এলডিসি উত্তরণের পরও কমে না জলবায়ু ঝুঁকি, অভিযোজন অর্থায়ন চালু রাখার দাবি

আয়োজিত অনুষ্ঠানে অতিথিরা। ছবি : সংগৃহীত
স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণ ঘটলেও জলবায়ু ঝুঁকি কমে না। তাই উত্তরণের পরও অভিযোজন অর্থায়ন নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা। তাদের মতে, উন্নয়ন অগ্রগতিকে অভিযোজন সহায়তা প্রত্যাহারের মানদণ্ড করা যাবে না।
আজ শনিবার রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ দাবি জানানো হয়। আগামী ৯ থেকে ২০ নভেম্বর তুরস্কের আনাতোলিয়ায় অনুষ্ঠেয় জাতিসংঘের ৩১তম জলবায়ু সম্মেলন (কপ-৩১) সামনে রেখে এ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।
সেন্টার ফর পার্টিসিপেটরি রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (সিপিআরডি), ক্লাইমেট জাস্টিস অ্যালায়েন্স-বাংলাদেশ, উপকূল ও সুন্দরবন সুরক্ষা আন্দোলন, ক্লাইমেট অ্যাকশন ফোরাম, শরীয়তপুর ডেভেলপমেন্ট সোসাইটি, সচেতন সংস্থাসহ আরও কয়েকটি সংগঠন যৌথভাবে এর আয়োজন করে।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, বাংলাদেশ, ভুটান ও নেপালের ভৌগোলিক ও আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপট ভিন্ন হলেও হিমালয় পর্বতমালা, অভিন্ন নদী ব্যবস্থা ও ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে তিন দেশই জলবায়ু পরিবর্তনজনিত অভিন্ন বিপদের মুখোমুখি। বাড়তে থাকা এ ঝুঁকি মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় নীতি ও কর্মসূচি নেওয়া, উন্নত বিশ্ব থেকে ন্যায়সংগত জলবায়ু অর্থ ও প্রযুক্তি পাওয়া এবং বিশ্বমঞ্চে তিন দেশের বিপন্নতার কথা তুলে ধরতে যৌথ পদক্ষেপ ও বক্তব্যের বিকল্প নেই।
‘এ ঝুঁকি অঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকা, অবকাঠামো, জলবায়ু-সংবেদনশীল অর্থনৈতিক খাত ও সরকারি অর্থব্যবস্থাকেও হুমকির মুখে ফেলছে’, সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়।
সিপিআরডির প্রধান নির্বাহী ও ক্লাইমেট জাস্টিস অ্যালায়েন্স-বাংলাদেশের সমন্বয়ক মো. শামসুদ্দোহা বলেন, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও এলডিসি উত্তরণ জলবায়ু ঝুঁকি কমাবে না, জলবায়ু অভিঘাত মোকাবিলার সক্ষমতাও বাড়াবে না। ভুটান ইতোমধ্যে এলডিসি থেকে উত্তীর্ণ হয়েছে, বাংলাদেশ ও নেপাল নিজ নিজ উত্তরণ প্রক্রিয়ায় আছে। তবু তিন দেশই উল্লেখযোগ্য ঝুঁকির মুখে।
তিনি কপ-৩১ ও পরবর্তী সময়ে তিন দেশের সরকার ও নাগরিক সমাজের মধ্যে সম্মিলিত অ্যাডভোকেসি এবং সমন্বিত অভিযোজন কার্যক্রম জোরদারের আহ্বান জানান।
মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিআরডির প্রোগ্রাম ম্যানেজার সুমাইয়া বিনতে আনোয়ার। তিনি প্রচলিত উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের বাইরে দীর্ঘস্থায়ী ও ভবিষ্যৎমুখী জলবায়ু ঝুঁকিপ্রবণতাকে স্বীকৃতি দিতে আন্তর্জাতিক অভিযোজন ও জলবায়ু অর্থায়ন কাঠামোয় মৌলিক পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন।
