উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো কি শুধু ডিগ্রি দেওয়ার কারখানা?

ছবি : এআই
বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থা আজ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সংকটাপন্ন মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষার্থীরাও এখন স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে পড়ার সুযোগ পাচ্ছেন, যা আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার এক বিরাট সামাজিক অর্জন হিসেবে গণ্য করা যায়। তবে এই ইতিবাচক প্রসারের আড়ালে একটি মৌলিক ও অনস্বীকার্য প্রশ্ন প্রতিনিয়ত ঘনীভূত হচ্ছে। আমরা কি সত্যিই প্রান্তিক পর্যায়ে মানসম্মত ও প্রকৃত শিক্ষার বিস্তার ঘটাচ্ছি, নাকি কেবল আনুষ্ঠানিক ডিগ্রিধারীর সংখ্যা বাড়িয়ে চলেছি।
আমাদের দেশের টারশিয়ারি বা উচ্চশিক্ষাব্যবস্থার একটি বড় অংশ এখন এমন এক প্রশাসনিক ও একাডেমিক জটাজালের মধ্যে চালিত হচ্ছে, যেখানে দায়িত্ব পালনের লোকের অভাব না থাকলেও চূড়ান্ত জবাবদিহির জায়গাটি চরমভাবে ধোঁয়াশে হয়ে পড়েছে।
সরকারি কলেজগুলোর বিদ্যমান চিত্রটি বিশ্লেষণ করলেই এই প্রশাসনিক ও একাডেমিক অস্পষ্টতা পরিষ্কার বোঝা যায়। দেশের অসংখ্য সরকারি কলেজে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে অনার্স ও মাস্টার্স ডিগ্রি চালু রয়েছে। এসব কলেজের শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা প্রশাসনিকভাবে শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের অধীনে কর্মরত থাকেন। পক্ষান্তরে, তাদের শিক্ষাক্রম, পরীক্ষা, ফলাফল এবং অর্জিত ডিগ্রির সার্বিক কর্তৃত্ব জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের হাতে ন্যস্ত। অর্থাৎ, একটি প্রতিষ্ঠান প্রশাসনিকভাবে পরিচালিত হচ্ছে এক কাঠামোর অধীনে, আর একাডেমিকভাবে নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক কাঠামোর অধীনে।
সম্প্রতি ঢাকার সাতটি সরকারি কলেজকে কেন্দ্র করে নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক প্রাতিষ্ঠানিক রূপান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আবার মাদ্রাসা শিক্ষার উচ্চতর পর্যায়ের তদারকিতে রয়েছে ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়। অন্যদিকে বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় কর্মজীবী ও প্রথাগত শিক্ষার বাইরে থাকা বিপুলসংখ্যক মানুষকে নমনীয় দূরশিক্ষণ কাঠামোর মাধ্যমে ডিগ্রির সুযোগ করে দিচ্ছে।
এসব ব্যবস্থার পেছনে নিজস্ব যৌক্তিকতা থাকলেও প্রধান সংকট তৈরি হয়েছে এদের ভূমিকা, দায়িত্ব ও জবাবদিহির অস্পষ্ট সীমারেখায়। উদাহরণস্বরূপ, একটি সরকারি কলেজের শিক্ষার মান যদি ভেঙে পড়ে, তবে তার দায়ভার শেষ পর্যন্ত কে নেবে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় দাবি করতে পারে যে শিক্ষক নিয়োগ, অবকাঠামো কিংবা লাইব্রেরির মান তাদের নিয়ন্ত্রণে নেই। অন্যদিকে কলেজ প্রশাসন বলতে পারে যে, পাঠ্যক্রম নির্ধারণ বা পরীক্ষা পরিচালনার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের এখতিয়ার তাদের হাতে