মার্কিন বাণিজ্য কৌশলের বোয়িং
- নতুন আরও ১১টি উড়োজাহাজ কিনতে চুক্তি
- বহরে থাকা উড়োজাহাজগুলোর সক্ষমতার মাত্র ৬০ ভাগ ব্যবহার হচ্ছে
- সম্ভাবনা সংকট দুই-ই আছে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
পড়েছ মোগলের হাতে, খানা খেতে হবে একসাথে— প্রবাদটিই যেন উড়োজাহাজ কেনার নেপথ্য রাজনীতির সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক উপমা। পছন্দ হোক বা না হোক, চাহিদা থাকুক বা না থাকুক— আপাতত মার্কিনিদের শর্ত মেনেই আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের হিসাব মেলাতে হচ্ছে ঢাকাকে।
গতকাল বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কে বোয়িংয়ের সঙ্গে ১১টি নতুন উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি করেছে বাংলাদেশ। চুক্তির পর নিউ ইয়র্কের একটি হোটেলে সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন। তিনি বলেছেন, বাংলাদেশের বিমান পরিবহন খাত সম্প্রসারণের প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় রেখেই নতুন উড়োজাহাজ কেনার এ উদ্যোগ।
মার্কিন অ্যারোস্পেস জায়ান্ট বোয়িং থেকে নতুন উড়োজাহাজ কেনাসংক্রান্ত ধারাবাহিক চুক্তি নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মনে বড় ধরনের প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। গতকালের সমঝোতা কিংবা গত ৩০ এপ্রিলের চুক্তির চালিকাশক্তি কি শুধুই বহর আধুনিকীকরণ, নাকি নেপথ্যে কাজ করছে বিশ্বরাজনীতির সূক্ষ্ম বাণিজ্য-কূটনীতি?
এ সিদ্ধান্ত নিয়ে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে আগে থেকেই নানা বিতর্ক ও সমালোচনা ছিল। বিশেষ করে সরকার যখন অর্থনৈতিক চাপের কথা বলছে, তখন নতুন করে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে উড়োজাহাজ কেনার এ সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেন অনেক বিশ্লেষক। তবে এর ইতিবাচক দিকও দেখছেন তারা। তাদের মত, এ কেনাকাটা অ্যাভিয়েশন সেক্টরে খুব বড় কিছু নয়। একসঙ্গে ১০০ েথকে ২০০ উড়োজাহাজও কেনা হয়। কিন্তু বিমানের অদক্ষ ব্যবস্থাপনায় সবার আশঙ্কা। পারবে তো বিমান এতগুলো উড়োজাহাজ চালাতে?
গত বছর শেষদিকে শুরু হয়েছিল মার্কিন-ঝড়। বিশ্বমোড়ল দেশটি ইচ্ছামতো বাণিজ্য শুল্ক আরোপ করতে থাকে বিভিন্ন দেশের ওপর। বাংলাদেশের ওপরও ৩৭ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি গন্তব্য। রেমিট্যান্সের অন্যতম উৎসও। তাই এ সিদ্ধান্ত ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সরকারের জন্য গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। মার্কিনিরাও অনড়। এ অবস্থায় নির্বাচনের মাত্র দিনকয়েক আগে চুক্তি করে অন্তর্বর্তী সরকার। বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য কেনে যুক্তরাষ্ট্র। বাংলাদেশ কেনে মাত্র ২ বিলিয়ন ডলারের। ৬ বিলিয়ন ডলারের ঘাটতি কমাতে চাপ দেয় তারা। বাংলাদেশ বাধ্য হয়ে দেশটি থেকে পণ্য কেনা বাড়াতে থাকে। আলোচনায় বসে— যে গম কেনা হতো ইউক্রেন