শরীয়তপুর ডেভেলপমেন্ট সোসাইটির নির্বাহী পরিচালক রাবেয়া বেগম বলেন, এলডিসি উত্তরণকে কোনোভাবেই জলবায়ু ঝুঁকিপ্রবণতা থেকে উত্তরণ হিসেবে দেখা যাবে না। তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, উন্নত দেশ ও বহুপাক্ষিক জলবায়ু অর্থায়ন প্রতিষ্ঠানের প্রতি আহ্বান জানান, যেন তারা উন্নয়ন অগ্রগতিকে অভিযোজন সহায়তা প্রত্যাহারের মানদণ্ড না করে।
ক্লাইমেট অ্যাকশন ফোরামের সভাপতি আমিনুর রসুল বলেন, জলবায়ু ঝুঁকিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর অভিযোজনের প্রয়োজনীয়তা ও বেঁচে থাকার অধিকার উন্নত দেশগুলোর অর্থনৈতিক স্বার্থের অধীন হতে পারে না।
উপকূল ও সুন্দরবন সুরক্ষা আন্দোলনের সমন্বয়ক নিখিল চন্দ্র অভিযোজন ও প্রশমনকে জলবায়ু কার্যক্রমের পরিপূরক দুই স্তম্ভ হিসেবে বিবেচনার ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, অভিযোজনের জন্য পর্যাপ্ত আন্তর্জাতিক সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে, যা উন্নত দেশগুলোর ঐতিহাসিক দায়িত্ব।
ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাবেক সভাপতি রফিকুল ইসলাম আজাদ অর্থনৈতিক উত্তরণকে জলবায়ু ঝুঁকির অবস্থান থেকে আলাদাভাবে দেখতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানান। একই সঙ্গে তিনি তিন দেশকে কপ সম্মেলনে অনুদানভিত্তিক অভিযোজন অর্থায়নে আপসহীন অবস্থান ধরে রাখার আহ্বান জানান।
শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকুয়াকালচার বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মীর মোহাম্মদ আলী আঞ্চলিক অ্যাডভোকেসি এবং সরকার ও নাগরিক সমাজের মধ্যে শক্তিশালী সমন্বয়ের গুরুত্ব তুলে ধরেন।
অনুষ্ঠানে সচেতন ফাউন্ডেশনের হাবিবুর রহমান, রিভারাইন পিপলের মো. আনোয়ার হোসেন, সিপিআরডির প্রোগ্রাম ম্যানেজার শেখ নূর আতায়া রাব্বিসহ বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধি, জলবায়ু ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ এবং মানবাধিকারকর্মীরা অংশ নেন।
সংবাদ সম্মেলনে কপ-৩১ ও পরবর্তী সময়ে তিন দেশের স্বার্থ রক্ষায় নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে তিন দফা দাবি তোলা হয়।
প্রথমত, অভিযোজনকে জলবায়ু কার্যক্রমের কেন্দ্রীয় স্তম্ভ হিসেবে বিবেচনা করে ঝুঁকিপ্রবণতা, ন্যায্যতা ও মানবাধিকারের ভিত্তিতে অগ্রাধিকার ঠিক করতে হবে এবং এ অঞ্চলের আন্তঃসীমান্ত ও ক্রমবর্ধমান ঝুঁকিকে যথাযথ স্বীকৃতি দিতে হবে।
দ্বিতীয়ত, এলডিসি উত্তরণের পরও সহজ শর্তে অভিযোজন অর্থায়ন অব্যাহত রাখতে একটি টেকসই অর্থায়ন ব্যবস্থা গড়তে হবে।
তৃতীয়ত, বাংলাদেশ, ভুটান ও নেপালের মধ্যে একটি অভিন্ন আঞ্চলিক অ্যাডভোকেসি ও আলোচনাভিত্তিক কর্মসূচি চালু করতে হবে, যাতে অভিযোজন কার্যক্রমের বাস্তবায়ন জোরদার এবং জলবায়ু অর্থায়নে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত হয়।