অনুপস্থিত। ফলে শিক্ষার গুণগত মানের মূল দায়ভার দুটি ভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মাঝখানে পড়ে শেষ পর্যন্ত বিলীন হয়ে যায়। যেখানে দায়িত্ব ও কর্তৃত্ব বিভক্ত, সেখানে শিক্ষাদান বা গবেষণার মান নিয়ন্ত্রণ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। তাই একাডেমি এবং প্রশাসনের মধ্যে একটি প্রত্যক্ষ ও ফলপ্রসূ সমন্বয় না থাকলে প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়ন শেষ পর্যন্ত থমকে যেতে বাধ্য।
উচ্চশিক্ষার এই সংকট থেকে উত্তরণ ঘটাতে হলে আমাদের ‘বিশ্ববিদ্যালয়’ ধারণাটির মূল দর্শনে ফিরে যাওয়া জরুরি। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ কখনোই কেবল শিক্ষার্থী ভর্তি করা, সিলেবাস তৈরি করা, নিয়মিত পরীক্ষা নেওয়া আর সার্টিফিকেট বিতরণ করার মধ্যে সীমাবদ্ধ হতে পারে না। একটি বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ও প্রধান কাজ হলো নতুন জ্ঞান সৃষ্টি করা। গবেষণা, উদ্ভাবন ও মুক্ত চিন্তার চর্চার মাধ্যমেই কেবল একটি সমাজ ও জাতির জন্য নতুন জ্ঞান জন্ম নেয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় কাজ হলো সেই অর্জিত জ্ঞান শিক্ষার্থীদের মাঝে দক্ষতার সঙ্গে ছড়িয়ে দেওয়া, তৃতীয় কাজ প্রগতিশীল মানবসম্পদ গড়ে তোলা এবং চতুর্থ কাজ সেই জ্ঞানকে বাস্তব সামাজিক ও অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধানে প্রয়োগ করা।
কিন্তু আমাদের দেশে উচ্চশিক্ষা আজ ক্রমশ জ্ঞান চর্চার মূল কেন্দ্র থেকে সরে এসে কেবল ‘ডিগ্রি ব্যবস্থাপনার’ কারখানায় পরিণত হচ্ছে। কতজন ভর্তি হলো বা কতগুলো বিভাগে অনার্স খোলা হলো সেই হিসাব রাখা হলেও, গ্র্যাজুয়েটরা আন্তর্জাতিক কর্মক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা করার মতো দক্ষতা অর্জন করতে পারছেন কি না, সেই প্রশ্নটি উপেক্ষিত থেকে যাচ্ছে।
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় দেশের প্রান্তিক পর্যায়ে শিক্ষা পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করলেও, তিন দশক আগের সম্প্রসারণ মডেল আজকের আধুনিক বিশ্বের দ্রুত পরিবর্তনশীল প্রেক্ষাপটে একইভাবে কার্যকর নাও হতে পারে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বিশ্বায়ন এবং শিল্পবিপ্লবের এই যুগে কেবল একটি কেন্দ্রীয় ব্যবস্থার মাধ্যমে হাজার হাজার কলেজের শিক্ষার মান নিয়ন্ত্রণ করা অত্যন্ত কঠিন। সমাধান হিসেবে সব সরকারি কলেজকে রাতারাতি আলাদা বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তর করা যেমন বাস্তবসম্মত নয়, তেমনি বিদ্যমান দ্বৈত শাসন মেনে নেওয়াও দীর্ঘমেয়াদে সম্ভব নয়।
এর একটি সম্ভাব্য পথ হতে পারে আঞ্চলিক বা ক্লাস্টারভিত্তিক কলেজিয়েট বিশ্ববিদ্যালয় মডেল। নির্দিষ্ট অঞ্চলের কিছু কলেজকে একটি শক্তিশালী আঞ্চলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে শিক্ষাসংক্রান্ত সমন্বিত কাঠামোর অধীনে আনা যেতে পারে, যেখানে কলেজগুলো তাদের অবকাঠামোগত পরিচয় বজায় রেখে কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শিক্ষার মান ও গবেষণার দিকনির্দেশনা গ্রহণ করবে।
