ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
হলে প্রবেশে নিয়মের জালে ছাত্রীরা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হলের এক আবাসিক শিক্ষার্থী। একদিন মাঝরাতে টের পান, তার কানে কিছু একটা ঢুকেছে। শুরু হয় প্রচণ্ড ব্যথা। রুমমেটরা তাকে মেডিকেলে নিয়ে যাওয়ার জন্য হলের গেটে নিয়ে যান। কিন্তু হলের দায়িত্বরত আবাসিক শিক্ষকের অনুমতি ছাড়া গেট খুলতে রাজি হননি প্রহরীরা। শিক্ষকের অনুমতি পেতে পেতে পেরিয়ে যায় কয়েক ঘণ্টা। আবার গেট খোলার অনুমতি মিললেও পাওয়া যাচ্ছিল না বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাম্বুলেন্স। শেষমেশ মধ্যরাতে রিকশায় করে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়।
আরেকটি গল্প সুফিয়া কামাল হলের শিক্ষার্থী জাকিয়া জান্নাতের। সেমিস্টার ফাইনাল পরীক্ষা চলাকালে এক রাতে প্রচণ্ড জ্বরে আক্রান্ত হন তিনি। পরীক্ষার কারণে বাড়ি যেতে পারছিলেন না। মেয়ের অবস্থা শুনে ঢাকায় চলে আসেন মা। কিন্তু মেয়ের হলে ঢোকার অনুমতি মেলেনি তার। ফলে অসুস্থ মেয়ের পাশে বসা হয়ে ওঠেনি তার। গেস্টরুম থেকেই বিদায় নিতে হয়। আর বাধ্য হয়ে অসুস্থ শরীরেই নিজের সব কাজ সেরে পরীক্ষাতেও বসেন জাকিয়া।
সেই সময়ের কথা মনে করে জাকিয়া বললেন, ‘আজব আইন। আমি জ্বর, মাথাব্যথায় বিছানা থেকে উঠতেই পারছি না। মা চলে এলেন যত্ন করতে— যেন আমি সুস্থ হই, ভালোভাবে পরীক্ষা দিতে পারি। কিন্তু হলের দায়িত্বরত শিক্ষককে অনেক অনুরোধ করেও মাকে হলের ভেতরে নেওয়ার অনুমতি পাইনি।’
শুধু এই দুই ছাত্রীই নন, ঢাবির আবাসিক হলগুলোর অনেক নারী শিক্ষার্থীকেই পড়তে হয় এ ধরনের নানা ভোগান্তিতে। দীর্ঘদিন ধরেই নারী শিক্ষার্থীদের হলে চলছে এমন নিয়ম, যেখানে জরুরি প্রয়োজনেও মা কিংবা বোন ঢুকতে পারেন না। আবার এক হলের শিক্ষার্থী আরেক হলে ঢুকতে পারেন না, অনাবাসিক শিক্ষার্থীরা কোনো হলেই ঢুকতে পারেন না, রাত ১০টা পেরোলে কাউকে হলেই ঢুকতে দেওয়া হয় না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৩৭ হাজারেরও বেশি। এর মধ্যে ৫২ শতাংশই নারী। ঢাবিতে মোট হলের সংখ্যা ১৮টি, যার মধ্যে ছাত্রীদের জন্য বরাদ্দ শুধু পাঁচটি। ছাত্রদের হলে এত নিয়মকানুনের কড়াকড়ি নেই। যত নিয়ম সব ছাত্রীদের জন্য। দীর্ঘদিন ধরেই ‘অদ্ভুত’ এসব নিয়ম পরিবর্তনের দাবি জানিয়ে আসছেন শিক্ষার্থীরা। ডাকসুর পক্ষ থেকেও জানানো হয়েছিল নানা দাবি। সবশেষ সোমবার নারী শিক্ষার্থীরা এসব নিয়ম পরিবর্তনের দাবিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এবিএম ওবায়দুল ইসলামের কাছে স্মারকলিপিও দিয়েছেন।
হলের নিয়মকানুন পরিবর্তনের দাবিতে নারী শিক্ষার্থীরা দুটি অংশে বিভক্ত হয়ে পড়েছেন। একটি অংশ প্রচলিত সান্ধ্য আইন বাতিল করে সারা রাত গেট খোলা রাখার পক্ষে। অন্য অংশটি সারা রাত নয়, তবে হলে প্রবেশের সময়সীমা বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন।
প্রথম অংশটির নেতৃত্ব দিচ্ছেন সুফিয়া কামাল হলের ভিপি সানজানা চৌধুরী রাত্রি। তাদের দাবি, ছাত্রী হলে সান্ধ্য আইন বাতিল করে গেট ২৪ ঘণ্টা খোলা রাখা, বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মিত ছাত্রীদের বৈধ পরিচয়পত্র প্রদর্শনের মাধ্যমে যেকোনো ছাত্রী হলে প্রবেশের সুযোগ নিশ্চিত করা এবং অনুমতি সাপেক্ষে রাত যাপনের সুযোগ দেওয়া। পাশাপাশি যেকোনো ছাত্রীর পরিবারের নারী সদস্যদের হলের রুম পর্যন্ত যাওয়ার অনুমতি দেওয়ার দাবিও তাদের।
আরেকটি অংশের নেতৃত্ব দেওয়া শিক্ষার্থী নুসরাত জাহান জেরিন বললেন, নারী শিক্ষার্থীদের হল ২৪ ঘণ্টা খোলা নয়, হলে প্রবেশের সময়সীমা বাড়াতে হবে। এক্ষেত্রে ‘লেট গেট’ অর্থাৎ দেরিতে প্রবেশের জন্য আলাদা একটি গেট রাখার দাবি তাদের। পাশাপাশি সব হলে আবাসিক ও অনাবাসিক শিক্ষার্থীর প্রবেশ এবং শিক্ষার্থীদের মা ও বোনকে হলে প্রবেশের অনুমতি রাখার দাবি এই অংশের।
বিশ্ববিদ্যালয়ের
উপাচার্য অধ্যাপক ড. এবিএম ওবায়দুল ইসলাম বললেন, ‘শিক্ষার্থীদের দাবিগুলো যৌক্তিক। তাদের দাবি নিয়ে প্রভোস্টদের সঙ্গে কথা বলে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। শিক্ষার্থীরা যাতে কোনো সমস্যায় না পড়ে সেজন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সবসময় সচেষ্ট থাকবে।’






