হিসাব ফুলিয়ে কিউআইওতে রয়্যাল ফুটওয়্যার

সংগৃহীত ছবি
কোয়ালিফাইড ইনভেস্টর অফারের (কিউআইও) মাধ্যমে শেয়ারবাজারের এসএমই বোর্ড থেকে অর্থ সংগ্রহের প্রস্তুতি নিচ্ছে রয়্যাল ফুটওয়্যার লিমিটেড। তবে তাদের খসড়া প্রসপেকটাসে ভবন নির্মাণ, অবচয়, জমি উন্নয়ন ও শ্রমিক কল্যাণ তহবিলের হিসাবে ব্যাপক অসংগতি মিলেছে। এসব অনিয়মের মাধ্যমে কোম্পানিটি নিজেদের মোট সম্পদ, প্রকৃত মুনাফা, রিটেইনড আর্নিংস এবং উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগ কৃত্রিমভাবে বহুগুণ বেশি দেখিয়েছে। বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)।
রয়্যাল ফুটওয়্যারের খসড়া প্রসপেকটাস অনুযায়ী, ২০০৬ সালে ১ লাখ ২৩ হাজার ৭৫০ বর্গফুটের ভবন নির্মাণে (জমির মূল্য বাদে) ব্যয় দেখানো হয়েছে ১৪ কোটি ৯৪ লাখ ৯০ হাজার ৫৬০ টাকা, অর্থাৎ প্রতি বর্গফুট ১ হাজার ২০৮ টাকা। অথচ বর্তমান চড়া বাজারেও প্রায় ২ হাজার টাকায় প্রতি বর্গফুট নির্মাণ সম্ভব। কোম্পানির তথ্যমতেই, নির্মাণসামগ্রীর দাম বেশি থাকা সত্ত্বেও ২০০৮ সালের ভবনে প্রতি বর্গফুট ব্যয় ১ হাজার ২৫৪ টাকা এবং ২০২১ সালের ভবনে ১ হাজার ৭৫৪ টাকা দেখানো হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, প্রকৃত ব্যয়ের চেয়ে অনেক বেশি নির্মাণব্যয় দেখিয়ে উদ্যোক্তা-পরিচালকদের বিনিয়োগ কৃত্রিমভাবে বাড়িয়ে দেখানো হয়েছে।
নিয়ম অনুযায়ী স্থায়ী সম্পদের অবচয় চার্জ করলে মুনাফা কমে। কিন্তু রয়্যাল ফুটওয়্যার দীর্ঘদিন অবচয় কম দেখিয়ে সম্পদ ও মুনাফা বেশি দেখিয়েছে। ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ভবন খাতে তাদের মোট সম্পদ ১৯ কোটি ৫৪ লাখ টাকা। এর মধ্যে ২০০৬ সালের সাততলা ভবনের মূল্য ১৪ দশমিক ৯৫ কোটি, ২০০৮ সালের পাঁচতলা ভবনের মূল্য ১ দশমিক ৫৫ কোটি এবং ২০২১ সালের তিনতলা ভবনের মূল্য ২ দশমিক ৯৫ কোটি টাকা। অথচ বিশাল এ সম্পদের বিপরীতে কোম্পানিটি এ পর্যন্ত অবচয় চার্জ করেছে মাত্র ৩ কোটি ৬৬ লাখ টাকা।
কোম্পানির নির্ধারিত ৫ শতাংশ ক্রমহ্রাসমান পদ্ধতিতে হিসাব করলে, ২০০৬ সালের ভবনের ১৯ বছরে ৯ দশমিক ৩১ কোটি, ২০০৮ সালের ভবনের ১৭ বছরে শূন্য দশমিক ৯০ কোটি এবং ২০২১ সালের ভবনের ৪ বছরে শূন্য দশমিক ৫৫ কোটি টাকা অবচয় হয়। অর্থাৎ তিনটি ভবনের মোট অবচয় দাঁড়ায় ১০ দশমিক ৭৬ কোটি টাকা। কিন্তু কোম্পানিটি প্রায় ৭ দশমিক ১০ কোটি টাকা কম অবচয় দেখিয়ে একই পরিমাণ মুনাফা ও রিটেইনড আর্নিংস বেশি দেখিয়েছে।
