গভর্নরের আশ্বাসেও অনাস্থার শঙ্কা
৬ শরিয়াহ ব্যাংকের পর এবার তীর ইসলামী ব্যাংকে

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
দেশের ১০টি পূর্ণাঙ্গ ইসলামী ব্যাংকের ৬টি যেন কার্যত হয়ে পড়ছে দুর্বল। ব্যাংক খাতের নিয়ন্ত্রক কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সার্বক্ষণিক নজরদারির পরও আস্থা হারিয়ে ফেলছেন এসব ব্যাংকের গ্রাহকরা। টাকা তুলতে পারছেন না তারা। সংকট সমাধানে সোশ্যাল ইসলামী, ফার্স্ট সিকিউরিটি, ইউনিয়ন, গ্লোবাল ইসলামী ও এক্সিম ব্যাংক নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক একটি সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠন করলেও আস্থা ফেরেনি গ্রাহকদের। ইচ্ছামতো টাকা তুলতে পারছেন না আইসিবি ইসলামী ব্যাংকের আমানতকারীরাও। তবে স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক থেকে তোলা যাচ্ছে নির্ধারিত পরিমাণ টাকা, যদিও তা গ্রাহকদের চাহিদার তুলনায় বেশ কম।
গত বুধ ও বৃহস্পতিবার দেশের সর্ববৃহৎ ইসলামী ব্যাংকের প্রায় সব শাখায় হাজার হাজার গ্রাহক চাহিদামতো টাকা তুলতে পারেননি— এমন অভিযোগ রয়েছে। যার প্রভাব সব ব্যাংকে পড়েছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।
ইসলামী ব্যাংকের হেড অফিস কমপ্লেক্স ভবন শাখার গ্রাহক জাকির হোসেন লিটন জানান, ইসলামী ব্যাংকের টাকা তুলতে পারছেন না। গত বুধ ও বৃহস্পতিবার তিনি শাখায় গিয়ে চেক দিয়ে টাকা তুলতে পারেননি। শাখা ব্যবস্থাপক টাকা না তোলার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি রাজধানীর মুগদা, মতিঝিল, দিলকুশা, কারওয়ান বাজার এবং মালিবাগে এটিএম থেকে টাকা তুলতে পারেননি। এমনকি অন্য ব্যাংকের এটিএম থেকেও শুক্রবার রাত পর্যন্ত টাকা তুলতে ব্যর্থ হন। তার শঙ্কা ইসলামী ব্যাংকে টাকা রাখা মানে সমস্যা।
শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মোসলেহ উদ্দিন বলেছেন, ‘ইসলামী ব্যাংকের অস্থিরতার প্রভাব সব ব্যাংকে পড়া শুরু হয়েছে। ইসলামী ব্যাংকের রেমিট্যান্সে একক অবদান প্রায় ৩২ শতাংশ। ব্যাংকটি ক্ষতিগ্রস্ত হলে তার জায়গা পূরণ হবে না। তখন দেশের রেমিট্যান্স সংগ্রহ মারাত্মকভাবে কমে যাবে। আর ব্যাংকটির বড় গ্রাহক অন্য ব্যাংকের পক্ষে সামলানো টাফ। এ ছাড়া এই ব্যাংকটি দেউলিয়া হলে জনমনে ধারণা সৃষ্টি হবে যে, ইসলামী ব্যাংক মানে সমস্যা। কারণ দেশের ইসলামী ব্যাংক আগে থেকে টাকা দিতে পারে না। এমনটা চলতে থাকলে কোনো ইসলামী ব্যাংকে টাকা রাখবেন না গ্রাহকরা। এতে সব ইসলামী ব্যাংকের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা রয়েছে।’
ইসলামী ব্যাংকের হবিগঞ্জ শাখার গ্রাহক হাবিবা। তিনি জানান, গত বৃহস্পতিবার টাকা তুলতে পারেননি। একইভাব ইসলামী ব্যাংকের রংপুর ধাপ শাখার গ্রাহক আলী হোসেন জানান, গত বৃহস্পতিবার তিনি ১০ লাখ টাকা তুলতে পারেননি। তার মতো রাজধানীর নিউ মার্কেট শাখার গ্রাহক ফাহিমা ইয়াসমিন জানান, কিছুদিন ধরে ইসলামী ব্যাংক নিয়ে যা হচ্ছে, মনে হয় টাকা ফের কেউ নিয়ে যাবে। মঙ্গলবার শাখা ব্যবস্থাপক জানালেন, টাকা যখন চাইবেন, তখন তুলতে পারবেন। কিন্তু বৃহস্পতিবার চেক নিতে অস্বীকৃতি জানান। আগেও গভর্নর আহসান এইচ মনসুরের কথা শুনে ইউনিয়ন ব্যাংক থেকে ৫ লাখ টাকা তুলতে পারেননি তিনি।
