কাগজেই বাজেট বড়

বাজেটের সবচেয়ে বড় সংকট কি অর্থের ঘাটতি নাকি ব্যয়ের অদক্ষতা। সরকারি হিসাব বলছে, চলতি (২০২৫-২৬) অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে সংশোধিত বাজেটের মাত্র ৫২ শতাংশ বাস্তবায়ন হয়েছে। অথচ বাকি তিন মাসেই খরচ করতে হবে মোট বরাদ্দের প্রায় অর্ধেক, অর্থাৎ ৩ লাখ ৮২ হাজার কোটি টাকা। এতে একদিকে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে স্থবিরতার শঙ্কা তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে শেষ মুহূর্তের ব্যয়ের চাপে অপচয়, অনিয়ম ও নিম্নমানের কাজের ঝুঁকিও বেড়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, সংশোধিত বাজেটের জুলাই-মার্চ— এ ৯ মাসে মোট ব্যয় হয়েছে ৪ লাখ ৮ হাজার ৪২৬ কোটি টাকা, যা পুরো বছরের লক্ষ্যমাত্রার মাত্র ৫২ শতাংশ। বিপরীতে, একই সময়ে রাজস্ব ও বৈদেশিক অনুদান মিলিয়ে আয় হয়েছে ৩ লাখ ৩২ হাজার ৯৯৮ কোটি টাকা, যা সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার ৫৯ শতাংশ।
সূত্রমতে, চলতি বাজেট ঘোষণা দিয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকার। সেটি শেষ সময়ে বাস্তবায়নের দায়িত্ব পায় নতুন সরকার। রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসের ফলে ধীরগতি কাজ করছে। এ ছাড়া প্রকল্প অনুমোদন ও ক্রয় প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা এবং বৈদেশিক অর্থায়ন ছাড়ে বিলম্বও অাছে। এসবের প্রভাব পড়েছে রাজস্ব অােয়র ওপর।
সংশ্লিষ্টদের মতে, বাস্তবায়নের ধীরগতি অর্থনীতিতে কয়েকটি চাপ তৈরি করতে পারে। এর মধ্যে সরকারি ও বেসরকারি বিনিয়োগও নিরুৎসাহিত হতে পারে। স্থানীয় পর্যায়ে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে স্থবিরতা দেখা দিতে পারে। আর রাজস্ব আদায়ের দুর্বলতা আগামী অর্থবছরের বাজেট বাস্তবায়নকেও কঠিন করে তুলবে এবং ঋণের সুদ পরিশোধের চাপ আরও বাড়বে।
সূত্রমতে, গত মার্চ পর্যন্ত সরকারের সামগ্রিক বাজেট ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৭৫ হাজার ৪২৮ কোটি টাকা, যা সংশোধিত বাজেটের মাত্র ৩৪ শতাংশ। কম ঘাটতি মানে কম ঋণ। কিন্তু বাস্তবে এর পেছনে রয়েছে উন্নয়ন ব্যয়ের নিম্নগতি।
সূত্র আরও জানায়, সংশোধিত বাজেটে ঋণের লক্ষ্য ছিল ২ লাখ ২৯ হাজার কোটি টাকা। মার্চ পর্যন্ত সংগ্রহ হয়েছে মাত্র ৭২ হাজার ২৫৩ কোটি টাকা, অর্থাৎ ৩২ শতাংশ। এর মধ্যে নিট বৈদেশিক ঋণ ঋণাত্মক ৯ হাজার ৯৬৫ কোটি টাকা অর্থাৎ নতুন ঋণ পাওয়ার চেয়ে বেশি ঋণ পরিশোধ করতে হয়েছে।
এ ছাড়া একই সময়ে অভ্যন্তরীণ নিট ঋণ ৮২ হাজার ২১৮ কোটি টাকা (৬১ শতাংশ), ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ঋণ ১ লাখ ২ হাজার ৪৪২ কোটি টাকা (৯১ শতাংশ)।
চলতি ব্যয়ই বেশি: চলতি বা পরিচালন ব্যয়ে বাস্তবায়ন তুলনামূলক বেশি। মোট পরিচালন ব্যয়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৫ লাখ ৩৫ হাজার ৩১৭ কোটি টাকা। ব্যয় হয়েছে ৩ লাখ ৪২ হাজার ১৩৩ কোটি টাকা, যা লক্ষ্যমাত্রার ৬৩ শতাংশ। এর মধ্যে পুনরাবৃত্ত ব্যয় বাস্তবায়ন হয়েছে ৬২ শতাংশ। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হচ্ছে সুদ পরিশোধ। মোট সুদ ব্যয়— ৯৯ হাজার ৯০০ কোটি টাকা (৮২ শতাংশ), অভ্যন্তরীণ সুদ— ৮৪ শতাংশ, বৈদেশিক সুদ— ৭২ শতাংশ। অর্থাৎ, উন্নয়ন ব্যয় পিছিয়ে থাকলেও ঋণের সুদ পরিশোধে সরকারের কোনো শৈথিল্য নেই। এটি অর্থনীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেত। কারণ, সরকারের রাজস্ব আয়ের বড় অংশ ক্রমেই সুদ পরিশোধে চলে যাচ্ছে। ফলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা কিংবা অবকাঠামোয় নতুন বিনিয়োগের সুযোগ সংকুচিত হচ্ছে।
রাজস্ব আদায় প্রত্যাশার নিচে: সরকারের সংশোধিত বাজেটে রাজস্ব ও বৈদেশিক অনুদানের লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৫ লাখ ৬৮ হাজার ৯৭৫ কোটি টাকা। মার্চ পর্যন্ত আদায় হয়েছে ৩ লাখ ৩২ হাজার ৯৯৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে মোট রাজস্ব আদায়— ২ লাখ ৯০ হাজার ৩৭৯ কোটি (৫৬ শতাংশ), এনবিআর কর রাজস্ব— ২ লাখ ৮৩ হাজার ৯১৯ কোটি (৫৬ শতাংশ), এনবিআরবহির্ভূত কর— ৬ হাজার ৪৬০ কোটি (৩৪ শতাংশ), করবহির্ভূত রাজস্ব— ৪০ হাজার ৮৮৩ কোটি (৮৮ শতাংশ), বৈদেশিক অনুদান— ১ হাজার ৭৩৬ কোটি টাকা (৩৪ শতাংশ)।
উন্নয়ন ব্যয়ে ধীরগতি: সরকারি ব্যয়ের সবচেয়ে দুর্বল অংশ উন্নয়ন খাত। সরকারের মোট উন্নয়ন ব্যয়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২ লাখ ৪৫ হাজার ৬০৯ কোটি টাকা। ব্যয় হয়েছে ৫৭ হাজার ৫৪ কোটি। এর মধ্যে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি)— ২৪ শতাংশ।




