সাক্ষাৎকার
হালাল অর্থনীতি ও এফটিএতে জোর দিতে হবে

মো. আনোয়ার শহীদ, সভাপতি, বিএমসিসিআই
বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে বাণিজ্যিক সাফল্যে রূপান্তরের এক ঐতিহাসিক সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। বর্তমানে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ৪ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছালেও বাংলাদেশ মাত্র ৩৫০-৪০০ মিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করে বিশাল ঘাটতিতে রয়েছে। এই বৈষম্য কমাতে হালাল ইকোসিস্টেমের বিকাশ, মুক্তবাণিজ্য চুক্তি, শ্রমঘন শিল্পে মালয়েশিয়ার সরাসরি বিনিয়োগ এবং হাই-টেক খাতে দক্ষ জনশক্তি রপ্তানি জরুরি। এ বিষয়ে আগামীর সময়ের সঙ্গে কথা বলেছেন বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (বিএমসিসিআই) সভাপতি মো. আনোয়ার শহীদ। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সিনিয়র রিপোর্টার আল আমিন রুবেল
প্রশ্ন: বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যকার সাম্প্রতিক কূটনৈতিক ও দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের চিত্রটি কেমন দেখছেন?
আনোয়ার শহীদ: বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার চমৎকার কূটনৈতিক ও ভ্রাতৃত্বপূর্ণ সম্পর্কের ওপর ভিত্তি করে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছানোর বিশাল সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। সম্প্রতি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর কুয়ালালামপুর সফর এবং সেখানে প্রাপ্ত উষ্ণ অভ্যর্থনা দুই দেশের মধ্যকার গভীর সৌহার্দ্যের সুস্পষ্ট প্রতিফলন। সরকারের এই চমৎকার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে বাস্তবে রূপ দিয়ে ব্যবসা-বাণিজ্যের সম্প্রসারণ বিএমসিসিআই অত্যন্ত সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে।
প্রশ্ন: দুই দেশের মধ্যে বর্তমান বাণিজ্যের পরিমাণ কেমন এবং বাণিজ্য ঘাটতি দূর করতে কী পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে?
আনোয়ার শহীদ: বর্তমানে দুই দেশের মধ্যে বার্ষিক দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। তবে এই বাণিজ্যিক সম্পর্কে বাংলাদেশ বিশাল এক বাণিজ্য ঘাটতির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে। ৪ বিলিয়ন ডলারের সামগ্রিক বাণিজ্যের বিপরীতে বাংলাদেশ থেকে মালয়েশিয়ায় রপ্তানি হয় মাত্র ৩৫০-৪০০ মিলিয়ন ডলারের পণ্য, যা মোট লেনদেনের ১০ ভাগের এক ভাগ মাত্র। বাংলাদেশ মূলত মালয়েশিয়া থেকে বিপুল ভোজ্য তেল এবং পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য আমদানি করে। বিপরীতে আমাদের তৈরি পোশাক ও ওষুধ রপ্তানি হলেও পোশাক খাতে চীনের পণ্যের সঙ্গে তীব্র প্রতিযোগিতা করতে হয়।
এই বিশাল বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে আনতে বিএমসিসিআই রপ্তানি ঝুড়ি আরও সমৃদ্ধ করার ওপর জোর দিচ্ছে। শুধু প্রথাগত পণ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে ওষুধ খাতের পাশাপাশি বাংলাদেশ থেকে তাজা ফলমূল, বিশেষ করে আম ও শাকসবজি পরিকল্পিত উপায়ে আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে রপ্তানি করার জন্য আমরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।
প্রশ্ন: বিশ্ব অর্থনীতিতে হালাল বাজারের সম্ভাবনা কতটা এবং বাংলাদেশ কীভাবে এতে লাভবান হতে পারে?