থেকে, তা যুক্তরাষ্ট্র থেকে কেনার সিদ্ধান্ত হয়। মার্কিন মালিকানার কোম্পািন থেকে ভুট্টা, তুলা, ভোজ্য তেল, জ্বালানি কেনা শুরু হয়। এগুলো সবই বেশি দামে। এরকমই একটি পণ্য উড়োজাহাজ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের পণ্যের মূল বাজার। তারা যদি কোনো কারণে মুখ ফিরিয়ে নেয় কিংবা তৈরি পোশাক আমদানিতে অতিরিক্ত শুল্ক চাপায়, তবে পুরো অর্থনীতি বড় ধাক্কা খাবে। সাধারণ ভাষায়— ‘ওরা আমাদের বড় ক্রেতা, মার্কিনিদের কথা না শুনলে বা পোশাক বিক্রি না হলে আমরা খাব কী?’ আর এ বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে এবং মার্কিন ট্রেড ব্যালান্স ইতিবাচক দেখাতে বারবার সামনে চলে আসছে শতকোটি ডলারের বোয়িং উড়োজাহাজ কেনাকাটা। ফলে অনেকটা বাধ্য হয়েই ঢাকাকে অ্যাভিয়েশন কেনাকাটায় ওয়াশিংটনের মন জোগাতে হচ্ছে।
কিন্তু মূল সংকটটা অন্য জায়গায়। জাতীয় পতাকাবাহী ‘বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস’ একের পর এক নতুন ও বিশাল আকৃতির (ওয়াইড-বডি) উড়োজাহাজ বহরে যুক্ত করছে বা করার পরিকল্পনা করছে, কিন্তু প্রশ্ন হলো— এগুলো চালানো হবে কোথায়? এখনো বিমান বহরে অত্যাধুনিক ড্রিমলাইনার আছে। সেগুলোর পুরোটা কাজে লাগাতে পারছে না বিমান। একজন ক্যাপ্টেন গতকাল জানিয়েছেন, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বহরে যোগ হওয়া এয়ারক্রাফটগুলোর সক্ষমতার ৬০ ভাগ ব্যবহার হচ্ছে। বাকিটা অব্যবহৃত রয়ে যাচ্ছে।
একজন জুনিয়র পাইলট বলেছেন, বিমানের বর্তমান সক্ষমতার দিকে তাকালেই বাস্তবতা স্পষ্ট হয়। এখন বহরে যে উড়োজাহাজগুলো রয়েছে, সেগুলোরই শতভাগ লাভজনক ও পূর্ণাঙ্গ ব্যবহার বিমান নিশ্চিত করতে পারছে না। সঠিক মেইনটেনেন্স, ক্রু সংকট এবং কৌশলগত পরিকল্পনার অভাবে অনেক বিমানই সক্ষমতা অনুযায়ী উড্ডয়ন করতে ব্যর্থ হচ্ছে। এ অবস্থায় একগাদা নতুন উড়োজাহাজ বহরে চাপানো হলে সেগুলো কোথায় ওড়ানো হবে— তার কোনো নেই স্পষ্ট রূপরেখা।
অ্যাভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহেদুল আলম মনে করছেন, ‘একসঙ্গে ২৫টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি করায় অনেকের কাছে অস্বাভাবিক লাগছে। কিন্তু অ্যাভিয়েশন সেক্টরে এটা স্বাভাবিক। এগুলো ধাপে ধাপে সরবরাহ হবে। সবশেষ উড়োজাহাজ আসবে ২০৪৫ সালে। কাজেই এগুলো আসা শুরু করার আগে বিমানকে প্রস্তুত করতে হবে। বিমান চলে আমলাদের দিয়ে। তাদের দিয়ে হবে না। এটা পেশাদারদের কাছে দিতে হবে।’
দিন দিন যাত্রী বাড়ার ইঙ্গিত দিয়ে এ বিশেষজ্ঞ বলছিলেন, ‘এখন আমাদের ট্রাফিক ১২ মিলিয়ন। এটা ২০৩৫ সালে ২৫ মিলিয়নে দাঁড়াবে। বিমান পয়েন্ট টু পয়েন্ট বিজনেস করে। ঢাকা থেকে যাত্রী নিয়ে বিভিন্ন গন্তব্যে যায়। যাত্রীদের ওটাই চূড়ান্ত গন্তব্য। কিন্তু এমিরেটস, টার্কিশ এয়ারলাইনসের যাত্রীরা লোকাল যাত্রী নয়। তাদের গন্তব্য আরও দূরে। প্রতিযোগিতায় টিকতে হলে হাব করতে হবে। আঞ্চলিক যাত্রী টানতে হবে।’
