সাক্ষাৎকার
মাসে ২৫০ জন নতুন মার্চেন্ট যুক্ত করার কাজ চলছে

রিয়াজুল ইসলাম, ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক, এবি ব্যাংক
প্রশ্ন: একটি জাতীয় কিউআর চালুর ফলে গ্রাহক, মার্চেন্ট ও ব্যাংক— এই তিন পক্ষের সবচেয়ে বড় লাভ কী হবে?
উত্তর: জাতীয় কিউআর বা বাংলা কিউআর চালুর ফলে গ্রাহক, মার্চেন্ট ও ব্যাংক একটি একক, আন্তঃপরিচালনযোগ্য এবং স্বল্পব্যয়ী পেমেন্ট ইকোসিস্টেমে যুক্ত হচ্ছে। গ্রাহকের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, যেকোনো ব্যাংক বা এমএফএস অ্যাপ দিয়ে একটিমাত্র কিউআর স্ক্যান করেই মূল্য পরিশোধ করা যাবে, আলাদা কিউআর খোঁজার প্রয়োজন হবে না। মার্চেন্টরা একটি কিউআর দিয়েই সব গ্রাহকের কাছ থেকে অর্থ নিতে পারবেন। ফলে একাধিক হিসাব সংরক্ষণ ও POS যন্ত্রের মতো ব্যয়বহুল অবকাঠামো ছাড়াই ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ডিজিটাল পেমেন্ট গ্রহণ সহজ হবে। পাশাপাশি ব্যাংক নিজস্ব গ্রাহকসংখ্যার বাইরে বৃহত্তর জাতীয় নেটওয়ার্কে অংশ নেওয়ার মাধ্যমে ডিজিটাল লেনদেন, আমানত প্রবাহ বৃদ্ধি এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ভবিষ্যৎ ঋণসুবিধা তৈরির সুযোগ পাবে।
প্রশ্ন: বাংলা কিউআর চালুর ফলে ব্যাংকগুলোর ব্যবসায়িক মডেল ও প্রতিযোগিতার ধরন কীভাবে বদলাবে?
উত্তর: বাংলা কিউআর চালুর ফলে ব্যাংকগুলোর প্রতিযোগিতার ধরন কিউআর কোডের মালিকানা থেকে সরে সেবার মান, গ্রাহক অভিজ্ঞতা এবং মার্চেন্ট ভ্যালু প্রোপজিশনের দিকে বদলে যাবে। আগে নিজস্ব কিউআর নেটওয়ার্ক সুবিধা দিলেও আন্তঃপরিচালনযোগ্য একক কিউআর দিয়ে সব প্রতিষ্ঠানের পেমেন্ট নেওয়ায় শুধু কিউআর বিতরণ যথেষ্ট নয়। ফলে দ্রুত অনবোর্ডিং, নিরাপদ লেনদেন, দ্রুত অর্থ জমা এবং কার্যকর রিকনসিলিয়েশনের মতো সেবায় প্রতিযোগিতা বাড়বে। এ ছাড়া লেনদেনের তথ্য ব্যবহার করে ব্যবসায়ীদের আমানত ও ডিজিটাল ঋণ দেওয়া প্রতিযোগিতার ভিত্তি হবে। প্রায় ৯ লাখ ৬৩ হাজার মার্চেন্ট ও ব্যাপক লেনদেন প্রমাণ করে এটি জাতীয় অবকাঠামো। ভবিষ্যতে শুধু কিউআর প্রদানকারী নয়; বরং পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল ব্যবসায়িক সম্পর্ক স্থাপনকারী ব্যাংকগুলোই সফল হবে।
ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের মূলধন ঋণ ও ব্যাংক সেবার উদ্যোগ নেওয়া হবে
রিয়াজুল ইসলাম
ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক
এবি ব্যাংক
প্রশ্ন: একটি কিউআর দিয়েই কি সব ব্যাংক, এমএফএস ও পেমেন্ট সেবাদাতার মাধ্যমে অর্থ গ্রহণ করা সম্ভব হবে? এর বাস্তবায়নে কোনো সীমাবদ্ধতা আছে কি?