আনোয়ার শহীদ: বর্তমানে সারা বিশ্বে হালাল অর্থনীতির বাজার প্রায় ৩ ট্রিলিয়ন ডলারের, আর এই হালাল ইকোসিস্টেমে বিশ্বে নেতৃত্ব দিচ্ছে মালয়েশিয়া। বাংলাদেশে ৯০ শতাংশের বেশি মুসলিম জনগোষ্ঠী থাকা সত্ত্বেও হালাল ইকোসিস্টেম কিংবা জীবনধারাভিত্তিক হালাল বাণিজ্য সম্পর্কে মানুষের ধারণা এখনো অত্যন্ত সীমিত। আমাদের দেশে সাধারণত হালাল বলতে শুধু খাদ্যপণ্য বা ইসলামিক ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে বোঝানো হয়। কিন্তু আধুনিক হালাল ইকোসিস্টেমের পরিধি শুধু খাদ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি প্রসাধনী, লজিস্টিকস, ফার্মাসিউটিক্যালসসহ মানবজীবনের বহুবিধ খাতের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
মালয়েশিয়ার দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা ও সাফল্য থেকে শিক্ষা নিয়ে দেশের বাজারে এই সম্ভাবনাময় খাতকে জনপ্রিয় করতে চায় বিএমসিসিআই। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ হালাল পণ্যের প্রদর্শনী ‘মালয়েশিয়া ইন্টারন্যাশনাল হালাল ফেয়ার’ (মিহাস)-এ অংশ নিতে বিএমসিসিআই প্রতিনিয়ত উদ্যোগ নিচ্ছে। প্রতি বছর সেপ্টেম্বর মাসে কুয়ালালামপুরে অনুষ্ঠিত এই মেলায় দুই হাজারের বেশি স্টল থাকে। মালয়েশিয়ার এই মেলা থেকে অভিজ্ঞতা অর্জন করে আগামী বছর বাংলাদেশেও একটি আন্তর্জাতিক মানের হালাল প্রদর্শনী আয়োজন করার পরিকল্পনা করছে বিএমসিসিআই, যা দেশীয় উদ্যোক্তাদের আন্তর্জাতিক বাজারে যুক্ত হতে বড় ভূমিকা রাখবে।
প্রশ্ন: দুই দেশের বাণিজ্য বৃদ্ধিতে মুক্তবাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) কতটা ভূমিকা রাখতে পারে?
আনোয়ার শহীদ: দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বহুগুণ বাড়াতে মুক্তবাণিজ্য চুক্তি বা ফ্রি ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্টের (এফটিএ) গুরুত্ব অত্যন্ত অপরিসীম। প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক মালয়েশিয়া সফরে এ চুক্তির বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে উঠে এসেছে এবং শিগগিরই দুই দেশের মধ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে এফটিএ-সংক্রান্ত আলোচনা ও নেগোসিয়েশন শুরু হতে যাচ্ছে। যেকোনো দুই দেশের মধ্যে এফটিএ স্বাক্ষরিত হলে তা বাণিজ্যের পরিধি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। বাংলাদেশ-মালয়েশিয়ার মধ্যেও এফটিএ দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য বাংলাদেশে মালয়েশিয়ান হাইকমিশন ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বিএমসিসিআই সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছে।
প্রশ্ন: বাংলাদেশে সরাসরি মালয়েশীয় বিনিয়োগ (এফডিআই) আকর্ষণের কী কী সুযোগ রয়েছে?
আনোয়ার শহীদ: মালয়েশিয়ায় বর্তমানে শ্রমব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে অনেক শ্রমঘন (লেবার-ইনটেনসিভ) শিল্পপ্রতিষ্ঠান অন্য দেশে স্থানান্তরিত হচ্ছে। মালয়েশিয়াকে তাদের প্ল্যান্টেশন এবং শিল্পকারখানা পরিচালনার জন্য বিদেশ থেকে প্রচুর শ্রমিক আমদানি করতে হয়। বাংলাদেশ যদি বিদ্যমান প্রশাসনিক জটিলতা ও প্রতিবন্ধকতাগুলো সফলভাবে দূর করতে পারে, তবে এসব কারখানা বাংলাদেশে স্থানান্তরিত হতে পারে। বিশেষ করে ফুড প্রসেসিং বা খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং উৎপাদনমুখী শিল্পে মালয়েশিয়া থেকে প্রচুর বিনিয়োগ বাংলাদেশে আসার সুযোগ রয়েছে।
প্রশ্ন: শ্রমবাজারের ক্ষেত্রে প্রথাগত ব্লু-কলার শ্রমিকের পরিবর্তে দক্ষ জনশক্তি রপ্তানিতে কী ধরনের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন?
আনোয়ার শহীদ: মানবসম্পদ রপ্তানির বিষয়ে আমাদের ঐতিহ্যবাহী চিন্তাভাবনা পরিবর্তন করতে হবে। মালয়েশিয়ায় প্রথাগত ব্লু-কলার বা সাধারণ কৃষি ও প্ল্যান্টেশন শ্রমিক পাঠানোর পাশাপাশি আমাদের এখন হাই-টেক খাতের জন্য দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে মনোযোগী হতে হবে। বিশেষ করে সেমিকন্ডাক্টরের মতো উদীয়মান ও বিশ্বমানের শিল্পে বাংলাদেশের দক্ষ প্রকৌশলী ও ডিজাইনারদের পাঠাতে পারলে রেমিট্যান্সের চিত্রে বড় পরিবর্তন আনা সম্ভব।
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে সেমিকন্ডাক্টর খাতে যৌথ সহযোগিতার বিষয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। একজন দক্ষ সেমিকন্ডাক্টর ডিজাইনার যে পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা আয় করেন, তা সাধারণ বহু শ্রমিকের যৌথ আয়ের চেয়েও বেশি। ফলে উচ্চ প্রযুক্তির খাতে প্রশিক্ষিত জনশক্তি রপ্তানি করতে পারলে প্রবাসী আয় যেমন বৃদ্ধি পাবে, তেমনই বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের কাজের সুনামও প্রতিষ্ঠিত হবে।







