ডলারের বাজার ফের ঊর্ধ্বমুখী
- কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রেট অমান্য করে বেশি দামে লেনদেন
- নজরদারিতে ৭ ব্যাংক

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বাংলাদেশ ব্যাংক প্রতিদিন ডলারের রেফারেন্স রেট নির্ধারণ করে দিলেও কয়েকটি ব্যাংক তা উপেক্ষা করে বেশি দামে করছে কেনাবেচা। অভিযোগ উঠেছে, ব্যাংকগুলো আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) মুক্তবাজারভিত্তিক বিনিময়হার ব্যবস্থার সুযোগ নিয়ে ঘোষিত দরের বাইরে করছে লেনদেন। ফলে দেশে ডলারের বাজার আবারও ঊর্ধ্বমুখী।
বিষয়টি নিয়ে অন্তত সাতটি ব্যাংককে নজরদারিতে রেখেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তবে আইএমএফকে দেওয়া প্রতিশ্রুতির কারণে তাদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিতে পারছে না নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, এরই মধ্যে বিদেশভ্রমণ, বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ ও জ্বালানি আমদানির বাড়তি চাহিদায় ডলারের বাজারে চাপও বেড়েছে।
এদিকে বৈদেশিক মুদ্রার বাজার স্থিতিশীল রাখতে আইএমএফের দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে কৌশলী ভূমিকায় রয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংকে পর্যাপ্ত জোগান রয়েছে ডলারের। তবে এখান থেকে বকেয়া পাওনা শোধ করা হবে।
সাধারণত প্রতি কার্যদিবসে ডলারের রেফারেন্স রেট নির্ধারণ করে দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। গত মঙ্গলবার প্রতি ডলারের সর্বোচ্চ ঘোষিত রেট ছিল ১২৩ টাকা ৮২ পয়সা। আর বাণিজ্যিক ব্যাংকের রেট ছিল ১২৪ টাকা ৭৫ পয়সা। আর ডজন খানেক ব্যাংক সম্প্রতি আইএমএফের মুক্তবাজারে রেফারেন্সে ১২৬-১২৭ টাকা পর্যন্ত ডলার লেনদেন করেছিল। তাদের মধ্যে ডলার কারসাজির অভিযোগে সাতটি ব্যাংককে নজরদারিতে এনেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। কিন্তু আইএমএফের কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতির কারণে বাংলাদেশ ব্যাংক এসব ব্যাংকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারছে না বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, আন্তর্জাতিক ও দেশীয়— উভয় কারণে ডলারের বাজারে তৈরি হয়েছে এই চাপ। মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে যুদ্ধ ও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়ায় বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দামও বেড়েছে। এর ফলে বেড়েছে জ্বালানি, সারসহ বিভিন্ন প্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানি ব্যয়। এসব আমদানি বিল পরিশোধে সরকারি ও বেসরকারি খাতের অতিরিক্ত ডলারের প্রয়োজন হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন ডেপুটি গভর্নর নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, দেশের সাত-আটটি দুষ্ট প্রকৃতির ব্যাংক মূল ব্যবসা বাদ দিয়ে ডলার লেনদেন করে অস্বাভাবিক মুনাফা অর্জন করার চেষ্টা করছে। তারা আইএমফের সঙ্গে যোগাযোগ করে ইচ্ছামতো দরে ডলার লেনদেন করছে। কারণ, আইএমএফকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী যেকোনো ব্যাংক তো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হস্তক্ষেপ ছাড়া ডলার লেনদেন করতে পারে। সেজন্য তাদের বাজার কারসাজির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যাচ্ছে না। তবে মৌখিকভাবে তাদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তিনি বললেন, বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাছে ৪০ মিলিয়নের বেশি নগদ ডলার রয়েছে। রেমিট্যান্স ভালো আসছে। বাজারে ডলার সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে। তবে কয়েকটি ব্যাংক বাজারে ঘোলাটে করার লক্ষ্যে ডলার নিয়ে অস্থিরতা করার চেষ্টা করছে বলে মন্তব্য ওই কর্মকর্তার। তার ভাষ্য, এসব যারা করছেন তারা দেশের স্বার্থ কীভাবে দেখেন, তা নিয়ে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
বাণিজ্যিক ব্যাংকের কয়েকজন ট্রেজারি কর্মকর্তা বললেন, ডলারের বাজারে বর্তমান চাপের প্রধান কারণ জ্বালানি আমদানির ব্যয় বৃদ্ধি। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ৬০-৭০ ডলার থেকে বেড়ে প্রায় ১০০ ডলারে পৌঁছেছে। আগে জ্বালানি ও সার আমদানির জন্য সরকারের মাসিক প্রয়োজন হতো প্রায় ৩০ কোটি মার্কিন ডলার। এখন একই পরিমাণ আমদানির জন্য প্রায় ৪০ কোটি ডলার ব্যয় হচ্ছে। অপরদিকে বিদায়ী অর্থবছরের (২০২৫-২৬) বিদেশি ঋণের সুদ-আসলসহ মিলিয়ে প্রায় ৪৪৯ কোটি ৪০ লাখ ডলার শোধ করেছে বাংলাদেশ। এর আগে কখনো এত ঋণ শোধ করা হয়নি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত ৩০ জুলাই আন্তঃব্যাংক বাজারে প্রতি মার্কিন ডলারের বিনিময়হার দাঁড়িয়েছে ১২৩ টাকা ৮২ পয়সা। একই দিনে স্পট মার্কেটে ডলার লেনদেন হয়েছে ১২৩ টাকা ৮৮ পয়সায়, যা এক মাস আগেও ছিল ১২২ টাকা ৮৫ পয়সা। তবে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অর্থ পরিশোধ বা ঋণপত্র (এলসি) নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে কয়েকটি বাণিজ্যিক ব্যাংককে প্রতি ডলার ১২৩ টাকা ৯৫ পয়সা পর্যন্ত ব্যয় করতে হচ্ছে। মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বললেন, ‘ব্যাংকগুলোয় ডলারের চাহিদা আগের তুলনায় কিছুটা বেড়েছে। এতে ডলারের রেট কিছুটা বাড়বে এটাই স্বাভাবিক। তবে সম্প্রতি ডলারের রেট যেভাবে বাড়ছে, এত দাম বাড়ার মতো চাহিদা বাজারে নেই।’




