লোকসানি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান যাচ্ছে বেসরকারি খাতে

বক্তব্য রাখছেন শিল্পমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির
বছরের পর বছর লোকসানে থাকা এবং উৎপাদন সক্ষমতা হারানো রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পকারখানাগুলো দ্রুত বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এসব কারখানার বিশাল জায়গা ও অবকাঠামো ব্যবহার করে নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যেই এমন পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
গতকাল বুধবার ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরামের (ইআরএফ) সহযোগিতায় এবং এসএমই ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে আয়োজিত ‘জাতীয় বাজেট ২০২৬-২৭: এসএমই খাতের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি’ শীর্ষক এক কর্মশালায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে শিল্পমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির এসব কথা বলেছেন।
ইআরএফ সভাপতি দৌলত আকতার মালার সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক আবুল কাশেমের সঞ্চালনায় কর্মশালায় বিশেষ অতিথি ছিলেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কর নীতিবিষয়ক সদস্য মুতাসিম বিল্লাহ ফারুকী এবং এসএমই ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনোয়ার হোসেন চৌধুরী।
রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পের সংস্কার এবং বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়ার বিষয়ে শিল্পমন্ত্রী বলেছেন, ‘শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীনে বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যার মধ্যে ১৫টি চিনিকল। এর মধ্যে ছয়টি বন্ধ এবং ৯টি চালু আছে। এসব কারখানা ৬০-৭০ বছর আগে স্থাপিত। পুরনো এসব কারখানার অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল আগেই শেষ হয়ে গেছে। জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা সাপেক্ষে আমরা এসব কারখানা দ্রুত বেসরকারি খাতে দিতে চাই।’
তিনি আরও জানিয়েছেন, সরকারি বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম তৈরির তিনটি কারখানায় নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য এর মধ্যে চীনা রাষ্ট্রদূতের উপস্থিতিতে রোড শো করা হয়েছে। মন্ত্রী বললেন, ‘এখানে বিনিয়োগকারী এসে তার প্রস্তাবনা অনুযায়ী নতুন বিনিয়োগ করবেন। পুরনো কারখানার জায়গাতেই যে আগের শিল্প করতে হবে— এমন কোনো কথা নেই। আমাদের কাজ হচ্ছে বিনিয়োগকারীদের জমি, জ্বালানি ও অন্যান্য আকর্ষণীয় প্যাকেজ দেওয়া। বড় প্লটগুলোকে শিল্পপার্ক হিসেবে গড়ে তুলে ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদেরও আকর্ষণ করা হবে।’
পুরনো চিনিকলগুলোয় ১৪ মাস ধরে উৎপাদিত আখের পরিবর্তে মাত্র চার-পাঁচ মাসে ফলনশীল এবং বেশি রসযুক্ত ‘সুগার বিট’ ব্যবহারের সম্ভাব্যতা যাচাই করা হচ্ছে বলে জানান মন্ত্রী। এ ছাড়া দেশের সরকারি সার কারখানাগুলো যেন গ্যাসের অভাবে বন্ধ না থাকে এবং সার আমদানি করতে না হয়, সেজন্য কারখানাগুলোর জন্য একটি ডেডিকেটেড গ্যাস নেটওয়ার্ক স্থাপনের পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছেন তিনি।
বিনিয়োগ পরিবেশ সহজ করার ঘোষণা দিয়ে খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বললেন, নতুন কোম্পানিগুলোর মেশিনপত্র আমদানি ও ব্যবসা শুরুর প্রাথমিক লাইসেন্স পেতে এখন আর দীর্ঘ সময় লাগবে না। ৩৫৫ দিনের দীর্ঘসূত্রতা কমিয়ে এ সময়সীমা ১৪ দিনে নামিয়ে আনা হবে। অন্যান্য লাইসেন্স যেন ভোগান্তি ছাড়াই অনলাইনে এক ছাতার নিচে পাওয়া যায়, সে ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
এক প্রশ্নের জবাবে এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেছেন, বাংলাদেশের ঋণ ব্যবস্থাপনা ও রাজস্ব আয়ের বর্তমান বাস্তবতায় এই উত্তরণ যেন টেকসই হয়, সেজন্য আমরা উত্তরণের সময়সীমা তিন বছর পেছানোর অনুরোধ করেছি। বিগত সময়ের অপরিকল্পিত ঋণনির্ভর মেগা প্রকল্পের সমালোচনা করে তিনি বলেছেন, আগামীতে এডিপিতে যেসব প্রকল্প নেওয়া হবে, সেগুলোর সুনির্দিষ্ট ‘রিটার্ন অন ইনভেস্টমেন্ট’ এবং ‘ভ্যালু ফর মানি’ থাকতে হবে।
ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের (এসএমই) উন্নয়নে সরকারের পদক্ষেপ তুলে ধরে মন্ত্রী বলেছেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজের মধ্যে সিএমএসএমই খাতের জন্য ৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। আগামীতে এ খাতে ৫ লাখ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। পাশাপাশি সিলেট, পাবনা এবং ঠাকুরগাঁওয়ে নতুন করে বিসিক শিল্পপার্ক সম্প্রসারণ করা হবে।
লজিস্টিক খরচ কমানোর ওপর জোর দিয়ে তিনি জানিয়েছেন, বাংলাদেশের বর্তমান লজিস্টিক খরচ জিডিপির ১৬ শতাংশ, যা বৈশ্বিক মানদণ্ডে ১০ শতাংশে নামিয়ে আনতে বন্দরে হ্যান্ডলিং দক্ষতা বৃদ্ধি এবং সাপ্লাই চেইন ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন করা হবে।




