ত্রৈমাসিক মুদ্রানীতির মাইলফলক

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) চাপে এবং মূল্যস্ফীতির চোখরাঙানির পরিপ্রেক্ষিতে নতুন করে মুদ্রানীতি ঘোষণা হতে যাচ্ছে আজ বুধবার। এটি চলতি বছরের তৃতীয়বারের মতো মুদ্রানীতি ঘোষণা, যা ত্রৈমাসিক পদ্ধতির প্রথম ঘোষণা বটে। এর মধ্য দিয়ে ৫৫ বছরের ইতিহাসে এক নতুন মাইলফলকে প্রবেশ করতে যাচ্ছে দেশে। একই ধারাবাহিকতায় আগামী বছর থেকে ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে বছরে চারবার মুদ্রানীতি ঘোষণা করা হবে। তবে আগে সাধারণত ষাণ্মাসিক এবং বার্ষিক ভিত্তিতে মুদ্রানীতি ঘোষণা করা হতো। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, বছরের সর্বশেষ মুদ্রানীতিতে নীতি সুদহার অপরিবর্তিত থাকছে। তবে বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হারে টাকার মান কমার ইঙ্গিত মিলেছে। একসঙ্গে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন প্রণোদনা প্যাকেজের সুদহারে পরিবর্তন আসতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, মূল্যস্ফীতি এখনো লক্ষ্যমাত্রা সাড়ে ৭ ছাড়িয়ে ৮ শতাংশের ওপরে অবস্থান করছে। বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ দুর্বল, ব্যাংক খাতে অতিরিক্ত তারল্য বেড়েছে এবং একই সময়ে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি ও নতুন বেতনকাঠামো মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি করছে। এমন বাস্তবতায় বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন মুদ্রানীতিতে বড় কোনো পরিবর্তনের সম্ভাবনা নেই। তবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও অর্থনীতিতে ঋণপ্রবাহ বাড়ানোর মধ্যে ভারসাম্য রাখতে নানা প্রাক-অর্থায়ন এবং পুনঃ অর্থায়নের সুদের হারের পরিবর্তন হতে পারে, যা আবার কর্মসংস্থান এবং উৎপাদনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুদ্রানীতি পর্যালোচনায় উঠে এসেছে, দেশ স্বাধীনের পর ১৯৭২ থেকে ২০০৫ পর্যন্ত বছরে একবার মুদ্রানীতি ঘোষণা করা হয়েছিল। কিন্তু ২০০৬ সাল থেকে সেই নীতি থেকে সরে বছরে দুবার মুদ্রানীতি ঘোষণা করা শুরু হয়, যা ২০১৯ সালের জুন পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। মূলত ২০১৯-২০, ২০২০-২১ এবং ২০২১-২২ অর্থবছর বছরে একবার করে মুদ্রানীতি ঘোষণা করা হয়। তবে ২০২২ সালের জুলাই থেকে আবার ছয় মাস করে বছরে দুবার মুদ্রানীতি ঘোষণার প্রচলন করে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ ধরনের ঘোষণা নিয়ে আইএমএফ নানা চাপ দেয় বলে বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। অবশেষে সংস্থাটির চাপের মুখেই ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে বছরে চারবার মুদ্রানীতি ঘোষণা করতে যাচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক— এমন মন্তব্য করেন তারা।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ফাহমিদা খাতুন আগামীর সময়কে বলেছেন, ছয় মাসের বদলে প্রতি তিন মাসে মুদ্রানীতি ঘোষণা সময়োপযোগী পদক্ষেপ। মূল্যস্ফীতি, বিনিময় হার ও বৈশ্বিক পরিস্থিতি দ্রুত বদলালে নীতি নিয়মিত পর্যালোচনার সুযোগ তৈরি হবে। এতে বাজারও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সিদ্ধান্ত সম্পর্কে সময়মতো ধারণা পাবে।
তিনি বলেছেন, নির্ভরযোগ্য তথ্য, ভালো পূর্বাভাস ও দক্ষ বিশ্লেষণ নিশ্চিত করা বড় চ্যালেঞ্জ। তথ্য অসম্পূর্ণ হলে নীতির বারবার পরিবর্তন অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করতে পারে। তাই সিদ্ধান্তের কারণ, ঝুঁকি ও মূল্যস্ফীতি-প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস পরিষ্কারভাবে জানানো জরুরি। তবে খাদ্য বা জ্বালানির সরবরাহজনিত মূল্যস্ফীতি শুধু সুদের হার দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। সরকারের অন্য নীতিগুলোও এর সঙ্গে সমন্বয় করতে হবে।
জানা গেছে, গত জুলাইয়ে প্রায় ছয় বছর পর প্রথমবারের মতো নীতি সুদহার ১০ থেকে কমিয়ে ৯ দশমিক ৫০ শতাংশ করে বাংলাদেশ ব্যাংক। একই সময়ে ব্যাংকগুলোর জরুরি ঋণ নেওয়ার সর্বোচ্চ সুদহার বা স্ট্যান্ডিং লেন্ডিং ফ্যাসিলিটি (এসএলএফ) ১১ দশমিক ৫০ থেকে কমিয়ে ১১ শতাংশ করা হয়। তবে ব্যাংকের অতিরিক্ত অর্থ বাংলাদেশ ব্যাংকে রাখার সুবিধা— স্ট্যান্ডিং ডিপোজিট ফ্যাসিলিটি (এসডিএফ) ৭ দশমিক ৫০ শতাংশেই রাখা হয়। এরপর সেপ্টেম্বরের এমপিসি সভায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক নীতি সুদহার অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত নেয়। আর মূল্যস্ফীতি নিম্নমুখী হলেও তা এখনো সরকারের নির্ধারিত ৭ দশমিক ৫০ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রার ওপরে রয়েছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন ঝুঁকি মূল্যস্ফীতিকে আবারও বাড়িয়ে দিতে পারে। এসব পরিস্থিতির প্রভাব মূল্যায়ন করে পরে নীতি সুদহার পরিবর্তনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাবে আগস্টে দেশের পয়েন্ট টু পয়েন্ট মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ২৬ শতাংশ। জুলাইয়ে এই হার ছিল ৮ দশমিক ৩২ শতাংশ। অর্থাৎ মূল্যস্ফীতিতে সামান্য স্বস্তি এলেও তা এখনো লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। ১২ মাসের চলমান গড় মূল্যস্ফীতিও আগস্টে ৮ দশমিক ৬৬ শতাংশে ছিল।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলেছেন, দেশের সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে মুদ্রানীতি ঘোষণা করা হচ্ছে। এতে বাজার এবং অর্থনীতি বিশ্লেষণ করে দ্রুত নীতি পরিবর্তন ও পদক্ষেপ নেওয়া যাবে। এটা দেশের জন্য নতুন মাইলফলক।