এ বিষয়ে পেশাদার হিসাববিদ মনোয়ার হোসেন বলেছেন, ‘জমি ছাড়া যেকোনো স্থায়ী সম্পদ যখন থেকে ব্যবহার উপযোগী হবে, তখন থেকেই অবচয় চার্জ করতে হবে।’
কোম্পানিটি ১ কোটি ৫০ লাখ টাকায় ১২৯ দশমিক ১১ শতাংশ জমি কিনে এর উন্নয়ন ব্যয় দেখিয়েছে ৫৪ লাখ ৩০ হাজার ৭৮৪ টাকা। গণপূর্ত অধিদপ্তরের নির্ধারিত দর অনুযায়ী এই টাকায় প্রায় ৮ হাজার ৭৩১ ঘনমিটার মাটি ভরাট করা যায়, যা দিয়ে ওই পুরো জমি গড়ে সাড়ে ৫ ফুট গভীর পর্যন্ত ভরাট করা সম্ভব।
এই অস্বাভাবিক ব্যয়ের বিষয়ে শেয়ার ব্যবসায়ী ও ইউনিক ডেভেলপারের কর্ণধার হাবিবুর রহমান আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘২০০৬ সালে প্রতি বর্গফুট নির্মাণে ১ হাজার ২০৮ টাকা ব্যয় অস্বাভাবিক। জমির দাম দলিলের মাধ্যমে যাচাই করা যায় বলে শেয়ারবাজারে আসার আগে অনেক কোম্পানি ভুয়া জমি উন্নয়নের নামে সম্পদ, মূলধন ও পরিচালকদের বিনিয়োগ কৃত্রিমভাবে বাড়িয়ে দেখায়।’
রয়্যাল ফুটওয়্যারে শ্রম আইনেরও ব্যত্যয় ঘটেছে। ২০০৬ সাল থেকে নিট আয়ের ৫ শতাংশ দিয়ে শ্রমিক কল্যাণ তহবিল গঠন ও বিতরণ বাধ্যতামূলক। কিন্তু শেয়ারবাজারে আসতে কোম্পানিটি শুধু ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তহবিল গঠন করলেও তা বিতরণ করেনি। এতে শ্রমিকদের সঙ্গে প্রতারণাসহ মুনাফাও বেশি দেখানো হচ্ছে। বিশ্লেষণে দেখা যায়, তহবিল গঠন না করায় প্রায় ৩২ লাখ টাকা অতিরিক্ত মুনাফা দেখানো হয়েছে। এর মধ্যে ২০২০-২১ অর্থবছরে ৯ লাখ, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৮ লাখ এবং ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ১৫ লাখ টাকা বেশি মুনাফা দেখানো হয়। আগের বছরগুলোয়ও এমন অনিয়ম হয়েছে।
জানতে চাইলে রয়্যাল ফুটওয়্যারের কোম্পানি সচিব মো. আনোয়ার হোসাইন আগামীর সময়কে জানালেন, যথাযথ নিয়ম অনুসরণ করেই অবচয় নির্ধারণ করা হয়েছে।
তবে অবচয়ের বিস্তারিত হিসাব চাইলে তিনি তা দিতে পারেননি। ভবন নির্মাণ ব্যয়ের বিষয়ে তিনি বললেন, ‘ব্যয় সঠিকভাবে দেখানো হয়েছে এবং ২০২১ সালে নির্মিত ভবনের প্রতি বর্গফুট নির্মাণ ব্যয় আরও বেশি ছিল।’
সার্বিক বিষয়ে বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. আবুল কালাম আগামীর সময়কে বললেন, ‘কমিশন বিষয়গুলো খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।’