উত্তর: বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশিকা অনুযায়ী বাংলা কিউআর একটি ওপেন-লুপ আন্তঃপরিচালনযোগ্য জাতীয় স্ট্যান্ডার্ড। এর উদ্দেশ্য হলো একটিমাত্র কিউআর দিয়ে ব্যাংক, এমএফএস ও পেমেন্ট সেবাদাতার গ্রাহকদের বিভিন্ন কার্ড বা ই-ওয়ালেটের মাধ্যমে অর্থ গ্রহণ করা। তবে বাস্তবে ‘সব প্রতিষ্ঠান’ বলতে শুধু নেটওয়ার্কে প্রযুক্তিগতভাবে সংযুক্ত, অনুমোদিত ও লেনদেনে সক্ষম প্রতিষ্ঠানগুলোকেই বোঝায়। এর বাস্তবায়নে কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। যেমন প্রতিষ্ঠানের প্রযুক্তিগত সংযোগের অসম্পূর্ণতা, গ্রাহকের অ্যাপে ফিচারটি সক্রিয় না থাকা, লেনদেন সীমার পার্থক্য, ইন্টারনেট সমস্যা, সাময়িক সিস্টেম ডাউনটাইম এবং নির্দিষ্ট পলিসির ভিন্নতা। তবে এগুলো মূল নকশার সমস্যা নয়; বরং বাস্তবায়নের বিষয়। সব প্রতিষ্ঠান পূর্ণাঙ্গভাবে যুক্ত হলে এটি সত্যিকার অর্থেই সর্বজনীন পেমেন্ট মাধ্যম হবে।
প্রশ্ন: বাংলা কিউআর নগদ লেনদেন কমাতে এবং ক্যাশলেস অর্থনীতি গড়তে কতটা কার্যকর হবে বলে মনে করেন?
উত্তর: বাংলা কিউআর নগদ অর্থের ওপর নির্ভরতা কমাতে এবং ক্যাশলেস অর্থনীতি গড়তে অত্যন্ত কার্যকর, কারণ এটি ব্যয়বহুল POS ছাড়াই মুদি দোকান, কাঁচাবাজার, ফার্মেসিসহ দৈনন্দিন ক্ষুদ্র লেনদেনে ডিজিটাল পেমেন্ট পৌঁছে দেয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের পেমেন্ট-সংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে মোট লেনদেন মূল্যের প্রায় ৬৭ দশমিক ২ শতাংশ নগদভিত্তিক ছিল এবং ডিজিটাল লেনদেনের অংশ ছিল প্রায় ৩২ শতাংশ ৮ শতাংশ। তবে ২০২৪ সালে ডিজিটাল লেনদেনের অংশ প্রায় ২৮ শতাংশ ছিল— অর্থাৎ অগ্রগতি হচ্ছে, যদিও আরও দীর্ঘ পথ অতিক্রম করতে হবে।
তবে শুধু কিউআর বিতরণ করলেই নগদ ব্যবহার কমবে না; প্রয়োজন গ্রাহক ও মার্চেন্টের নিয়মিত ব্যবহার, নির্ভরযোগ্য সেটেলমেন্ট, আস্থা এবং যৌক্তিক প্রণোদনা। বাংলাদেশ ব্যাংক কিউআর সম্প্রসারণ, অ্যাপে দৃশ্যমানতা বৃদ্ধি এবং খুচরা হিসাবধারীদের আওতায় আনার যেসব নির্দেশনা দিয়েছে, তা মানুষের নগদ থেকে ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবহারের আচরণগত পরিবর্তন ত্বরান্বিত করবে।
প্রশ্ন: আপনার ব্যাংকের কতজন মার্চেন্টকে বাংলা কিউআরের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে? এ বিষয়ে নির্দিষ্ট লক্ষ্য কী?