গত ১০ জুন ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান ও সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মাসরুর আরেফিন ইসলামী ব্যাংকের চলমান অস্থিরতা নিয়ে গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমানের সঙ্গে অনুষ্ঠিত বৈঠকে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। সংগঠনটি জানায়, ইসলামী ব্যাংকের বর্তমান সমস্যার দ্রুত সমাধান হলে তাতে ব্যাংক খাতের জন্য ভালো হবে। ৯ সংকটের প্রভাব সব ব্যাংকের ওপর পড়বে।
ইসলামী ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আজ শনিবার আগামীর সময়কে জানান, গত বৃহস্পতিবার কিছু শাখায় বড় চেকের সমস্যা হয়েছিল। তবে গভর্নর যেহেতেু আশ্বাস দিয়েছেন, তাই আতঙ্কিত হওয়া উচিত না। বাংলাদেশ ব্যাংক নগদ টাকা দিয়ে সহায়তা করলে গ্রাহকের টাকা পাবেন।
গভর্নরের আশ্বাসের বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সহকারী মুখপাত্র মোহাম্মদ শাহরিয়ার সিদ্দিকী আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘ব্যাংক চলে আস্থার ওপর। গভর্নর কথা দিয়েছেন মানে টাকা পাবেন গ্রাহকরা। আমরা সবকিছু নজরদারিতে রেখেছিলাম। তবুও কিছু ব্যাংকের গ্রাহক তখন টাকা পাননি। এটা সত্য।’
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, ১০টি ইসলামী ব্যাংকের মার্চ পর্যন্ত আমানত ছিল ৪ লাখ ৮ হাজার কোটি টাকা। সেখানে ইসলামী ব্যাংকের এককভাবে আমানত ১ লাখ ৯১ হাজার কোটি টাকা। আর ব্যাংকটির মাধ্যমে এ পর্যন্ত রেমিট্যান্স এসেছে প্রায় ৮৩ বিলিয়ন ডলার। গত মে মাসে এই ব্যাংকের মাধ্যমে প্রবাসী আয় আসে প্রায় ৬০০ মিলিয়ন ডলার। সেখানে বাকি ৯টি শরিয়াহ ব্যাংকের রেমিট্যান্স সংগ্রহ মাত্র ৬১ মিলিয়ন ডলার। আমাদানি, রপ্তানি, বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থান মিলে ব্যাংকটির সঙ্গে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে জড়িত প্রায় ৮ কোটি মানুষ। শুধু গ্রাহকের রয়েছে ৩ কোটি টাকা।
ইসলামী ব্যাংকের নতুন চেয়ারম্যান খুরশীদ আলমের নিয়োগকে কেন্দ্র করে সংকট দেখা দিয়েছে। কয়েকদিন ধরে আমানত অস্বাভাবিকভাবে তুলে নিয়েছেন গ্রাহকরা। কিন্তু গত বুধ ও বৃহস্পতিবার টাকা তোলার হিড়িক লাগায় ব্যাংকটি কেন্দ্রীয়ভাবে টাকা তুলতে দেয়নি।
গত ১২ জুন ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসিকে ঘিরে চলমান পরিস্থিতিতে আমানতকারীদের উদ্বিগ্ন না হওয়ার আহ্বান জানিয়ে গভর্নর মোস্তাকুর রহমান বললেন, আমানতকারীরা যেকোনো সময় তাদের টাকা তুলতে পারবেন। তাদের কোনো অসুবিধা হবে না। ব্যাংকটির জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হবে।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের অধ্যাপক ড. আহসান হাবীব। তিনি বলেছেন, ইসলামী ব্যাংক ব্যাংকিং সিস্টেমের পিলার। ব্যাংকটি কর্মসস্থান, ব্যবসা, বিনিয়োগ এবং রেমিট্যান্সে অনন্য ভূমকিা রাখছে।
আজ শনিবার রাজধানীর সেগুনবাগিচায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে (ডিআরইউ) আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সচেতন গ্রাহক ফোরামের আহ্বায়ক ও মুখপাত্র অধ্যাপক নুর উন-নবী ইসলামী ব্যাংকের সম্প্রতি নিয়োগপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মো. খুরশীদ আলমকে অপসারণসহ ৭ দফা দাবি বাস্তবায়নে কঠোর কর্মসূচির ঘোষণা দিয়েছেন।


