প্রত্যাশিত উত্থান নেই
- চ্যালেঞ্জে নতুন কমিশন

রাজনৈতিক পটপরিবর্তন বা নিয়ন্ত্রক সংস্থার শীর্ষপদে নতুন মুখ— কোনো কিছুতেই দীর্ঘ মেয়াদে স্থিতিশীলতা পাচ্ছে না দেশের শেয়ারবাজার। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বছরের পর বছর ধরে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, কৃত্রিম কারসাজি ও নীতিগত অনিশ্চয়তার প্রভাবে সূচক এবং লেনদেনের ধারাবাহিক পতনের চিত্র ফুটে উঠেছে। আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ ভাগে বাজারে শুরু হওয়া রক্তক্ষরণ অন্তর্বর্তী সরকার পেরিয়ে নির্বাচন-পরবর্তী নতুন কমিশন গঠনের পরও একেবারেই থামেনি।
পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবের আগের সময়টায় দেশের শেয়ারবাজার এক চরম মন্দার মধ্য দিয়ে গেছে। ২০২৩ সালের শেষ দিকে ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ৬ হাজার ২৪৬ পয়েন্টে থাকলেও ২০২৪ সালের জুন মাসে তা ৫ হাজার ৩২৮ পয়েন্টে নেমে আসে। তখন দৈনিক গড় লেনদেন ৫০০-৭০০ কোটি টাকার মধ্যে থাকলেও অনেক দিনই তা ৩০০-৪০০ কোটিতে নামে। মূলত ফ্লোর প্রাইসের কৃত্রিম বাঁধন, দুর্বল কোম্পানির শেয়ারে কারসাজি ও প্রিমিয়াম হাতিয়ে নেওয়ার কারণেই বাজার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলেন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা।
জুলাই অভ্যুত্থানের পর আগস্টের গোড়ার দিকে পটপরিবর্তন হলে সাময়িকভাবে বাজারে মনস্তাত্ত্বিক ইতিবাচক জোয়ার সৃষ্টি হয়েছিল। ২০২৪ সালের ১১ আগস্ট ডিএসইতে দৈনিক লেনদেন রেকর্ড গড়ে প্রায় ২ হাজার ১০ কোটি টাকা ছাড়ায়। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের স্পষ্ট রাজনৈতিক রোডম্যাপের অভাব ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে সে উত্তাপ বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। তৎকালীন মাকসুদ কমিশনের কিছু নীতিনির্ধারণী পদক্ষেপে স্বচ্ছতা আনার চেষ্টা থাকলেও বাজারসংশ্লিষ্টদের অসন্তোষের কারণে আবারও টানা দরপতন শুরু হয়। ২০২৪ সালের শেষ চতুর্থাংশে দৈনিক গড় লেনদেন কমে ৩৫০-৪০০ কোটি টাকায় নেমে আসে এবং বছর শেষে ডিএসইএক্স সূচক দাঁড়ায় ৫ হাজার ২১৬ পয়েন্টে।
পরে ক্ষুদ্র থেকে প্রাতিষ্ঠানিক সব স্তরের বিনিয়োগকারীদের চোখ ছিল নির্বাচন-পরবর্তী স্থায়ী সরকার ও নতুন কমিশনের দিকে। সে অনুযায়ী বিএনপি সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর বিএসইসিতে মাসুদ কমিশন দায়িত্ব নেওয়ার পর শেয়ারবাজারে নতুন প্রাণচাঞ্চল্য দেখা যায়। ঝিমিয়ে পড়া বাজারে নতুন তহবিল আসতে শুরু করায় সূচক দ্রুত ঊর্ধ্বমুখী হতে থাকে। দীর্ঘদিন পর দুই সপ্তাহের ব্যবধানে ডিএসইর লেনদেন ১ হাজার ৬০০ কোটি টাকার সীমা অতিক্রম করে, যা বিনিয়োগকারীদের মনে আশা জাগায়।
তবে বর্তমান বাজার চিত্র বলছে, সেই আশার আলো এক মাস পার হওয়ার আগেই মলিন হতে শুরু করেছে। নতুন কমিশন দায়িত্ব নেওয়ার কিছুদিন পরই চেয়ারম্যানের বক্তব্য, সিদ্ধান্ত ও কার্যকারিতা নিয়ে বাজার জুড়ে সমালোচনা এবং বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। এর প্রভাব সরাসরি পড়েছে লেনদেনে। ১ হাজার ৬০০ কোটি ছাড়ানো দৈনিক লেনদেন দুই সপ্তাহের ব্যবধানে কমে ১ হাজার কোটি টাকার নিচে নেমে এসেছে।
বাজারের বর্তমান পরিস্থিতি ও দরপতনের কারণ নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে ভিন্নমত রয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্টিং বিভাগের অধ্যাপক আল-আমিনের মতে, শুধু ব্যক্তি বদলে বাজারের স্থায়ী পরিবর্তন আসে না। টেকসই গতি ফেরাতে শক্ত নিয়ন্ত্রক সংস্থা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও অর্থনীতির দৃঢ় ভিত্তি প্রয়োজন।
বর্তমান পতনকে প্রফিট বুকিং ও বৈশ্বিক প্রভাব হিসাবে উল্লেখ করে অধ্যাপক আল-আমিন বললেন, ‘নতুন সরকার ও কমিশন দায়িত্ব নেওয়ার পর বাজারে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা গিয়েছিল। তখন স্বাভাবিকভাবেই যারা আগে দরপতনের সময় কম দামে শেয়ার কিনেছিলেন, তারা ভালো দাম পেয়ে মুনাফা তুলে নিতে শেয়ার বিক্রি শুরু করেন। এতে বাজারে বড় বিক্রির চাপ সৃষ্টি হয়েছে, যা সূচকে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। অনেক বিনিয়োগকারীই মুনাফা নিয়ে সাইডলাইনে গিয়ে পর্যবেক্ষণ করছেন। এ ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির মতো বৈশ্বিক অস্থিরতাও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করছে।’
অন্যদিকে, ডিবিএ সভাপতি সাইফুল ইসলাম এই পতন নিয়ে উদ্বিগ্ন নন। তিনি একে শেয়ারবাজারের স্বাভাবিক মূল্য সমন্বয় হিসেবে বিবেচনা করছেন।
ডিবিএ সভাপতির ভাষ্য, রাজনৈতিক পরিস্থিতি স্থিতিশীল এবং অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের পথে থাকায় বাজারে বড় ধসের কোনো সংকট নেই। নতুন সরকার ও বিএসইসি কমিশনের আন্তরিক উদ্যোগ এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের ইতিবাচক পদক্ষেপে বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সুরক্ষিত হচ্ছে। দ্রুত বৃদ্ধির পর এই দরপতন কোনো সংকট নয়; বরং একটি স্বাভাবিক হিসাবনিকাশ মাত্র।




