ঋণমান নেতিবাচক থেকে স্থিতিশীল
- রাজনৈতিক ঝুঁকি হ্রাস এবং শক্তিশালী রিজার্ভ
- বি২ সার্বভৌম রেটিং অপরিবর্তিত রয়েছে
- ২০২৬ সালের মাঝামাঝি নাগাদ রিজার্ভ ৩২.৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে
- ব্যাংক খাত প্রধান দুর্বলতা হিসেবে রয়ে গেছে
- ২০২৭ অর্থবছরের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ৪.৩ শতাংশে উন্নীত করা হয়েছে

সংগৃহীত ছবি
বাংলাদেশের সার্বভৌম ঋণমানের পূর্বাভাস নেতিবাচক থেকে স্থিতিশীল করেছে আন্তর্জাতিক ঋণমান নির্ধারণকারী সংস্থা মুডিস রেটিংস। রাজনৈতিক ও বৈদেশিক খাতের ঝুঁকি কমা, রিজার্ভ বৃদ্ধি এবং রেকর্ড রেমিট্যান্সপ্রবাহের কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতির ঝুঁকি এখন আগের তুলনায় স্থিতিশীল বলে মনে করছে সংস্থাটি।
গতকাল মঙ্গলবার প্রকাশিত তাদের সর্বশেষ মূল্যায়নে আন্তর্জাতিক এই ঋণমান যাচাইকারী সংস্থাটি বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি ‘ইস্যুয়ার’ এবং ‘সিনিয়র আনসিকিউরড’ রেটিংকে— বি২ এবং স্বল্পমেয়াদি ইস্যুয়ার রেটিং নট প্রাইমে অপরিবর্তিত রেখেছে।
তবে বাংলাদেশের সার্বভৌম ঋণমান ‘বি২’ অপরিবর্তিত রেখেছে মুডিস। পাশাপাশি স্বল্পমেয়াদি ইস্যুয়ার রেটিং ‘নট প্রাইম’ বহাল রয়েছে। গতকাল প্রকাশিত সর্বশেষ মূল্যায়নে এসব তথ্য জানিয়েছে সংস্থাটি।
মুডিস জানিয়েছে, নেতিবাচক আউটলুকের পেছনে যেসব ঝুঁকি ছিল, সেগুলো এখন বি২ রেটিংয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ পর্যায়ে এসেছে। নির্বাচন-পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং সরকারের শক্তিশালী ম্যান্ডেট সংস্কার কার্যক্রমে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার নেতিবাচক প্রভাবের ঝুঁকি কমিয়েছে।
বৈদেশিক খাতেও কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে। ২০২৬ সালের মাঝামাঝি বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়ে প্রায় ৩২ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে, যা ২০২৪ সালের শেষের ২১ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় উল্লেখযোগ্য বেশি। বর্তমান রিজার্ভ দিয়ে চার মাসের বেশি আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব বলে জানিয়েছে মুডিস।
রেমিট্যান্সের রেকর্ডপ্রবাহ, ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থ পাঠানোর প্রবণতা বৃদ্ধি এবং নমনীয় বিনিময় হার ব্যবস্থার কারণে রিজার্ভ পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সরকারের অব্যাহত সম্পৃক্ততাকেও বৈদেশিক অর্থায়ন এবং সংস্কারের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে দেখছে সংস্থাটি।
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিয়েও ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়ানোর পূর্বাভাস দিয়েছে মুডিস। ২০২৫ অর্থবছরে ৩ দশমিক ৫ শতাংশে নেমে যাওয়া প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধি ২০২৬ অর্থবছরে বেড়ে ৪ দশমিক ১ শতাংশ হয়েছে। ২০২৭ অর্থবছরে তা ৪ দশমিক ৩ শতাংশে উন্নীত হতে পারে। পরে বিনিয়োগ ও শিল্প কর্মকাণ্ড স্বাভাবিক হলে ২০২৮ অর্থবছর থেকে প্রবৃদ্ধি প্রায় ৪ দশমিক ৯ শতাংশে উঠতে পারে। তবে মূল্যস্ফীতি প্রায় ৯ শতাংশে থাকার পর ধীরে ধীরে কমবে বলে ধারণা করছে সংস্থাটি।
অন্যদিকে ব্যাংক খাতকে বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান দুর্বলতা হিসেবে চিহ্নিত করেছে মুডিস। সংস্কার কার্যক্রমে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের হার প্রায় ৩২ দশমিক ৮ শতাংশে উঠে এসেছে। ব্যাংকগুলোর মূলধন ঘাটতি পূরণে জিডিপির প্রায় ১০ শতাংশের সমপরিমাণ পুনর্মূলধনের প্রয়োজন হতে পারে। এতে সীমিত রাজস্ব সক্ষমতার সরকারের ওপর বড় ধরনের আর্থিক চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
রাজস্ব আহরণের দুর্বলতাও বাংলাদেশের ঋণমানের ওপর চাপ তৈরি করছে। মুডিসের মতে, রেটিংপ্রাপ্ত দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের সরকারি রাজস্বের ভিত্তি অত্যন্ত সংকীর্ণ। সরকারের মোট রাজস্বের প্রায় ৩০ শতাংশ সুদ পরিশোধে ব্যয় হচ্ছে। যদিও সরকারি ঋণ জিডিপির প্রায় ৪০ শতাংশে রয়েছে।
জ্বালানি সরবরাহের সীমাবদ্ধতা এবং স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণকেও ঝুঁকি হিসেবে দেখছে মুডিস। এলডিসি উত্তরণের পর রপ্তানি প্রতিযোগিতা ও সহজ শর্তের অর্থায়নে চাপ তৈরি হতে পারে। তবে তৈরি পোশাক খাত বাংলাদেশের রপ্তানির প্রধান ভিত্তি হিসেবে থাকবে বলে মনে করছে সংস্থাটি।
ব্যাংক খাতের সংস্কারে দ্রুত অগ্রগতি, রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি এবং প্রতিষ্ঠান ও নীতির কার্যকারিতা উন্নত হলে বাংলাদেশের ঋণমানে ইতিবাচক পরিবর্তনের সুযোগ রয়েছে। বিপরীতে ব্যাংক খাতের দায় সরকারের ওপর বড় আকারে চাপানো, প্রবৃদ্ধি বা রাজস্ব পরিস্থিতির অবনতি, বৈদেশিক অর্থায়নে বাধা কিংবা রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়লে রেটিংয়ে নেতিবাচক চাপ তৈরি হতে পারে।




