সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করবে ব্যাটারি রিকশার নিয়ন্ত্রণ।
আটক হয়, আবার রাস্তায় ফেরে
নগর পুলিশের সহকারী কমিশনার (জনসংযোগ) আমিনুর রশিদ বলেন, নিয়মিত অভিযান চালিয়ে অবৈধ অটোরিকশা আটক করা হয়। কিন্তু আইনের একটি বিশেষ ব্যবস্থার কারণে জরিমানা দিয়ে সেগুলো ছাড়িয়ে নেওয়া হয়। পরে একই গাড়ি আবার সড়কে চলে আসে।
নগর পুলিশের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বললেন, দাগী অপরাধীদের গ্রেপ্তার করা সম্ভব হলেও অবৈধ রিকশার বিস্তার নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। শুধু অভিযান চালিয়ে এ সমস্যার সমাধান হবে না। আটক করা অবৈধ অটোরিকশা স্থায়ীভাবে ধ্বংস করার পাশাপাশি কোন কোন ফিডার সড়কে এসব যান চলতে পারবে, তা নির্দিষ্ট করে দিতে হবে।
নিবন্ধন নেই, চালকের প্রশিক্ষণ নেই, লাইসেন্স নেই, তারপরও শহরের সড়কে অবাধে চলছে এসব যান। ফলে প্রশ্ন উঠছে, নিষেধাজ্ঞা ও অভিযান দুটিই যদি কার্যকর না হয়, তাহলে নগরবাসীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে কে?