আন্তর্জাতিক অ্যাভিয়েশন রাজনীতিতে রুট সম্প্রসারণ মোটেও সহজ বিষয় নয়। চাইলেই যেকোনো দেশ অন্য দেশে ফ্লাইট চালু করতে বা বাড়াতে পারে না। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে ভূরাজনীতি, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এবং ব্যবসা রক্ষার লড়াই। মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সংযুক্ত আরব আমিরাতের কথাই ধরা যাক। ঢাকা-দুবাই বা ঢাকা-আবুধাবি রুটে চুক্তি অনুযায়ী চাইলে ফ্লাইট বাড়ানোর আইনি সুযোগ আছে হয়তো। কিন্তু আরব আমিরাত বাংলাদেশকে সহজে সেই অতিরিক্ত সুবিধা দিতে রাজি হবে কেন? তাদের রয়েছে বিশ্বখ্যাত ও প্রভাবশালী এয়ারলাইনস ‘এমিরেটস’ এবং ‘ইতিহাদ’। নিজেদের এয়ারলাইনসের ব্যবসা ও প্রভাব ধরে রাখতে তারা কখনো স্থানীয় এয়ারলাইনসকে একচ্ছত্র ছাড় দেবে না।
বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সাবেক এক সচিব বলেছেন, এখানেও রয়েছে কূটনৈতিক দরকষাকষির ভয়। বাংলাদেশ জোর-জবরদস্তি করতে গেলে প্রভাব পড়তে পারে প্রবাসী শ্রমবাজারে। যুক্তরাষ্ট্র যেমন পোশাক কেনা বন্ধের ইঙ্গিত দিলে চাপ সৃষ্টি হয়, তেমনি মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো বেঁকে বসলে বাংলাদেশি শ্রমশক্তি ও রেমিট্যান্স খাত বড় ঝুঁকিতে পড়তে পারে। ফলে তাদের শর্ত ও বাণিজ্যিক চাওয়াও মেনে নিতে হয় বিমানকে।
অ্যাভিয়েশন বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি দেশের বিমান বহর বাড়াতে হয় রুট এবং যাত্রী চাহিদার ওপর ভিত্তি করে। কিন্তু বোয়িং কেনার এ দৌড়ে কৌশলগত দূরদর্শিতার চেয়ে ‘রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা’ ও ‘বাণিজ্যিক কৌশল’ বেশি প্রাধান্য পাচ্ছে।
অবসরপ্রাপ্ত উইং কমান্ডার এ টি এম নজরুল ইসলাম বলেছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র হয়তো তাদের বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর জন্য বোয়িংয়ের উড়োজাহাজ বিক্রি করেছে। কিন্তু এটা বাংলাদেশের জন্য সুযোগ। তারা তাদের কাজ করেছে, এখন আমরা আমাদের কাজ করব। দেখার বিষয় বিমান এটাকে কীভাবে হ্যান্ডেল করে। ১৯৯০ সাল থেকে আমাদের যাত্রী কমছে। ওই সময় আন্তর্জাতিক যাত্রীর ৬০ শতাংশ ছিল বাংলাদেশের। এখন েসটা নেমে এসেছে ২৫ শতাংশে। কাজেই বিষয়টিকে ইতিবাচকভাবে নিতে হবে। এই কেনাকে বিনিয়োগ হিসেবে দেখতে হবে। হয়তো আমরা নিজের পছন্দ অনুযায়ী কিনতে পারিনি। তাই বলে হাল ছেড়ে দেওয়ার কিছু নেই। বিমান ব্যবস্থাপনাকে এখনই মাঠে নামতে হবে। তা না হলে ২০৩১ সালে যে উড়োজাহাজটি আসবে, তার দক্ষ জনবল পাওয়া যাবে না।’
নতুন বহর যুক্ত হওয়ার আগে যদি লাভজনক রুট নিশ্চিত করা না যায় এবং অভ্যন্তরীণ অবকাঠামো শক্তিশালী করা না হয়, তবে এই আকাশছোঁয়া দামের নতুন উড়োজাহাজগুলো বিমানের জন্য আশীর্বাদ না হয়ে বিশাল এক আর্থিক বোঝার কারণ হয়ে দাঁড়াবে। ‘মোগলের খানা’ সাময়িকভাবে বড় বাণিজ্যের ঢাল হতে পারে কিন্তু সঠিক পরিকল্পনা ছাড়া এ উড্ডয়ন শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের অর্থনীতিকে কতটুকু টানবে—সেটাই এখন দেখার বিষয়।



