সংকটে এস্কয়ার নিট

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
শেয়ারবাজারে বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে ১৫০ কোটি টাকা উত্তোলন করে এখন চরম সংকটে পড়েছে প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) আগে টানা মুনাফা দেখালেও বাজারে আসার পর কোম্পানিটি প্রত্যাশিত ব্যবসায়িক সাফল্য পায়নি। উল্টো ধারাবাহিকভাবে তাদের মুনাফা, লভ্যাংশ ও শেয়ারদর কমায় সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। কোম্পানিটির ইস্যু ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে ছিল প্রাইম ফাইন্যান্স ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্ট।
ব্যবসা সম্প্রসারণের লক্ষ্যে ২০১৯ সালে শেয়ারবাজার থেকে এই বিপুল পরিমাণ অর্থ উত্তোলন করে এস্কয়ার নিট। প্রসপেক্টাসের তথ্য অনুযায়ী, উত্তোলিত অর্থের মধ্যে ১০০ কোটি ৪২ লাখ টাকা দিয়ে ভবন নির্মাণ, ৪৩ কোটি ১৪ লাখ টাকায় যন্ত্রপাতি কেনা এবং ৬ কোটি ৪৪ লাখ টাকা আইপিও প্রক্রিয়ার ব্যয় মেটানোর কথা জানানো হয়েছিল। সে সময় প্রতিটি শেয়ারের প্রান্তসীমা বা কাট-অফ মূল্য ৪৫ টাকা নির্ধারিত হলেও সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছে তা ৪০ টাকায় ইস্যু করা হয়। তবে শেয়ারবাজারে আসার পর কোম্পানিটির ব্যবসায়িক চিত্রে শুধুই অবনতি দেখা গেছে।
ব্যবসা সম্প্রসারণের লক্ষ্যে ২০১৯ সালে শেয়ারবাজার থেকে ১৫০ কোটি টাকা উত্তোলন করে কোম্পানিটি
আইপিওর আগের পাঁচ বছর কোম্পানিটির মুনাফা টানা বেড়েছিল। ২০১২ সালে তাদের নিট মুনাফা ছিল ১৭ কোটি ৬২ লাখ টাকা, যা পাঁচ বছরের ব্যবধানে ৭৭ শতাংশ বেড়ে ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ৩১ কোটি ২১ লাখ টাকায় দাঁড়ায়। কিন্তু শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার পর থেকেই এই মুনাফায় ধস নামে। সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তাদের নিট মুনাফা নেমে আসে মাত্র ৫ কোটি ৯৭ লাখ টাকায়। এমনকি চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে (জুলাই ২০২৫-মার্চ ২০২৬) কোম্পানিটি ১২ কোটি ৯৫ লাখ টাকা লোকসান গুনেছে। এ সময়ে তাদের শেয়ারপ্রতি লোকসান হয়েছে ৯৬ পয়সা, যেখানে আগের বছরের একই সময়ে মুনাফা ছিল ৬ কোটি ৬১ লাখ টাকা।
মুনাফা কমার সুস্পষ্ট প্রভাব পড়েছে লভ্যাংশেও। ২০২১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত তিন অর্থবছরে মুনাফা ধারাবাহিকভাবে কমার পাশাপাশি লভ্যাংশ দেওয়ার হারও তলানিতে ঠেকেছে। প্রথম তিন বছর শেয়ারহোল্ডারদের ১৫ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ দিলেও চার বছর ধরে তা ১০ শতাংশে আটকে আছে। সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরেও সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মাত্র ১০ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ দেওয়া হয়েছে। ৪৫ টাকার কাট-অফ মূল্য বিবেচনায় এই লভ্যাংশ মাত্র আড়াই শতাংশের সমান। অথচ ব্যাংকে স্থায়ী আমানত বা এফডিআর রাখলেও বর্তমানে মুনাফা পাওয়া যায় অন্তত ১০ শতাংশ।
ব্যবসায়িক মন্দার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এস্কয়ার নিটের ঋণের বোঝাও বিপজ্জনক হারে বেড়েছে। প্রসপেক্টাস অনুযায়ী, ২০১৭ সালের জুনে কোম্পানিটির মোট ঋণ ছিল ১৫৮ কোটি ৯১ লাখ টাকা। ২০২৬ সালের মার্চ মাস শেষে তা ৩৩৯ শতাংশ বেড়ে ৬৯৭ কোটি ৯৪ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে। ঋণের পাহাড় জমায় তাদের সুদজনিত ব্যয়ও বহুগুণ বেড়েছে। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে এই ব্যয় ১১ কোটি ৮৩ লাখ টাকা থাকলেও ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা ৬৯ কোটি ৫২ লাখ টাকায় গিয়ে ঠেকেছে।
কোম্পানি কর্তৃপক্ষের দেওয়া প্রতিশ্রুতি ও বাস্তব কাজের মধ্যে কোনো মিল না পাওয়ায় এবং ব্যবসায়িক ধারাবাহিক অবনতির কারণে শেয়ারের দামও এখন তলানিতে। বর্তমানে বাজারে প্রতিটি শেয়ার লেনদেন হচ্ছে মাত্র ২৪ টাকা ৭০ পয়সায়।
কোম্পানিটির সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) পরিচালক মিনহাজ মান্নান ইমন আগামীর সময়কে বলেছেন, বিগত দুই কমিশনের আমলে অসংখ্য ভুয়া কোম্পানিকে কৃত্রিম আর্থিক হিসাব দেখিয়ে আইপিওর মাধ্যমে অর্থ উত্তোলনের সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে। স্টক এক্সচেঞ্জের পক্ষ থেকে নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে এ বিষয়ে সতর্ক করা হলেও অধ্যাপক খায়রুল হোসেন ও শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলামের নেতৃত্বাধীন কমিশন তাতে কর্ণপাত করেনি।
এস্কয়ার নিটের সার্বিক ব্যবসায়িক অবনতি ও বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে কোম্পানি সচিব মনির হোসাইনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। গত ১৪ মে, ২১ মে এবং ৭ জুন তার কাছে আনুষ্ঠানিক মন্তব্য চাওয়া হলে তিনি দু-এক দিনের মধ্যে লিখিত বক্তব্য দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। তবে প্রতিবেদনটি লেখা পর্যন্ত কোম্পানির পক্ষ থেকে কোনো ধরনের তথ্য বা ব্যাখ্যা সরবরাহ করা হয়নি।