উত্তর: ২০২৬ সালের ২ জুন পর্যন্ত এবি ব্যাংক এরই মধ্যে প্রায় ১৬ হাজার ৯০০ মার্চেন্টকে বাংলা কিউআরের আওতায় এনেছে। আমাদের মূল লক্ষ্য শুধু সংখ্যা বাড়ানো নয়; বরং লেনদেনের হার ও পরিমাণ বৃদ্ধি করা। সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য হিসেবে প্রতি মাসে অন্তত ২৫০ জন নতুন মার্চেন্ট যুক্ত করা, সব শাখা-উপশাখাকে সক্রিয় করা এবং ট্রেড লাইসেন্সধারী খুচরা হিসাবধারীদের কিউআরের আওতায় আনার কাজ চলছে। আমাদের মতে, প্রকৃত সফলতা শুধু কিউআর বিতরণে নয়; বরং মার্চেন্টদের নিয়মিত লেনদেন গ্রহণ, নতুন গ্রাহকের ডিজিটাল পেমেন্ট, নগদনির্ভরতা হ্রাস এবং ব্যাংকিং সেবায় ব্যবসায়ীদের নিবিড় সংযুক্তির ওপরই নির্ভর করবে।
প্রশ্ন: বাংলা কিউআরের মাধ্যমে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, গ্রামীণ দোকানদার ও অনানুষ্ঠানিক খাতের ব্যবসায়ীদের কীভাবে যুক্ত করা হবে?
উত্তর: বাংলা কিউআরের মাধ্যমে ক্ষুদ্র, গ্রামীণ ও অনানুষ্ঠানিক খাতের ব্যবসাগুলোকে আনুষ্ঠানিক ডিজিটাল আর্থিক ব্যবস্থায় যুক্ত করা হবে। ব্যয়বহুল POS যন্ত্রের বদলে সাশ্রয়ী কিউআর স্টিকার ব্যবহার করেই সহজে পেমেন্ট নেওয়া যাবে। এসব ব্যবসায়ীকে যুক্ত করতে কয়েকটি সুনির্দিষ্ট পদ্ধতিতে কাজ করা হবে। প্রথমে শাখা ও উপশাখার মাধ্যমে নিজ এলাকার বাজার ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের চিহ্নিত করে মার্চেন্ট ম্যাপিং করা হবে। এরপর বাংলাদেশ ব্যাংক ও বিএফআইইউর নিয়মানুসারে, ঝুঁকি বিবেচনা করে মার্চেন্ট অন্তর্ভুক্তি প্রক্রিয়া সহজ করা হবে। পাশাপাশি পেমেন্ট যাচাই ও হিসাব মেলানোর বিষয়ে ব্যবসায়ীদের মাঠপর্যায়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। ব্যবসায়ীদের তারল্য নিশ্চিতে পেমেন্টের অর্থ দ্রুত হিসাবে জমার ব্যবস্থা করা হবে। সর্বোপরি, নিয়মিত কিউআর লেনদেনের তথ্যের ভিত্তিতে ভবিষ্যতে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের কার্যকরী মূলধন, ঋণ ও অন্যান্য ব্যাংকিং সেবা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
প্রশ্ন: আগে নিজস্ব কিউআর তৈরিতে ব্যাংকগুলোর যে বিনিয়োগ হয়েছে, সেটির ভবিষ্যৎ কী? সেগুলো কি পুরোপুরি অকার্যকর হয়ে যাবে?
উত্তর: নিজস্ব কিউআর তৈরিতে ব্যাংকগুলোর আগের বিনিয়োগ পুরোপুরি অকার্যকর হবে না। মার্চেন্ট অনবোর্ডিং, মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন, ট্রানজেকশন প্রসেসিং, সেটেলমেন্ট, জালিয়াতি প্রতিরোধ ও গ্রাহকসেবার মতো অবকাঠামো বাংলা কিউআর ব্যবস্থায়ও কাজে লাগবে। মূলত পরিবর্তন হচ্ছে কিউআরের স্ট্যান্ডার্ড ও ইন্টারঅপারেবিলিটি লেয়ারে। ব্যাংকের ব্যবসায়িক সম্পর্ক ও প্রসেস আগের মতোই থাকবে। তাই এই বিনিয়োগকে অকার্যকর না বলে জাতীয় প্ল্যাটফর্মে যুক্ত হওয়ার প্রস্তুত ভিত্তি বলা যায়।




