জুলাই-সেপ্টেম্বর
৭৪৭ কোটি ডলারের বাণিজ্য ঘাটতি

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বিশ্ববাজারে জ্বালানি ও ভোগ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাবে বাড়ছে আমদানি ব্যয়। অন্যদিকে দেশের শিল্প খাতের স্থবিরতা ও জ্বালানি সংকটের কারণে প্রত্যাশিত নয় রপ্তানি আয়। ফলে চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) দেশের বাণিজ্য ঘাটতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭ দশমিক ৪৭ বিলিয়ন বা ৭৪৭ কোটি ডলারে। যা গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ৫৭১ কোটি ডলার। রেমিট্যান্সে ভালো প্রবৃদ্ধির জন্য চলতি হিসাবে ১৩৩ কোটি ডলারের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। তার আগের অর্থবছরে জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে ছিল ৮২ কোটি ডলার। পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগ ও ঋণপ্রবাহ কমে যাওয়ায় সামগ্রিক লেনদেনের ভারসাম্যে ঘাটতি ছাড়িয়েছে ১১৬ কোটি ডলার। যা তার আগের ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জুরাই-সেপ্টেম্বর সময়ে ছিল ৮৫ কোটি ডলার। গতকাল বৃহস্পতিবার বৈদেশিক বাণিজ্য-সংক্রান্ত হালনাগাদ প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল, পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য ও লুব্রিকেন্ট আমদানিতে ব্যয় হয়েছে ৪২২ কোটি ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এ ব্যয়ের পরিমাণ ছিল ২০৫ কোটি ডলার।
সংশ্লিষ্টদের মতে, একদিকে জ্বালানি আমদানি ব্যয় বাড়ছে, অন্যদিকে প্রধান রপ্তানি খাতগুলোতে প্রত্যাশিত প্রবৃদ্ধি হচ্ছে না। ফলে আমদানি ও রপ্তানির ব্যবধান বাড়ছে। আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা এবং বিভিন্ন পণ্যের উচ্চমূল্য বৈদেশিক লেনদেনের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে। এতে বাণিজ্য ঘাটতির পরিমাণও বাড়ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, গত জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে দেশে ১ হাজার ৯৩৩ কোটি ডলারের পণ্য আমদানি হয়েছে। গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় আমদানি বেড়েছে ১৫ দশমিক ১০ শতাংশ। বিপরীতে পণ্য রপ্তানি বেড়েছে ৭ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে পণ্য রপ্তানি হয়েছে এক হাজার ১৮৬ কোটি ডলারের।
দেশের চলতি হিসাবের ভারসাম্য আবারও ঋণাত্মক ধারায় চলে গেছে। অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে (জুলাই-আগস্ট) চলতি হিসাবে ৫৯ কোটি ডলারের উদ্বৃত্ত ছিল। কিন্তু সেপ্টেম্বর শেষে তা ১৩৩ কোটি ডলারের ঘাটতিতে পরিণত হয়েছে। রেমিট্যান্সে ১৩ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি থাকার পরও এ ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, রপ্তানি ও রেমিট্যান্সের মাধ্যমে দেশে যে পরিমাণ ডলার আসছে, আমদানির বিপরীতে তার চেয়ে বেশি ডলার ব্যয় হচ্ছে। ফলে চলতি হিসাবের ভারসাম্য ঘাটতিতে পড়েছে।
এদিকে চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে আর্থিক হিসাবে ঘাটতি থাকলেও সেপ্টেম্বর শেষে তা ৩২ কোটি ডলারের উদ্বৃত্তে ফিরেছে। মূলত প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই), বিদেশি অনুদান ও ঋণপ্রবাহ কিছুটা বাড়ায় আর্থিক হিসাবের উন্নতি হয়েছে। তবে গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় এ উদ্বৃত্ত অনেক কম। গত অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) আর্থিক হিসাবে ১৭৯ কোটি ডলারের উদ্বৃত্ত ছিল। ওই সময়ে বিদেশি ঋণ এসেছিল ১০০ কোটি ডলার। অথচ চলতি অর্থবছরের একই সময়ে এসেছে এর অর্ধেক।
বাণিজ্য ঘাটতি বাড়লেও এতদিন দেশের বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্যে (ব্যালান্স অব পেমেন্টস) বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়নি। তবে চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসেই বিদেশি অর্থায়ন কমে যাওয়ায় সামগ্রিক লেনদেনে ৬৯ কোটি ৪০ লাখ ডলারের ঘাটতি তৈরি হয়। সেপ্টেম্বর শেষে তা বেড়ে ১১৬ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে। রেমিট্যান্সে শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি থাকলেও তা এ ঘাটতি পূরণ করতে পারেনি। এতে দেশের বৈদেশিক খাতের ওপর নতুন করে চাপ তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেছেন, জ্বালানি আমদানির উচ্চ ব্যয়ের কারণে বাণিজ্য ঘাটতি বাড়ছে। আন্তর্জাতিক বাজার থেকে জ্বালানি সংগ্রহ করতে গিয়ে এর মূল্য আগের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। এতে সামগ্রিক ব্যয়ে বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে। এ পরিস্থিতি কিছুটা অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করলেও তা দীর্ঘস্থায়ী হবে না বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।