পাশাপাশি আমাদের বুঝতে হবে যে, দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়কে একই ছাঁচে ঢেলে সাজানোর কোনো প্রয়োজন নেই। উন্নত বিশ্বে শিক্ষার বৈচিত্র্য থাকে; সেখানে কিছু বিশ্ববিদ্যালয় শুধুই গবেষণা ও উচ্চতর ডিগ্রির কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে, কিছু প্রতিষ্ঠান জোর দেয় প্রায়োগিক ও কারিগরি দক্ষতার ওপর, আর কিছু প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করে জীবনব্যাপী পেশাগত শিক্ষা। এই ধারায় বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়কেও এক নতুন সম্ভাবনার কেন্দ্রে নিয়ে আসা সম্ভব। প্রথাগত ডিগ্রির বাইরে কর্মজীবীদের জন্য আধুনিক সার্টিফিকেট কোর্স, প্রযুক্তিভিত্তিক দক্ষতা এবং পেশাগত পুনঃপ্রশিক্ষণের প্রধান প্ল্যাটফর্ম হিসেবে উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়কে গড়ে তোলা যায়। কারণ ভবিষ্যতের উচ্চশিক্ষা আর ‘চার বছরের এককালীন পড়া’ থাকবে না, বরং তা হয়ে উঠবে আজীবন শেখার একটি অবিচ্ছিন্ন প্রক্রিয়া।
বর্তমান যুগে কেবল ডিগ্রির অর্জনের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো চার বছরের পড়াশোনা শেষে শিক্ষার্থী ঠিক কী করতে সক্ষম হচ্ছে। মুখস্থনির্ভর পরীক্ষা ব্যবস্থার বদলে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে এখন ফলাফলভিত্তিক ও দক্ষতানির্ভর শিক্ষার দিকে নিয়ে যেতে হবে। একজন গ্র্যাজুয়েট জটিল সমস্যার বিশ্লেষণ করতে পারছেন কি না, নতুন প্রযুক্তি আয়ত্ত করতে পারছেন কি না এবং নৈতিকতার সঙ্গে সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন কি না, এসব মানদণ্ডেই উচ্চশিক্ষার সফলতা মেপে দেখতে হবে। এই পুরো পরিবর্তনের কেন্দ্রে রয়েছেন শিক্ষকগণ, তাই শিক্ষকদের শুধু শ্রেণিভিত্তিক পাঠদানের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে তাদের নিয়মিত গবেষণা ও বিশ্বমানের প্রশিক্ষণের সুযোগ দেওয়া আবশ্যক।
উচ্চশিক্ষার এই বহুমুখী ও বিস্তৃত জটিলতা বিচ্ছিন্ন কোনো সিদ্ধান্ত দিয়ে সমাধান করা সম্ভব নয়। এজন্য একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ‘ন্যাশনাল টারশিয়ারি অ্যাডুকেশন রিফর্ম কমিশন’ গঠন করা প্রয়োজন, যা আগামী দুই বা তিন দশকের চাহিদা মাথায় রেখে একটি সুনির্দিষ্ট ও সমন্বিত রূপরেখা তৈরি করবে।
আমাদের স্পষ্ট সিদ্ধান্ত নিতে হবে যে, উচ্চশিক্ষা কি কেবল সাশ্রয়ী মূল্যে ডিগ্রি বিতরণের ব্যবস্থা হিসেবে চালু থাকবে, নাকি তা সত্যিকার অর্থে জ্ঞান সৃষ্টি ও সমাজ পরিবর্তনের প্রধান চালিকাশক্তি হবে। ডিগ্রির সংখ্যার চেয়ে শিক্ষার গভীরতা এবং প্রতিষ্ঠানের পরিমাণের চেয়ে শিক্ষার মান নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত আমাদের আগামী দিনের মূল দর্শন। বিশ্বমানের গ্র্যাজুয়েট তৈরি করতে হলে শুধু বিশ্বমানের অবকাঠামো নয়, একটি আধুনিক, সমন্বিত ও জবাবদিহিমূলক শিক্ষাব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা আজ সময়ের দাবি।
লেখক : উপাচার্য, খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, খুলনা
[email protected]







