রপ্তানি বাড়াতে আসছে রোডম্যাপ

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বিশ্ববাজারে এককভাবে তৈরি পোশাক খাতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে দেশের রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আনা ও তা টেকসই করতে পণ্য এবং বাজার— দুই ক্ষেত্রকেই বহুমুখীকরণ করার বিকল্প নেই। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা, এলডিসি উত্তরণ-পরবর্তী চ্যালেঞ্জ এবং শুল্কমুক্ত সুবিধা হারিয়ে যাওয়া রুখতে নির্দিষ্ট পণ্য ও দেশের ওপর নির্ভরতা থেকে বেরিয়ে আসার তাগিদ দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা। এই পটভূমিতে পণ্য ও বাজারের সমন্বিত বহুমুখীকরণের লক্ষ্য নিয়ে কৌশলগত পদক্ষেপ জোরদার করেছে সরকার।
দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয়ের সিংহভাগই আসছে একক খাত— তৈরি পোশাক থেকে। অন্যদিকে, বাজার হিসেবে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার হাতেগোনা কয়েকটি দেশের ওপরই অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা রয়েছে। এ ধরনের একমুখী কাঠামোর কারণে বৈশ্বিক কোনো সংকটে পুরো অর্থনীতি ঝুঁকিতে পড়ে। তবে এ সংকট থেকে উত্তরণের বড় সম্ভাবনাও রয়েছে। বর্তমানে বিশ্ববাজারে তৈরি পোশাকের পাশাপাশি বাংলাদেশের ওষুধ, ইলেকট্রনিকস, প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্য, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, হালকা প্রকৌশল এবং তথ্যপ্রযুক্তি খাতের বিশাল বাজার তৈরির সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। পণ্যের এই বৈচিত্র্য আনার পাশাপাশি যদি নতুন নতুন বাণিজ্যিক গন্তব্য বা বাজারে প্রবেশ নিশ্চিত করা যায়, তবেই দেশে একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও দীর্ঘমেয়াদি রপ্তানি ভিত্তি গড়ে তোলা সম্ভব হবে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) সর্বশেষ তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বাংলাদেশের রপ্তানি খাত মারাত্মকভাবে একক পণ্য এবং নির্দিষ্ট ভৌগোলিক বাজারের ওপর নির্ভরশীল হয়ে আছে। বিদায়ী অর্থবছরে দেশের মোট ৪৮ দশমিক ২৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানির বিপরীতে প্রায় ৮০ শতাংশের বেশি (৩৮ দশমিক ৫৩ বিলিয়ন ডলার) আয় এসেছে শুধু একক তৈরি পোশাক খাত থেকে। অন্যদিকে, পোশাকের বাইরে চামড়া, কৃষিপ্রক্রিয়াজাত পণ্য, পাট এবং ওষুধের মতো সম্ভাবনাময় খাতগুলোর যৌথ অবদান এখনো ১৫ শতাংশের বেশি অতিক্রম করতে পারেনি।
একইভাবে ভৌগোলিক গন্তব্যের ক্ষেত্রেও তীব্র একমুখী প্রবণতা স্পষ্ট; মোট রপ্তানি আয়ের অর্ধেকের বেশি আসে শুধু ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলো থেকে এবং একক দেশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসে প্রায় ২০ শতাংশ রপ্তানি আয়। এর ফলে ইউরোপ-আমেরিকার কোনো অঞ্চলে অর্থনৈতিক মন্দা বা নীতিগত পরিবর্তন ঘটলেই পুরো দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়ার আশঙ্কা থাকে।
পণ্য ও বাজার বহুমুখীকরণের এই প্রয়োজনীয়তাকে সামনে রেখেই সরকার বিশ্ব জুড়ে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ১৮টি বাণিজ্যিক গন্তব্যের জন্য পৃথক ‘দেশভিত্তিক রপ্তানি কৌশল’ প্রণয়ন করছে। এসব বাজারে বিদ্যমান সম্ভাবনা, বাণিজ্যিক বাধা, প্রতিযোগী দেশের অবস্থান এবং বাংলাদেশের করণীয় বিস্তারিত বিশ্লেষণ করে প্রস্তুত করা হচ্ছে বাস্তবায়নযোগ্য বিশেষ কর্মপরিকল্পনা।
এ বিষয়ে গতকাল সোমবার সচিবালয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে ‘বাংলাদেশ এক্সপোর্ট ডাইভারসিফিকেশন স্ট্র্যাটেজি: প্রোডাক্ট অ্যান্ড মার্কেট ডাইভারসিফিকেশন অ্যাক্রস ১৮ কি ট্রেডিং ডেস্টিনেশনস’ শীর্ষক এক কর্মশালার আয়োজন করা হয়। কর্মশালায় সভাপতিত্ব করেন বাণিজ্য সচিব মো. আতাউর রহমান খান।
সভাপতির বক্তব্যে বাণিজ্য সচিব মো. আতাউর রহমান খান বললেন, ‘বাংলাদেশকে একটি টেকসই রপ্তানি কাঠামোর ওপর দাঁড় করাতে পণ্য ও বাজার বহুমুখীকরণ— দুই ক্ষেত্রকেই সমান গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এজন্য বিশ্ব জুড়ে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ১৮টি বাজার বেছে নিয়ে দেশভিত্তিক বিস্তারিত প্রোফাইল ও বাস্তবায়নযোগ্য কৌশল প্রস্তুত করা হচ্ছে।’
তিনি আরও জানালেন, বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশের বাণিজ্যিক উইংগুলো থেকে প্রাপ্ত বাস্তব চিত্র, সম্ভাবনাময় পণ্য ও বিদ্যমান বাধার তথ্যের ভিত্তিতে একটি বিশেষ ম্যাট্রিক্স অনুসরণ করে এ কর্মপরিকল্পনা তৈরি করা হচ্ছে।
কর্মশালায় সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. মুস্তাফিজুর রহমান বলেছেন, ‘রপ্তানি বহুমুখীকরণে পণ্যের পাশাপাশি সেবা খাতকে সমান গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। বিশেষ করে তথ্যপ্রযুক্তি, দক্ষতাভিত্তিক অর্থনীতি এবং ফ্রিল্যান্সিং খাতের বিকাশে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।’



