জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় ‘সুরক্ষা পরিকল্পনা’

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
রাতের আকাশে যুদ্ধবিমানের গর্জন শোনা যায় হাজার মাইল দূরের মধ্যপ্রাচ্যে। কিন্তু সেই শব্দের প্রতিধ্বনি পৌঁছে যায় বাংলাদেশের রান্নাঘরে, কৃষকের সেচপাম্পে, কারখানার উৎপাদন লাইনে এবং সাধারণ মানুষের নিত্যদিনের বাজারে। বিশ্বের এক প্রান্তে সংঘাত শুরু হলে অন্য প্রান্তের একটি দেশের অর্থনীতি কীভাবে কেঁপে ওঠে, তার বাস্তব উদাহরণ হতে পারে বাংলাদেশ। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের দামামা যত জোরালো হচ্ছে, ততই বাড়ছে বাংলাদেশের অর্থনীতির উদ্বেগ। বিশ্ববাজারে জ্বালানি ও খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি এরই মধ্যে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা, খাদ্য সরবরাহ এবং মূল্যস্ফীতিকে নতুন ঝুঁকির মুখে দাঁড় করিয়েছে। পরিস্থিতি আরও জটিল হলে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হওয়া, শিল্পে গ্যাস সংকট, কৃষিতে সারের ঘাটতি এবং দ্রব্যমূল্যের নতুন ঊর্ধ্বগতি দেখা দিতে পারে বলে আশঙ্কা করছে সরকার।
এই বাস্তবতায় সম্ভাব্য সংকট মোকাবিলায় স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা তৈরি করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়, যা সম্প্রতি মন্ত্রিসভায় অনুমোদন পেয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এটি শুধু একটি অর্থনৈতিক পরিকল্পনা নয়; বরং বৈশ্বিক অস্থিরতার মধ্যে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে সচল রাখা, খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখার একটি জাতীয় কৌশল।
সরকারি বিশ্লেষণ বলছে, দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের ফলে এলএনজি সরবরাহে ঘাটতি, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, বিদ্যুৎ সংকট, শিল্প উৎপাদনে ধীরগতি এবং কৃষি উৎপাদনে বাধা তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ, চলতি হিসাবের ঘাটতি বৃদ্ধি এবং রেমিট্যান্সপ্রবাহেও ঝুঁকি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা ডিজেল। দেশে ব্যবহৃত মোট জ্বালানি তেলের প্রায় ৬৭ শতাংশই ডিজেল, যা পরিবহন, কৃষি ও বিদ্যুৎ খাতের প্রধান চালিকাশক্তি। আন্তর্জাতিক বাজারে ডিজেলের দাম দ্রুত বাড়তে থাকায় বাংলাদেশের আমদানি ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। অর্থ বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, এই উচ্চমূল্য দীর্ঘ সময় স্থায়ী হলে প্রতি মাসে অতিরিক্ত প্রায় ১২৮ মিলিয়ন ডলার ব্যয় হতে পারে, যা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও বাজেট ব্যবস্থাপনার ওপর বড় চাপ সৃষ্টি করবে।
একইভাবে এলএনজির বাজারেও নতুন ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। বর্তমানে দেশে দৈনিক প্রায় ২ হাজার ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ হচ্ছে। এর মধ্যে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ আসে আমদানি করা এলএনজি থেকে। আন্তর্জাতিক স্পট মার্কেটে এর দাম প্রায় দ্বিগুণ হওয়ায় ভর্তুকির বোঝা দ্রুত বাড়ছে। আর যদি মধ্যপ্রাচ্য থেকে সরবরাহ ব্যাহত হয়, তাহলে তার সরাসরি প্রভাব পড়বে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্প খাতে।
বিদ্যুৎ খাতও কঠিন সময়ের মুখোমুখি। সরকারের প্রাক্কলন অনুযায়ী, গ্রীষ্মে দেশে বিদ্যুতের চাহিদা ১৮ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যেতে পারে। কিন্তু একই সময়ে ফার্নেস অয়েল, কয়লা এবং এলএনজির আন্তর্জাতিক মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয়ও দ্রুত বাড়ছে। ফলে লোডশেডিং এড়াতে গেলে মার্চ থেকে আগামী সেপ্টেম্বর পর্যন্ত শুধু বিদ্যুৎ খাতেই প্রায় ৩৮ হাজার কোটি টাকার বেশি ভর্তুকি প্রয়োজন। এমনকি ৫০০ মেগাওয়াট লোডশেডিং ধরে হিসাব করলেও প্রয়োজন হবে ৩১ হাজার কোটি টাকার বেশি। এ কারণেই সরকার কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর পূর্ণ সক্ষমতা ব্যবহারের ওপর জোর দিচ্ছে। বর্তমানে এসব কেন্দ্র থেকে প্রায় ৬ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা আছে। জ্বালানি সংকটের প্রভাব সবচেয়ে গভীরভাবে পড়তে পারে কৃষিতে। দেশে ইউরিয়া সারের চাহিদা বছরে প্রায় ২৬ লাখ টন। কিন্তু গ্যাস সংকটের কারণে অনেক ইউরিয়া কারখানাই পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। এদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে সারের দামও প্রায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। ফলে সরকার অতিরিক্ত সার আমদানি এবং কৌশলগত মজুদ গড়ে তোলার পরিকল্পনা নিয়েছে, যাতে খাদ্য উৎপাদন ব্যাহত না হয়। জুনের মধ্যে ৫ লাখ টন ইউরিয়া ক্রয় এবং পরবর্তী কয়েক মাসে আরও ৫ লাখ টন আমদানির পরিকল্পনা আছে। কারণ জ্বালানি সংকট শেষ পর্যন্ত খাদ্যনিরাপত্তা সংকটে রূপ নিতে পারে এমনটি আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আগামী বাজেটে জ্বালানি, বিদ্যুৎ ও সারে বাড়তি ভর্তুকি, জরুরি তহবিল গঠন, জ্বালানি আমদানির উৎস বৈচিত্র্য, দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ চুক্তি এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বৃদ্ধির মতো পদক্ষেপ ঘোষণা করা হচ্ছে। পাশাপাশি রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র দ্রুত বাণিজ্যিক উৎপাদনে আনার বিষয়টিও সরকারের অগ্রাধিকার তালিকায় রয়েছে।
আসন্ন বাজেটে ভর্তুকি বাড়িয়ে বিদ্যুৎ, গ্যাস ও সারে বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে ৮০ হাজার ১০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে বিদ্যুতে বরাদ্দ ৩৭ হাজার কোটি টাকা, সারে ২৭ হাজার কোটি ও গ্যাসে বরাদ্দ ৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকা।
এই কর্মপরিকল্পনার মূল বার্তা হলো—মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণে না থাকলেও এর অর্থনৈতিক অভিঘাত মোকাবিলার প্রস্তুতি হাতেই রয়েছে। তবে পরিকল্পনা সফল হবে কি না, তা নির্ভর করবে তিনটি বিষয়ের ওপর— জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা, ভর্তুকির অর্থ জোগাড় করা এবং বাজার ব্যবস্থাপনাকে কার্যকর রাখা। কারণ যুদ্ধের প্রকৃত অভিঘাত শেষ পর্যন্ত শুধু তেলের ট্যাংকে নয়, সাধারণ মানুষের রান্নাঘর, কৃষকের সেচপাম্প এবং শিল্পকারখানার উৎপাদন লাইনে গিয়ে ধরা দেয়।




