চীনা উদ্যোক্তার যোগসাজশে লাভেলোর শেয়ার কারসাজি

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
খাদ্য ও আনুষঙ্গিক খাতে তালিকাভুক্ত তাওফিকা ফুডস অ্যান্ড লাভেলো আইসক্রিমের শেয়ার লেনদেনে অনিয়ম ও কারসাজির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিয়েছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। কোম্পানিটির শেয়ার লেনদেন পর্যালোচনা করে আইন লঙ্ঘনের দায়ে আট ব্যক্তি ও দুই প্রতিষ্ঠানকে ২ কোটি ২০ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। একই ঘটনায় আরও দুই ব্যক্তি ও এক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা এবং একজন চীনা উদ্যোক্তা ও এক প্রতিষ্ঠানকে সতর্ক করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। তবে কারসাজিতে ওই চীনা উদ্যোক্তাকে ঘিরে সহযোগী গোষ্ঠীর সংশ্লিষ্টতা প্রমাণ পেয়েছে কমিশন।
বিশ্বস্ত সূত্র জানায়, লাভেলো আইসক্রিমের শেয়ার লেনদেনে কারসাজির দায়ে কমিশন লিজ ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রিজকে ১৪ লাখ ৬৬ হাজার, সিবিসি ক্যাপিটাল অ্যান্ড ইক্যুইটি ম্যানেজমেন্টকে ৭ লাখ ৫০ হাজার, এইচএম রুবাইয়াতকে ৬ লাখ ৮২ হাজার, শায়লা আক্তারকে ৪ লাখ ৯৪ হাজার, রাজন কুমার সাহাকে ২ লাখ, তাসলিমা কাননকে ৩৩ লাখ, মো. মাসুদ রানাকে ৩৫ লাখ ৫০ হাজার, আবু সাদাত মো. ফয়সালকে ৪৫ লাখ, আদিবা আজাদকে ১৪ লাখ ৮০ হাজার এবং মোহাম্মদ আরিফ হোসাইনকে ৫৫ লাখ ৭৫ হাজার টাকা জরিমানার সিদ্ধান্ত হয়েছে। সে হিসাবে মোট অর্থদণ্ডের পরিমাণ ২ কোটি ১৯ লাখ ৯৭ হাজার টাকা।
তবে শুধু আর্থিক জরিমানাতেই বিষয়টি শেষ হয়নি। কারসাজির দায়ে লাভেলো আইসক্রিমের চেয়ারম্যান শামীমা নার্গিস হক, তার নিকটতাত্মীয় মো. জাহেদুল হক ও পারিবারিক প্রতিষ্ঠান তৌফিকা ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেডের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করবে কমিশন। অন্যদিকে এ ঘটনায় ঝুয়াং লিফেং ও প্যারামাউন্ট ইন্স্যুরেন্সকে সতর্ক করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। ঝুয়াং লিফেং দেশের পোশাক ও আর্থিক খাতের একজন চীনা উদ্যোক্তা। তিনি চীনা নাগরিক হলেও দীর্ঘ তিন দশক বাংলাদেশে স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন। তার দুই প্রতিষ্ঠান লিজ ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রিজ ও সিবিসি ক্যাপিটাল অ্যান্ড ইক্যুইটি ম্যানেজমেন্ট কারসাজির সঙ্গে জড়িত।
বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আবুল কালাম আগামীর সময়কে জানিয়েছেন, লাভেলো আইসক্রিমের শেয়ার কারসাজির অভিযোগে কিছু ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা করা হয়েছে। তবে এখনো মামলা করা হয়নি। বিষয়টি পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নেবে আইন বিভাগ।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিএসইসির তদন্তে ২০২৪ সালের ২৯ জানুয়ারি থেকে ৩১ জুলাই পর্যন্ত সময়কালে লাভেলো আইসক্রিমের শেয়ার লেনদেনে সিকিউরিটিজ আইন লঙ্ঘন পাওয়া গেছে। ওই বছরের ২৯ জানুয়ারি কোম্পানিটির শেয়ারের দাম ছিল ২৯ টাকা ৮০ পয়সা। আর ১৫ জুলাই তা বেড়ে দাঁড়ায় ১০৬ টাকা ৪০ পয়সায়। ফলে সাড়ে পাঁচ মাসে শেয়ারটির দাম বেড়েছিল ৭৬ টাকা ৬০ পয়সা বা ২৫৭ শতাংশ।
অভিযুক্ত ব্যক্তিরা সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ অর্ডিন্যান্স, ১৯৬৯-এর ১৭(ই)(২) ও ১৭(ই)(৫) ধারা, ২০১০ সালের ১৪ জুলাই কমিশনের নোটিফিকেশন এবং সুবিধাভোগী ব্যবসা নিষিদ্ধকরণ বিধিমালা, ২০২২-এর বিধি ৫(১) লঙ্ঘন করে যোগসাজশের মাধ্যমে বিধিবহির্ভূতভাবে মুনাফা হাতিয়ে নিয়েছে, যা বিএসইসির তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আল-আমিন মনে করছেন, শুধু জরিমানা করলে তা আদায়ে দীর্ঘসূত্রতা সৃষ্টি হয়। তবে অভিযোগের ধরন ও অপরাধ বিবেচনায় সঠিক আইনি ব্যাখ্যা ও প্রক্রিয়া অনুসরণ করে মামলা করা হলে বাজারে বড় ধরনের আতঙ্ক সৃষ্টি হওয়ার কথা নয়। মামলা করার আগে কমিশনকে আইনি ভিত্তি ও সংশ্লিষ্ট ধারাগুলো যথাযথভাবে পর্যালোচনা করে এগোতে হবে। কিন্তু সিদ্ধান্তটি যদি হঠাৎ খেয়ালখুশিমতো বা আইনি ভিত্তি দুর্বল হয়, তাহলে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থার সংকট সৃষ্টি হতে পারে।
নিয়ন্ত্রক সংস্থা জানিয়েছে, বাজারে স্বচ্ছতা ফেরাতে তারা জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করছে। বিএসইসির এনফোর্সমেন্ট ডিভিশন এ বিষয়ে পরবর্তী ব্যবস্থা নেবে। এর আগে গত ১৮ আগস্ট ‘কারসাজির বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করা হবে’ শিরোনামে আগামীর সময় বিএসইসির চেয়ারম্যান মাসুদ খানের সাক্ষাৎকার প্রকাশ করে। তিনি জানিয়েছিলেন, কোনো ঘটনায় প্রশাসনিক বা দেওয়ানি ব্যবস্থা প্রয়োজন হলে জরিমানা করা হবে। কিন্তু গুরুতর বা উচ্চ প্রোফাইলের ঘটনার ক্ষেত্রে প্রয়োজন হলে ফৌজদারি মামলার দিকেও যাব। অবশেষে তা বাস্তবায়নের পথে।







