তাঁতশিল্প ভাগ্য বদলাচ্ছে চর শৌলমারীর মানুষের

কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলার চর শৌলমারীতে বিলুপ্তপ্রায় তাঁতশিল্পে নতুন করে প্রাণ ফিরেছে। দীর্ঘ দুই দশক পর এই শিল্পের হাত ধরেই ভাগ্য বদলে গেছে এই ইউনিয়নের হাজারো মানুষের। ঘরে বসে তাঁতের শাড়ি বুনে পরিবারগুলোতে শুধু আর্থিক সচ্ছলতাই আসেনি, এর ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে সমাজেও। অভাব দূর হওয়ায় এলাকায় শিক্ষার হার বেড়েছে এবং উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে বাল্যবিয়ে।
সরেজমিন চর শৌলমারী ঘুরে দেখা যায়, ইউনিয়ন জুড়েই চলছে তাঁতের বিশাল কর্মযজ্ঞ। প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই বসানো হয়েছে তাঁত। আঙিনায় শুকানো হচ্ছে সারি সারি রঙিন সুতা। কেউ তাঁতে বসে নিপুণ হাতে শাড়ি বুনছেন, কোথাও চলছে সুতায় রঙ করার কাজ। প্রতিটি বাড়িই যেন একেকটি ছোট কারখানা।
চর শৌলমারীতে গিয়ে কথা হয় তাঁতি আমির চানের সঙ্গে। তখন স্ত্রীসহ শাড়ি বোনার কাজ করছিলেন তিনি। আগামীর সময়কে আমির চান বললেন, ‘আগে দিনমজুরি করতাম। নতুন করে তাঁতের কাজ আসায় খুব সুবিধা হয়েছে। এখন স্বামী-স্ত্রী মিলে বাড়িতে বসেই কাজ করি। পাশাপাশি সাংসারিক কাজও করি। আয়-রোজগার বাড়ছে। আগের চেয়ে ভালো আছি।’
স্থানীয়দের ভাষ্য, প্রায় দেড়শ বছর আগে রৌমারী উপজেলায় তাঁতশিল্পের ব্যাপক প্রসার ছিল। একসময় সেখানে ২০ হাজার তাঁতি পরিবার থাকলেও সুতার দাম বৃদ্ধি ও সঠিক বাজারের অভাবে ধীরে ধীরে তা কমতে থাকে। ২০০০ সালের পর কয়েকটি পরিবার ধরে রেখেছিল বাপ-দাদার এই পেশা। তবে করোনা-পরবর্তী সময়ে অবহেলিত এই জনপদে সিলেটের মণিপুরি শাড়ির নকশা কাজে লাগিয়ে ফের ঘুরতে শুরু করে তাঁতশিল্পের চাকা।
তাঁতশিল্পের প্রসারে গ্রামীণ নারীদের ক্ষমতায়ন ও আর্থ-সামাজিক দৃশ্যপটও বদলে গেছে। তাঁতের কাজ করা রশিদা খাতুন বললেন, ‘আগে তো সংসারে অনেক অভাব ছিল। এখন স্বামী-স্ত্রী মিলে কাজ করি, ছেলেমেয়েরাও সময় পেলে হাত লাগায়। নিজেরা আয় করায় ছেলেমেয়েদের ঠিকমতো স্কুলে পাঠাতে পারছি। আমার মতো আরও অনেকেই এই কাজ করছে। তাই আগের মতো অল্প বয়সে মেয়েদের বিয়েও দিচ্ছে না কেউ।’
নারী শ্রমিকের এ কথার বাস্তব প্রমাণ মেলে চর শৌলমারী বহুমুখী উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. খলিলুর রহমানের বক্তব্যে। আগামীর সময়কে তিনি বললেন, ‘বাড়ি বাড়ি তাঁত হওয়ায় বাবা-মায়ের আয় বাড়ছে। আর্থিক সচ্ছলতার কারণে অভিভাবকরা এখন সন্তানদের পড়াশোনার খরচ সহজেই মেটাতে পারছেন। আগের তুলনায় আমার স্কুলের ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা বেড়েছে। বাল্যবিয়ে অনেকটাই কমে গেছে।’
চর শৌলমারী ইউনিয়নে তাঁতশিল্পের প্রসারে অন্যতম ভূমিকা রেখেছেন মণিপুরি উইভিং ফ্যাক্টরির স্বত্বাধিকারী এম এইচ রুবেল। মণিপুরি শাড়ির ব্যাপক চাহিদা থাকায় তিনি সেখানেও ফ্যাক্টরি দিয়েছেন। পাশাপাশি অন্য মহাজনদের শাড়িও তিনি কিনছেন। তার ভাষ্য, ‘আমার ফ্যাক্টরিতে ৪০০ মানুষ কাজ করে। এর বাইরে আরও অনেকের শাড়ি আমি কিনি। এই এলাকার মানুষ এখন ঘরে বসে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা আয় করছেন।’
বর্তমানে চর শৌলমারীতে ছোট-বড় ১০-১৫টি প্রতিষ্ঠানের অধীনে প্রায় ১ হাজার ৫০০ হস্তচালিত তাঁত চলছে। বুননের কাজে সরাসরি যুক্ত আছেন অন্তত ৫ হাজার মানুষ। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কাজ মিলিয়ে এলাকায় তৈরি হয়েছে প্রায় ১০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান। একটি শাড়ি তৈরি করতে সময় লাগে সাত-আট ঘণ্টা। শাড়িভেদে মজুরি পাওয়া যায় ৭০০ থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত।
বিপুল সম্ভাবনাময় এই কর্মযজ্ঞকে এগিয়ে নিতে কাজ করছে বাংলাদেশ তাঁত বোর্ড। রৌমারী সাব-বেসিক সেন্টারের দায়িত্বপ্রাপ্ত লিয়াজোঁ অফিসার মো. সাইদুজ্জামান আগামীর সময়কে বললেন, ‘আমরা তাঁতের সংখ্যার ওপর ভিত্তি করে সরকারিভাবে তাঁতপ্রতি ৩০ হাজার টাকা করে সহজ শর্তে ঋণ দিচ্ছি। প্রান্তিক তাঁতিদের জীবনমান উন্নয়ন ও ঐতিহ্যবাহী এই শিল্পের প্রসারে আমাদের সব ধরনের সহায়তা অব্যাহত থাকবে।’
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও সবার সম্মিলিত উদ্যোগে চর শৌলমারীর এই তাঁতপল্লী দেশের গ্রামীণ অর্থনীতিতে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে।



